‘আমি সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি’
‘আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি, আমি সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি।’ অস্ত্রোপচারের পর যখন তাঁর চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে এভাবেই কথাগুলো বলেন চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৮০ বছর বয়সী অনিতা চক্রবর্তী। তিনি চট্টগ্রামের দত্তেরহাট এলাকার বাসিন্দা। জানা যায়, চট্টগ্রামের উত্তরের উপজেলা ফটিকছড়ি। সেখানকার একটি নিভৃত গ্রাম হাইদচকিয়া। সে গ্রামে তীব্র রোদ উপেক্ষা করে পাতলা এক প্যান্ডেলের নিচে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক শত নারী পুরুষ, যাদের বেশিরভাগের বয়স ৫০ এর উপরে। ত্রাণ নিতে নয়, তারা হাইদচকিয়া ও পাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে এখানে এসেছেন চোখের চিকিৎসা নিতে। সেখানে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করেছে লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং ইম্পিরিয়াল। চট্টগ্রামে গত ৬৩ বছর ধরে নিরলস চোখের সেবা দিয়ে আসছে সংগঠনটি। ১৯৬৩ সালে সীমিত পরিসরে বিনামূল্যে অসহায় ও দুস্থ রোগীদের চক্ষু চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় লায়ন্স চ্যারিটেবল আই হসপিটাল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চট্টগ্রাম বিভাগে অন্ধত্ব বিমোচন, দূরীকরণ ও চক্ষুরোগের চিকিৎসা দিয়ে আসছে এ প্রতিষ্ঠাটি। এটি এমন একটি হাসপাতাল যেখানে রো
‘আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি, আমি সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি।’ অস্ত্রোপচারের পর যখন তাঁর চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে এভাবেই কথাগুলো বলেন চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৮০ বছর বয়সী অনিতা চক্রবর্তী। তিনি চট্টগ্রামের দত্তেরহাট এলাকার বাসিন্দা।
জানা যায়, চট্টগ্রামের উত্তরের উপজেলা ফটিকছড়ি। সেখানকার একটি নিভৃত গ্রাম হাইদচকিয়া। সে গ্রামে তীব্র রোদ উপেক্ষা করে পাতলা এক প্যান্ডেলের নিচে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক শত নারী পুরুষ, যাদের বেশিরভাগের বয়স ৫০ এর উপরে। ত্রাণ নিতে নয়, তারা হাইদচকিয়া ও পাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে এখানে এসেছেন চোখের চিকিৎসা নিতে। সেখানে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করেছে লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং ইম্পিরিয়াল। চট্টগ্রামে গত ৬৩ বছর ধরে নিরলস চোখের সেবা দিয়ে আসছে সংগঠনটি। ১৯৬৩ সালে সীমিত পরিসরে বিনামূল্যে অসহায় ও দুস্থ রোগীদের চক্ষু চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় লায়ন্স চ্যারিটেবল আই হসপিটাল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চট্টগ্রাম বিভাগে অন্ধত্ব বিমোচন, দূরীকরণ ও চক্ষুরোগের চিকিৎসা দিয়ে আসছে এ প্রতিষ্ঠাটি।
এটি এমন একটি হাসপাতাল যেখানে রোগীরা এসে চিকিৎসা নেয়। পাশাপাশি রোগী খুঁজতে হাসপাতালে কর্মীরা ছুটে যান রোগীর কাছে। চোখের রোগী খুঁজে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ, চশমা, এমনকি ফ্রিতে রোগীর ছানি কিংবা নেত্রনালীর মতো জটিল অপারেশনও করে দেওয়া হয় হাসপাতালে।
চট্টগ্রাম বিভাগে পৃথক একটি লায়ন্স জেলা কাজ করে। এ জেলার অধীনে ১০০টিরও বেশি ক্লাবের ৩ হাজারেরও বেশি সদস্য নিজেদের টাকায় মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের হলেও এর কার্যক্রম শুধু চট্টগ্রাম জেলা বা চট্টগ্রাম বিভাগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিষ্ঠানের নেওয়া নানা উদ্যোগ ও প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে প্রায় সারা দেশের মানুষ। আস্থা আছে বলেই মানুষ প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠানে ভিড় করে, দেশের সরকারি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। বিদেশেও চট্টগ্রামের এই প্রতিষ্ঠানের সুখ্যাতি আছে।
নানা ধরনের উদ্যোগ, দেশি বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাহায্য সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি বড় হয়েছে। শুরু থেকেই কানাডাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এতে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বর্তমানে জেকো ফাউন্ডেশন নামে কানাডার একটি প্রতিষ্ঠান রোগীদের অপারেশনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করে থাকে। লায়ন্স চক্ষু হাসপাতাল নামে প্রতিষ্ঠা হলেও এটি বর্তমানে লায়ন্স আই ইনস্টিটিউট নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অন্ধকার থেকে আলোর যাত্রা :
২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম নগরের জাকির হোসেন রোডে অবস্থিত হাসপাতালে গিয়ে মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও আশপাশের এবং দূরের অনেক জেলার মানুষ এসেছেন চোখের নানা সমস্যা নিয়ে। ভিড় ঠেলে সামনে এগোনো কঠিন ছিল। একাধিক ভবনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের কম্পাউন্ড। যদিও এখানে চোখের চিকিৎসা ছাড়াও ডেন্টাল, ফিজিওথেরাপি, কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো সেবাও দেওয়া হয়।
হাসপাতালের কেবিনে কথা হয় ৬৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইসমাইলের সঙ্গে। তিনি জেকো ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত ফ্রি ক্যাটারাক্ট সার্জারি প্রজেক্ট-এর আওতায় দ্বিতীয়বারের মতো লায়ন্স চ্যারিটেবল আই হাসপাতালে ছানি অপারেশনের জন্য এসেছেন। এ সময় ইসমাইল বলেন, ‘৮ মাস আগে বাম চোখের অপারেশন করেছি, ওই চোখে এখন ভালো দেখতে পাচ্ছি। আজ ডান চোখের অপারেশন করা হয়েছে।’
দুই চোখেই স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে ইসমাইল বলেন, যারা এ অন্ধকার থেকে আলোর যাত্রা সম্ভব করেছেন। তাদের সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। শুধু ইসমাইল নন, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা থেকে ৮৫ জন রোগী বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের জন্য ওই দিন হাসপাতালে এসেছেন।
আস্থার হাসপাতাল:
চট্টগ্রামের মানুষের কাছে আস্থার হাসপাতালে পরিণত হওয়া এ প্রতিষ্ঠানের বহির্বিভাগে প্রতিদিন পাঁচ-ছয়শর বেশি মানুষ চিকিৎসা নেন। ছোট বড় অস্ত্রোপচার হয় দৈনিক গড়ে ১০০টি। দরিদ্র মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০০ টাকার টিকেট কিনে যে কেউ এখানে চোখের চিকিৎসা নিতে পারেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে।
চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান লায়ন নাসিরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘৩০ শয্যা নিয়ে এ হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হয়েছিল। বর্তমানে তা ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের একটি গর্বিত প্রকল্প চট্টগ্রাম লায়ন্স আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটাল। চক্ষু বিষয়ক উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এখানে। প্রতিষ্ঠানে এমএলওপি এবং পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট সাব স্পেশালিটি ফেলোশিপ কোর্সের কার্যক্রমও চলমান।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এ হাসপাতালে প্রতিদিন দুই শিফটে সাড়ে ৫শ থেকে ৬শ দুস্থ, গরিব, দরিদ্র রোগীকে বিনামূল্যে এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির রোগীকে সাশ্রয়ী মূল্যে চক্ষুসংক্রান্ত সব রোগের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ১৫০০-এর মতো রোগীর ক্যাটার্যক্ট অপারেশন করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে ৭৩১৭ জনকে এবং ২০২৫ সালে ১১,৪৪৩ জনের দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১২৯৭ জনের সার্জারি করা হয়েছে।
শহরে ও গ্রামে চক্ষুশিবির :
শুধু চিকিৎসাসেবা দিয়ে চোখের সমস্যা দূর করা যাবে না এ ধারণা শুরু থেকে উদ্যোক্তারা অনুধাবন করেছিলেন। তাই গণমুখী সেবার কথা তাঁরা শুরুতেই ভেবেছিলেন। তাঁরা শহরে ও গ্রামে চক্ষুশিবির আয়োজন, স্কুলকেন্দ্রিক সেবা এবং প্রচারণাকে একধরনের সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেন। লায়ন্স ক্লাবের পাশাপাশি তাদের যুব সংগঠন লিও ক্লাবের সদস্যরাও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
চক্ষু হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৩০ লাখের বেশি মানুষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। আড়াই লাখের বেশি মানুষের চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এত মানুষের চিকিৎসা নিতে আসার একমাত্র কারণ, হাসপাতালের ওপর মানুষের অগাধ আস্থা। স্কুল আই সাইট টেস্ট নামে স্কুলের শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা এবং চিকিৎসারও বড় কর্মসূচি পরিচালনা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
What's Your Reaction?