সেই জাবেদ আলীর কাছে এত বছরের ভরণপোষণ চাইলেন অভিমানী স্ত্রী

অভিমান কখনো কখনো মানুষের জীবনকে এমন এক অচেনা পথে নিয়ে যায়, যার শেষ কোথায় কেউ জানে না। একটা সময় নিজের ভুল বুঝতে পারলেও তেমন কিছু করার থাকে না। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী ক্যাম্পপাড়া এলাকার বাসিন্দা জাবেদ আলীর জীবনটা যেন তেমনই। অভিমান ভুলে দীর্ঘ ৩৮ বছর পর নিজ ভিটায় পা রেখেছেন তিনি। সোমবার (১ জুন) বিকেলে হঠাৎ করেই ৩৮ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া জাবেদ আলী (৬৬) ফিরে আসেন তার জন্মভিটায়। যাকে স্বজনরা বহু আগেই ‌‘মৃত’ বলে ধরে নিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকে সামনে দেখে প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি। মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে জাবেদ আলীর ফিরে আসার খবর। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিকেলের দিকে গ্রামের রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছিলেন এক বৃদ্ধ। পরনে ছিল সাধারণ পোশাক, মুখে বয়সের ছাপ, চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে। তাকে দেখে প্রথমে কেউ চিনতে পারেননি। কিন্তু তিনি যখন নিজের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ান এবং পরিচয় দেন, তখন পরিবারের সদস্যরা হতবাক হয়ে যান। দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে যার কোনো খোঁজ ছিল না, যাকে নিয়ে অসংখ্য গুজব শোনা গেছে, সেই মানুষটিই যেন হঠাৎ করে ফিরে এলেন অতীতের পাতা উল্টে। জাবেদ আলীর স্ত্রী রুশিয়া খাতুনের জন্য

সেই জাবেদ আলীর কাছে এত বছরের ভরণপোষণ চাইলেন অভিমানী স্ত্রী

অভিমান কখনো কখনো মানুষের জীবনকে এমন এক অচেনা পথে নিয়ে যায়, যার শেষ কোথায় কেউ জানে না। একটা সময় নিজের ভুল বুঝতে পারলেও তেমন কিছু করার থাকে না। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী ক্যাম্পপাড়া এলাকার বাসিন্দা জাবেদ আলীর জীবনটা যেন তেমনই। অভিমান ভুলে দীর্ঘ ৩৮ বছর পর নিজ ভিটায় পা রেখেছেন তিনি।

সোমবার (১ জুন) বিকেলে হঠাৎ করেই ৩৮ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া জাবেদ আলী (৬৬) ফিরে আসেন তার জন্মভিটায়। যাকে স্বজনরা বহু আগেই ‌‘মৃত’ বলে ধরে নিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকে সামনে দেখে প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি। মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে জাবেদ আলীর ফিরে আসার খবর।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিকেলের দিকে গ্রামের রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছিলেন এক বৃদ্ধ। পরনে ছিল সাধারণ পোশাক, মুখে বয়সের ছাপ, চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে। তাকে দেখে প্রথমে কেউ চিনতে পারেননি। কিন্তু তিনি যখন নিজের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ান এবং পরিচয় দেন, তখন পরিবারের সদস্যরা হতবাক হয়ে যান।

দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে যার কোনো খোঁজ ছিল না, যাকে নিয়ে অসংখ্য গুজব শোনা গেছে, সেই মানুষটিই যেন হঠাৎ করে ফিরে এলেন অতীতের পাতা উল্টে।

সেই জাবেদ আলীর কাছে এত বছরের ভরণপোষণ চাইলেন অভিমানী স্ত্রী

জাবেদ আলীর স্ত্রী রুশিয়া খাতুনের জন্য মুহূর্তটি ছিল অবর্ণনীয়। স্বামীকে সামনে দেখে প্রথমে তিনি নির্বাক হয়ে যান। তারপর ধীরে ধীরে তাকে চিনতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। চার দশকের কাছাকাছি সময় ধরে অপেক্ষা, কষ্ট আর অনিশ্চয়তার যে ভার তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন, তা যেন এক মুহূর্তে হালকা হয়ে যায়।

খবর ছড়িয়ে পড়তেই আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং এলাকার উৎসুক মানুষজন ভিড় জমাতে শুরু করেন জাবেদ আলীর বাড়িতে। কেউ তাকে দেখে বিস্মিত, কেউ আবেগাপ্লুত, আবার কেউ জানতে চান এত বছর তিনি কোথায় ছিলেন?

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে স্ত্রী ও চার বছরের ছেলে জাহাঙ্গীর আলমকে রেখে অভিমান করে বাড়ি ছাড়েন জবেদ আলী। সেসময় তার বয়স ছিল প্রায় ২৮ বছর। পারিবারিক কোনো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্যের জের ধরে কাউকে কিছু না জানিয়েই বাড়ি থেকে বের হয়ে যান তিনি। এরপর বছরের পর বছর কেটে গেলেও আর ফিরে আসেননি।

পরিবারের সদস্যরা শুরুতে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেছেন। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি, সম্ভাব্য কর্মস্থল, এমনকি দূর-দূরান্তেও খোঁজ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশা ক্ষীণ হতে থাকে। একসময় স্বজনরা ধরে নেন, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই।

এদিকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে কঠিন জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি হন রুশিয়া খাতুন। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে প্রতিটি দিন। সামাজিক নানা চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং স্বামীর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্য দিয়েই কাটে তার জীবনের দীর্ঘসময়।

রুশিয়া খাতুন বলেন, ‘আমি মায়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেই সুযোগে কাউকে কিছু না বলে সে বাড়ি থেকে চলে যায়। এরপর আর কোনো খোঁজ পাইনি। এত বছর আমি কষ্ট করে সংসার চালিয়েছি, সন্তানকে বড় করেছি। এখন ফিরে এসেছে, কিন্তু তাকে মেনে নিতে হলে এত বছরের ভরণপোষণের হিসাব আগে দিতে হবে।’

তার এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান ও বঞ্চনার অনুভূতি। একদিকে হারিয়ে যাওয়া স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে দীর্ঘ ৩৮ বছরের কষ্টের স্মৃতি—দুই অনুভূতির সংঘাতে যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।

সেই জাবেদ আলীর কাছে এত বছরের ভরণপোষণ চাইলেন অভিমানী স্ত্রী

অন্যদিকে জবেদ আলী নিজের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, ৩৮ বছর আগে এক অজানা কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। পরে অনেকবার বাড়ি ফেরার কথা ভেবেছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছেন। এভাবেই কেটে গেছে সময়।

তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে মানিকগঞ্জ এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে কিছু জমি কিনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং নতুন করে সংসার গড়ে তোলেন। সেই সংসারে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যার বয়স বর্তমানে ১১ বছর। প্রায় আট বছর আগে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যান। এরপর থেকেই তিনি আবার নিজের অতীত এবং প্রথম পরিবারের কথা বেশি করে ভাবতে শুরু করেন।

স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর একাকীত্বই হয়তো তাকে শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে এনেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত নিজের জন্মভিটা, শৈশবের স্মৃতি এবং রক্তের সম্পর্কের কাছে ফিরে যেতে চায়। জাবেদ আলীর ক্ষেত্রেও হয়তো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

জাবেদ আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, যাকে চার বছর বয়সে রেখে গিয়েছিলেন তার বাবা, আজ তিনি একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। বাবার ফিরে আসা নিয়ে তার মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি নূহ বাঙালি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার জীবনে এমন ঘটনা আগে কখনো দেখিনি। একজন মানুষ প্রায় চার দশক পর ফিরে এসে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়েছে, এটি সত্যিই বিরল ঘটনা।’

আসিফ ইকবাল/এসআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow