সাহারার ধুলো মাড়িয়ে দুই অভিবাসী পরিবারের বিশ্বজয়ের অবিশ্বাস্য গল্প

একজনের বাবা-মা পায়ে হেঁটে সাহারা পেরিয়ে এসেছেন, আরেকজনের দাদি অবৈধভাবে বাসে চড়ে পৌঁছেছিলেন স্পেনে- সেই সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করেই বিশ্বকাপ জিতলেন লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস। স্পেনের ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্যে ছিল তারুণ্যের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। দু’একজন বাদে স্পেনের পুরো দলটাই তরুণ। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দুটি নাম লামিনে ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামস। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে যখন একচেটিয়া খেলেও গোল পাচ্ছিল না স্পেন, তখন ম্যাচের ১০৬ মিনিটের মাথায় ইয়ামাল এবং নিকোর মিথস্ক্রিয়ায় গোল বের করে আনেন ফেরান তোরেস। যেটা দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত করে স্পেনের। মাঠে ইয়ামাল এবং নিকোর গতিময় ফুটবল যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি মাঠের বাইরের জীবনকাহিনিও অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বিশ্বকাপ জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পেন দলকে অভিনন্দন জানিয়ে অসংখ্য বার্তা আসে। তবে সবচেয়ে আবেগঘন বার্তাগুলোর একটি ছিল নিকো উইলিয়ামসের বড় ভাই ইনাকি উইলিয়ামসের, ‘তুমি শুধু বিশ্বকাপ জেতোনি, লাখো অভিবাসীর স্বপ্ন পূরণ করেছ।’ ঘানার জাতীয় দলের ফুটবলার ইনাকি তার ছোট ভাই নিকোকে উদ্দেশ করে লেখে

সাহারার ধুলো মাড়িয়ে দুই অভিবাসী পরিবারের বিশ্বজয়ের অবিশ্বাস্য গল্প

একজনের বাবা-মা পায়ে হেঁটে সাহারা পেরিয়ে এসেছেন, আরেকজনের দাদি অবৈধভাবে বাসে চড়ে পৌঁছেছিলেন স্পেনে- সেই সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করেই বিশ্বকাপ জিতলেন লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস।

স্পেনের ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্যে ছিল তারুণ্যের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। দু’একজন বাদে স্পেনের পুরো দলটাই তরুণ। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দুটি নাম লামিনে ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামস। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে যখন একচেটিয়া খেলেও গোল পাচ্ছিল না স্পেন, তখন ম্যাচের ১০৬ মিনিটের মাথায় ইয়ামাল এবং নিকোর মিথস্ক্রিয়ায় গোল বের করে আনেন ফেরান তোরেস। যেটা দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত করে স্পেনের।

মাঠে ইয়ামাল এবং নিকোর গতিময় ফুটবল যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি মাঠের বাইরের জীবনকাহিনিও অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বকাপ জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পেন দলকে অভিনন্দন জানিয়ে অসংখ্য বার্তা আসে। তবে সবচেয়ে আবেগঘন বার্তাগুলোর একটি ছিল নিকো উইলিয়ামসের বড় ভাই ইনাকি উইলিয়ামসের, ‘তুমি শুধু বিশ্বকাপ জেতোনি, লাখো অভিবাসীর স্বপ্ন পূরণ করেছ।’

ঘানার জাতীয় দলের ফুটবলার ইনাকি তার ছোট ভাই নিকোকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘ভাই, তুমি বিশ্বকাপ জিতেছ। ইতিহাস গড়েছ। কিন্তু ট্রফির চেয়েও বড় বিষয় হলো, তুমি আমাদের বাবা-মায়ের মতো লাখো অভিবাসীকে গর্বিত করেছ। তুমি প্রমাণ করেছ, যারা সবকিছু ছেড়ে একটি ভালো ভবিষ্যতের আশায় দেশ ছাড়ে, তাদের সন্তানরাও একদিন পৃথিবীর সর্বোচ্চ মঞ্চে দাঁড়াতে পারে। কঠোর পরিশ্রম আর আত্মত্যাগ থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আজ তুমি শুধু স্পেন নয়, আমাদের পুরো পরিবারের নাম ইতিহাসে লিখে দিয়েছ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’

nico-williums

ইনাকির এই বার্তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। কারণ এটি শুধু নিকোকে নয়, ইউরোপজুড়ে বসবাসরত লাখো অভিবাসী পরিবারের সংগ্রামের পেছনের না বলা অসংখ্য গল্পও তুলে ধরেছে।

সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে স্পেনে এসেছিলেন নিকোর বাবা-মা

বিশ্বকাপ চলাকালীন ১২ জুলাই ২৪ বছরে পা দেন নিকো উইলিয়ামস। ২০০২ সালে, বড় ভাইয়ের আট বছর পরে স্পেনের পাম্পলোনা শহরে জন্ম নেন উইলিয়ামস পরিবারের ছোট সন্তান নিকোলাস উইলিয়ামস আর্থার।

১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার মত বড় দলকে হারিয়ে আজ তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের গর্বিত সদস্য। কিন্তু তার পরিবার যে পথ পাড়ি দিয়েছে, তা ছিল রীতিমতো অবিশ্বাস্য এক জীবন-মৃত্যুর লড়াই।

নিকো ও ইনাকির বাবা-মা মারিয়া আর্থার এবং ফেলিক্স উইলিয়ামস ঘানার বাসিন্দা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে উন্নত জীবনের আশায় তারা ইউরোপের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন।

সাহারা মরুভূমির বিশাল অংশ তারা হেঁটে অতিক্রম করেন। পর্যাপ্ত খাবার কিংবা পানির ব্যবস্থা ছিল না। প্রচণ্ড গরম আর কঠিন পরিবেশের মধ্যেই এগিয়ে যেতে হয়েছে। পরে দুই ভাই জানতে পারেন, সেই ভয়ংকর যাত্রার সময় তাদের মা খালি পায়ে ছিলেন এবং গর্ভবতীও ছিলেন।

অবশেষে তারা পৌঁছান উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের শহর মেলিয়ায়। সেখানে পৌঁছেই আটক হন। পরে এক আইনজীবীর সহায়তায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। সহজভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার জন্য তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়, যেন তারা বলেন যে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে পালিয়ে এসেছেন। তাই তারা দাবি করেন যে তারা লাইবেরিয়া থেকে এসেছেন, যে দেশটি তখন সংঘাতে বিপর্যস্ত ছিল।

Nicko-yamal

রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার পর পরিবারটিকে বিলবাওয়ে পাঠানো হয়। সেখানে ফাদার ইনাকি মারদোনেস তাদের আশ্রয় ও সহায়তা দেন। সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়েই আর্থার ও ফেলিক্স দম্পত্তি বড় ছেলের নাম রাখেন ‘ইনাকি’। সঙ্গে বাবার পদবি উইলিয়ামস।

সংসার চালাতে ফেলিক্স পরে ইংল্যান্ডে চলে যান। লন্ডনে একটি শপিং মলের ফুড কোর্টে টেবিল পরিষ্কার করতেন। পরে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবেও কাজ করেন, যার মধ্যে চেলসির স্টেডিয়ামের (স্টামফোর্ড ব্রিজ) আশপাশেও সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাকে।

অন্যদিকে তাদের মা মারিয়া একসঙ্গে তিনটি চাকরি করতেন। একদিকে মা চাকরি করছেন, অন্য দিকে বাবা থাকেন তাদের থেকে অনেক দূরে। ফলে কঠিন ওই সময়ে ছোট ভাই নিকোর দেখভালের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন ইনাকি।

এক সাক্ষাৎকারে নিকো বলেছিলেন, ‘ইনাকি শুধু আমার ভাই নয়, সে আমার বাবার মতো। সে আমাকে খেতে দিয়েছে, স্কুলে পাঠিয়েছে, কাপড় কিনে দিয়েছে। ভুল করলে সংশোধন করেছে, সবসময় পরামর্শ দিয়েছে। আজ আমি যা হয়েছি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার।’

Nick Family

বাবা-মাকে নিয়ে নিকো বলেছিলেন, ‘আমার বাবা-মা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন যাতে আমি এবং আমার ভাই আরও ভালো ভবিষ্যৎ পেতে পারি। আর তারা সফল হয়েছেন। বাবা-মা আমাদের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব। তারা সংগ্রামী মানুষ। তারা আমাদের সম্মান, কঠোর পরিশ্রম এবং এই শিক্ষা দিয়েছেন যে কেউ আপনাকে বিনামূল্যে কিছু দেয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে, তাদের আমার বাবা-মা হিসেবে পেয়ে আমি খুবই গর্বিত। আর আমি সবসময় চেষ্টা করি যেন তারা আমাকে তাদের ছেলে হিসেবে নিয়ে গর্ব করতে পারেন।’

ফুটবলই বদলে দেয় দুই ভাইয়ের জীবন

দুই ভাই ফুটবলকে বেছে নেন নিজেদের সংগ্রামের পথ বদলে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে। ২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের হয়ে রিয়াল ভায়াদোয়িদের বিপক্ষে একই ম্যাচে মাঠে নামেন ইনাকি ও নিকো। ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো ক্লাবটির হয়ে দুই ভাই একসঙ্গে খেলতে নামেন। দুই ভাই এখন একসঙ্গে খেলেন লা লিগার ক্লাব অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ে।

Nico-inaki

দু’জনই স্পেনের পাম্পলোনা শহরে জন্মালেও জাতীয় দল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নেন ভিন্ন সিদ্ধান্ত। নিকো প্রতিনিধিত্ব করেন স্পেনকে। অন্যদিকে বাবা-মায়ের শিকড়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে ইনাকি বেছে নেন ঘানার জাতীয় দলকে।

লামিনে ইয়ামালের পরিবারও অভিবাসনের প্রতীক

স্পেনের নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা লামিনে ইয়ামালের পুরো নাম ‘লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা’। জন্মগ্রহণ করেন ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই, কাতালোনিয়ার বার্সেলোনা মহানগর এলাকার এসপ্লুগেস দে লোব্রেগাতে। বিশ্বকাপ চলাকালীন ১৩ই জুলাই তিনি পূর্ণ করেন ১৯ বছর।

খুব অল্প বয়সেই অসাধারণ প্রতিভার কারণে বিশ্ব ফুটবলের নজরে চলে আসা ইয়ামালের জীবনের গল্প কেবল ফুটবলের নয়, বরং অভিবাসন, সংগ্রাম ও স্বপ্নপূরণেরও এক অনন্য উদাহরণ।

ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর লারাশ ও কাসার এল-কেবিরের মধ্যবর্তী একটি গ্রামের বাসিন্দা। আর মা শেইলা এবানা এসেছেন নিরক্ষীয় (ইকুয়েটোরিয়াল) গিনির উপকূলীয় শহর বাতা থেকে। দুই ভিন্ন আফ্রিকান দেশের এই দম্পতি স্পেনে বসতি গড়ে তোলেন উন্নত জীবনের আশায়।

Lamine Family

তবে তাদের পরিবারের স্পেনে আসার ইতিহাস শুরু হয়েছিল আরও আগে। প্রথমে মরক্কো থেকে একাই স্পেনে পাড়ি জমান ইয়ামালের দাদি ফাতিমা। বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই তিনি একটি বাসে চড়ে মরক্কো থেকে স্পেনে প্রবেশ করেন। আলহেসিরাস ও গ্রানাডা হয়ে শেষ পর্যন্ত কাতালোনিয়ার মাতারো শহরে পৌঁছান তিনি।

সেখানে দিন-রাত পরিশ্রম করে টাকা জমান। এরপর একে একে নিজের সন্তানদেরও স্পেনে নিয়ে আসেন। পরে স্পেনেই পরিচয় হয় ইয়ামালের বাবা-মায়ের। তারা বার্সেলোনার উপকণ্ঠে বসবাস শুরু করেন।

ইয়ামালের নামও এসেছে বিশেষ এক পারিবারিক স্মৃতি থেকে। তার জন্মের আগে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন বাবা-মা। সে সময় পরিবারের দুই বন্ধু- লামিন ও ইয়ামাল- তাদের আর্থিক সহায়তা করেন। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই ওই দুই বন্ধুর নামই (লামিনে ইয়ামাল) সন্তানের নামের সঙ্গে জুড়ে দেন তার বাবা-মা। সঙ্গে রাখেন তাদের নিজেদের নামও। যে কারণে পুরো নামটা হয়ে ওঠে লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা।

দাদির ত্যাগেই ইয়ামালদের বেড়ে ওঠা

ইয়ামালের বেড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার দাদি ফাতিমার। ১৯৯০ সালে মরক্কোর তাঞ্জিয়ার শহর ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান তিনি। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও কাতালোনিয়ার মাতারো শহরের শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দায় পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

শৈশবে ইয়ামালের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে দাদিই কার্যত তার অভিভাবকের দায়িত্ব নেন। প্রতিদিনের দেখাশোনা, স্কুলে যাওয়া, অনুশীলনে নিয়ে যাওয়া- সবকিছুই সামলাতেন ফাতিমা। তার ত্যাগ ও পরিশ্রমের কারণেই ইয়ামাল নিয়মিত ফুটবল অনুশীলন চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

যে কারণে দাদির প্রতি অনেক বেশি অনুরক্ত ইয়ামাল। মাঠে নামার আগে দাদির নির্দেশ মেনে হাত তুলে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন তিনি। গোল করার পরও একই কাজ করতে দেখা যায় ইয়ামালকে। শুধু তাই নয়, গোল করার পর তার আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ সংখ্যাটি প্রদর্শন করেন, যা মূলত বার্সেলোনার শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দার পোস্টকোড (০৮৩০৪) নির্দেশ করে। এই এলাকাতেই তার দাদি তাকে অত্যন্ত কষ্টের মাঝে বড় করে তুলেছিলেন।

নিজের শিকড়কে সম্মান জানাতেই ইয়ামাল এমন উদযাপন করেন। তার জনপ্রিয়তার ফলে রোকাফোন্দা এলাকাটিও বিশ্বজুড়ে নতুন পরিচিতি পেয়েছে এবং স্থানীয় মানুষ এটিকে নিজেদের গর্বের প্রতীক হিসেবে দেখেন।

Yamal Family

বিশ্বকাপের পর লামিনের পরিবার রোকাফোন্দা এলাকায় চলে যায়, যেখানে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক। যে এলাকাটি তরুণ খেলোয়াড় লামিন ও তার পরিবারের গর্বের উৎস। লামিনের বাবা বলেন, ‘এই এলাকাই পৃথিবীর সেরা এবং স্পেনের সেরা, কারণ এখানে আমরা সবাই সমান এবং সবাই একে অপরকে ভালোবাসি।’

দাদি ফাতিমাও নাতি অন্তঃপ্রাণ। ইয়ামাল বিশ্বকাপ জেতার পর এক আবেগঘন পোস্টে ফাতিমা লিখেছেন, ‘আমি ভীষণ খুশি। স্পেন, তোমাকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ সবাইকে। লামিনে ঘরে ফিরলে, আমি ওর জন্য ‘আরফিসউহ’ (মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী খাবার) রান্না করব। ও যা খেতে চাইবে, তাই রান্না করে ওকে খাওয়াব। আমার আনন্দের কোনো সীমা নেই।’

দারিদ্র্যের পাড়া থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন

শৈশবে বার্সেলোনার দরিদ্র এলাকা গ্রানোলিয়ার্স ও রোকাফোন্দার রাস্তায় বড় হন ইয়ামাল। সিমেন্টের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা তৈরি হয়।

মাত্র চার বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব লা তোরেতা-তে ফুটবল খেলা শুরু করেন ইয়ামাল। সেখানেই তার অসাধারণ প্রতিভা প্রথম ধরা পড়ে। ওই সময় তার অসাধারণ প্রতিভা নজরে পড়ে বার্সেলোনার স্কাউটদের। মাত্র ছয় বছর বয়সে যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়ায়।

yamal

২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। এরপর পরিবার ছেড়ে একাডেমিতেই থেকে শুরু হয় তার ফুটবল শিক্ষা। এখান থেকেই একসময় উঠে এসেছিলেন লিওনেল মেসি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজসহ অসংখ্য কিংবদন্তি।

১৫ বছর ২৯০ দিন বয়সে তিনি বার্সেলোনার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ১৬ বছর ৫৭ দিন বয়সে তিনি স্পেন জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় ও গোলদাতা হন।

এর এক বছর পর জেতেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনকে শিরোপা জেতানোর মাধ্যমে নিজের সাফল্যের মুকুটে যোগ করেন বিশ্বকাপও। বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তিনি ১৯ বছর ছয় দিন বয়সে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ, দুটি শিরোপাই জেতা ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

শিশুকালে মেসির সঙ্গে ইয়ামালের ঐতিহাসিক ছবি

শৈশবে ইয়ামালের জীবনের আরেকটি অবিশ্বাস্য ঘটনা এখন ফুটবল ইতিহাসের অংশ। ২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ফটোশুটে অংশ নিয়েছিল ছোট্ট ইয়ামাল। সেই অনুষ্ঠানে মাত্র ২০ বছর বয়সী লিওনেল মেসি তাকে কোলে নিয়ে গোসল করিয়ে দিচ্ছিলেন।

messi-yamal

বহু বছর ছবিটি প্রায় বিস্মৃত ছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসি ও স্পেনের তরুণ তারকা ইয়ামাল মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তখন সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার ভাইরাল হয়ে যায়। একসময় যে শিশুকে কোলে নিয়েছিলেন মেসি, বছর উনিশ পর সেই ছেলেই তার প্রতিপক্ষ হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেন।

নিকো-ইয়ামাল যেন দুই ভাই

স্পেন জাতীয় দলে নিকো উইলিয়ামস এবং লামিনে ইয়ামালে সম্পর্কটা এমন যেন- তারা দুই জন আত্মার আত্মী, যেন দুই ভাই। লামিন ইয়ামালের সঙ্গে নিকো বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করেন, যেমন ইনিয়াকি তার সঙ্গে করেন।

বার্সেলোনাভিত্তিক ক্রীড়া দৈনিক স্পোর্ট-এর পরিচালক হোয়ান ভেহিলস বলেন, ‘হাসিখুশি, আনন্দময় এবং মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়া দুই তরুণ ফুটবলারকে পাওয়া স্পেনের জন্য একটি দুর্দান্ত চিত্র। বর্তমানে এটি ভালো খেলার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।’

এই দুই ফুটবলারের সবকিছুই এক ধরনের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্পেন জাতীয় দলের হয়ে গোল উদযাপনের জন্য তারা যে নাচগুলো অনুশীলন করেন, সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

তাদের বন্ধুত্বের শুরু ২০২৪ সালে জাতীয় দলে প্রথম ডাক পাওয়ার সময়। কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের বিপক্ষে স্পেনের প্রীতি ম্যাচের আগে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে নিকোকে তরুণ লামিন ইয়ামালের দেখভাল করতে বলেছিলেন। নিকো সেই দায়িত্ব পালন করেন।

nico-yamal

এটি ছিল দে লা ফুয়েন্তের বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত, কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে মাত্র ১৬ বছরের তরুণ লামিনের জন্য এর চেয়ে ভালো পথপ্রদর্শক আর হতে পারে না। ‘সে তার জন্য একটি ভালো উদাহরণ’- বলেন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের একজন মুখপাত্র।

‘লামিন-নিকো যা করে সবকিছুই অনুসরণ করে। নিকো ঘুম থেকে ওঠে, প্রস্তুত হয়, তারপর লামিনকে নিতে যায়। সে বার্সেলোনা খেলোয়াড়ের কক্ষের দরজায় নক করে বলে- ‘চলো, আমাদের দেরি করা চলবে না।’

অনেকের কাছে এটি নিকো ও তার ভাই ইনিয়াকির সম্পর্কের প্রতিফলন মনে হয়। কিন্তু নিকোর কাছে বিষয়টি আরও বেশি কিছু, ‘আমি ইতোমধ্যেই (ইয়ামালকে) বলেছি যে তাকে 'তার বাবার' কাছ থেকে শিখতে হবে, আর সেই বাবা আমি’- মজা করে বলেন নিকো।

ফাদার ইনাকি মারদোনেসের মতে, ‘নিকো এবং ইয়ামাল দুজনের গল্পই অনেক মানুষের জন্য উদাহরণ, যারা নতুন জীবনের খোঁজে বেরিয়ে এসে সফল হতে পেরেছেন। অনেকের কাছে তারা ক্রীড়াক্ষেত্রের এবং মানবিকতার আদর্শ।’

সংগ্রাম থেকে সাফল্যের প্রতীক

নিকো উইলিয়ামস ও লামিনে ইয়ামালের গল্প কেবল দুই ফুটবলারের উত্থানের গল্প নয়। এটি অভিবাসন, আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং স্বপ্নপূরণের গল্প।

yamal-messi

একজনের বাবা-মা খালি পায়ে সাহারা মরুভূমি পেরিয়েছেন, অন্যজনের দাদি বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই নতুন জীবনের সন্ধানে স্পেনে পৌঁছেছিলেন। সেই পরিবারগুলোর সন্তানরাই আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

তাদের সাফল্য শুধু স্পেনের নয়, পৃথিবীর প্রতিটি অভিবাসী পরিবারের জন্যই একটি শক্তিশালী বার্তা- পরিশ্রম, ত্যাগ আর সুযোগ পেলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

আইএইচএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow