আইন ও মানবিকতার সন্ধিক্ষণে বাদল ফরাজী: আইনমন্ত্রী, একটি পরিবারের কান্না থামান

ভারতের তিহার জেল থেকে স্বদেশের কারাগারে ফিরেও মেলেনি মুক্তি। ভুল পরিচয়ে গ্রেফতার হওয়া এক তরুণের জীবনের সোনালী সময়গুলো আজ নিভে যাচ্ছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। একদিকে মৃত্যুশয্যায় মা, অন্যদিকে বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চলে যাওয়া বাবা—মাঝখানে এক বোনের হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো। আমি সেই বাদল ফরাজীর জীবনের করুণ আখ্যান জানাতে চাই মাননীয় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে। একাত্তর বছর বয়সী মা আজ শয্যাশায়ী। ঝাপসা চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—যদি কোনো অলৌকিক ঘটনায় ছেলেটা ফিরে আসে! বাবা ছেলের পথ চেয়ে থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আর বোন? সেই বোনটি আজ এক দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে হন্যে হয়ে ঘুরছেন, শুধু এইটুকু আরজি নিয়ে: ‘আমার ভাইটাকে ফিরিয়ে দিন।’ বলছি বাদল ফরাজীর কথা। এক দুর্ভাগা তরুণ, যার জীবনের সোনালী সময়গুলো ধুলোয় মিশে যাচ্ছে কারাগারের চার দেয়ালের নিরেট অন্ধকারে। একটি ভুলের মাশুল যখন সারা জীবন ২০১৮ সালে ভারতের তিহার জেল থেকে বাদলকে যখন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন অনেকের মনে আশার আলো জেগেছিল। বাদল ভেবেছিলেন, স্বদেশের মাটিতে পা রাখলে হয়তো তার দীর্ঘ বন্দিজীবনের অবসান ঘটবে। কিন্তু আইনি জটি

আইন ও মানবিকতার সন্ধিক্ষণে বাদল ফরাজী: আইনমন্ত্রী, একটি পরিবারের কান্না থামান

ভারতের তিহার জেল থেকে স্বদেশের কারাগারে ফিরেও মেলেনি মুক্তি। ভুল পরিচয়ে গ্রেফতার হওয়া এক তরুণের জীবনের সোনালী সময়গুলো আজ নিভে যাচ্ছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। একদিকে মৃত্যুশয্যায় মা, অন্যদিকে বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চলে যাওয়া বাবা—মাঝখানে এক বোনের হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো। আমি সেই বাদল ফরাজীর জীবনের করুণ আখ্যান জানাতে চাই মাননীয় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে।

একাত্তর বছর বয়সী মা আজ শয্যাশায়ী। ঝাপসা চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—যদি কোনো অলৌকিক ঘটনায় ছেলেটা ফিরে আসে! বাবা ছেলের পথ চেয়ে থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আর বোন? সেই বোনটি আজ এক দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে হন্যে হয়ে ঘুরছেন, শুধু এইটুকু আরজি নিয়ে: ‘আমার ভাইটাকে ফিরিয়ে দিন।’

বলছি বাদল ফরাজীর কথা। এক দুর্ভাগা তরুণ, যার জীবনের সোনালী সময়গুলো ধুলোয় মিশে যাচ্ছে কারাগারের চার দেয়ালের নিরেট অন্ধকারে।

একটি ভুলের মাশুল যখন সারা জীবন

২০১৮ সালে ভারতের তিহার জেল থেকে বাদলকে যখন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন অনেকের মনে আশার আলো জেগেছিল। বাদল ভেবেছিলেন, স্বদেশের মাটিতে পা রাখলে হয়তো তার দীর্ঘ বন্দিজীবনের অবসান ঘটবে। কিন্তু আইনি জটিলতা আর নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে বাদল আজও মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়াতে পারেননি। ভারতে ভুল পরিচয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সেই তরুণ আজ প্রৌঢ়ত্বের পথে। যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা ছিল আগামীর রঙিন স্বপ্ন, সেই বয়সে তার নিত্যসঙ্গী হয়েছে কেবল অন্ধকার আর দীর্ঘশ্বাস।

কেন বাদলকে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন?

১. দীর্ঘ সময় জেল খাটার পর একজন বন্দির স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আইনি ও নৈতিক অধিকার থাকে। বিশেষ করে যখন তার পুরো পরিবার আজ ধ্বংসের মুখে।
২. বাবা মারা গেছেন বিনা চিকিৎসায় ও ছেলের শোকে। মা আজ মৃত্যুশয্যায়। বোনটি নিঃস্ব হয়ে ভাইয়ের জন্য লড়ছেন। এই পরিবারটির আর্তনাদ আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
৩. দেশের প্রচলিত আইনে সাজা মওকুফ বা বিশেষ বিবেচনায় মুক্তির বিধান রয়েছে। বাদল ফরাজীর ক্ষেত্রে সেই সুযোগটি প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।

আইনমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন

মাননীয় আইনমন্ত্রী, আপনি আইনের অভিভাবক। কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন ও মানবিকতা। বাদল ফরাজী কোনো দুর্ধর্ষ অপরাধী নয়; পরিস্থিতির শিকার এক সাধারণ যুবক। একটি বোন তার ভাইয়ের জন্য দ্বারে দ্বারে কাঁদবে, আর সমাজ হিসেবে আমরা নিশ্চুপ থাকব—এটা হতে পারে না।

একজন মা যাতে মৃত্যুর আগে তার সন্তানকে অন্তত একবার ছুঁয়ে দেখতে পারেন, সেই ব্যবস্থাটুকু দয়া করে করুন। বাদলকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন। তাকে নতুন করে বাঁচার সুযোগ দিন।

মানুষের কান্নার শব্দ কি আমাদের হৃদয়ে পৌঁছাবে না? বিচার যখন বিলম্বিত হয়, তখন তা অনেকটা অবিচারেরই নামান্তর। বাদল ফরাজীর জীবনের হারানো দিনগুলো ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তার ভবিষ্যৎটুকু তো আমরা রক্ষা করতে পারি।

মাঝেমধ্যে ভাবি, বাদল যখন কারাগারের ভেতর থেকে আকাশের এক চিলতে নীল দেখেন, তখন তিনি কী ভাবেন? তিনি কি মনে করতে পারেন তার ফেলে আসা শৈশবের কথা? নাকি তিনি ভুলেই গেছেন, 'মুক্তি' আসলে দেখতে কেমন?

মাননীয় আইনমন্ত্রী, বাদলকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন। তার মায়ের শেষ সময়টুকু যাতে ছেলের হাতে এক ঢোক জল খেয়ে কাটে, সেই সুযোগটুকু অন্তত করে দিন। সমাজ হিসেবে, মানুষ হিসেবে আমাদের বিবেক জাগ্রত হওয়া কি খুব বেশি প্রয়োজন নয়?

বাদল ফরাজীর জীবনের এই অবিশ্বাস্য ও নির্মম সত্য গল্পটি নিয়ে আমি দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছি, যা পরবর্তীতে 'বাদলের কারাবাস' গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির কারাজীবন নয়, বরং বিচারব্যবস্থার মারপ্যাঁচে আটকে পড়া এক মানবিক বিপর্যয়ের দলিল। নতুন বাংলাদেশে এমন মানবিক বিপর্যয় আসলে বাংলাদেশেরই বিপর্যয়।

 
লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow