আর পালিয়ে যাওয়া হলো না

২০১৫ সালের শুরুর দিকের কথা, শুনলাম জাগো নিউজ নামের একটি অনলাইন পত্রিকা যাত্রা শুরু করেছে। প্রায় বছর খানেক হয়েছে তার বয়স। আমার অগ্রজ আনোয়ার হোসেন ভাই সেখানে জয়েন করেছেন। মূলত তার মাধ্যমে জাগো নিউজে আসা। যাহোক সিভি পাঠিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম। তখন সম্পাদক ছিলেন সুজন মাহমুদ ভাই। তবে জাগো নিউজ মূলত দেখতেন তখনকার প্রধান বার্তা সম্পাদক পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার ভাই। একদিন মহিউদ্দিন ভাইকে ফোন দিলাম, তিনি সুবিধাজনক সময়ে আসতে বললেন। এরপর একদিন সকাল ১০টার দিকে গেলাম হোসেন মার্কেটের সেই অফিসে। সেদিন সকালে প্রথম দেখা হলো বুলবুল ভাই, আব্দুর রাজ্জাক সরকার ও শাকিলা পাতা আপার সঙ্গে। সকালের শিফটে তারা ডিউটি করছিলেন। তখনও মহিউদ্দিন ভাই অফিসে আসেননি। তাকে ফোন দিলাম, তিনি ফোন বুলবুল ভাইকে দিতে বললেন। বুঝলাম কম্পিউটারে বসিয়ে কিছু কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কাজ করতে আপত্তি নেই, কিন্তু সমস্যায় পড়লাম অন্য জায়গায়। ইংরেজি কি-বোর্ড! ওই কি-বোর্ডে কাজ করার অভ্যাস একেবারেই নেই। তাই ভাবলাম মানে মানে কেটে পড়াই ভালো! মনে মনে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম! মহিউদ্দিন ভাইকে আবার ফোন দিলাম। বললাম, শরীর খারা

আর পালিয়ে যাওয়া হলো না

২০১৫ সালের শুরুর দিকের কথা, শুনলাম জাগো নিউজ নামের একটি অনলাইন পত্রিকা যাত্রা শুরু করেছে। প্রায় বছর খানেক হয়েছে তার বয়স। আমার অগ্রজ আনোয়ার হোসেন ভাই সেখানে জয়েন করেছেন। মূলত তার মাধ্যমে জাগো নিউজে আসা। যাহোক সিভি পাঠিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম। তখন সম্পাদক ছিলেন সুজন মাহমুদ ভাই। তবে জাগো নিউজ মূলত দেখতেন তখনকার প্রধান বার্তা সম্পাদক পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার ভাই। একদিন মহিউদ্দিন ভাইকে ফোন দিলাম, তিনি সুবিধাজনক সময়ে আসতে বললেন। এরপর একদিন সকাল ১০টার দিকে গেলাম হোসেন মার্কেটের সেই অফিসে।

সেদিন সকালে প্রথম দেখা হলো বুলবুল ভাই, আব্দুর রাজ্জাক সরকার ও শাকিলা পাতা আপার সঙ্গে। সকালের শিফটে তারা ডিউটি করছিলেন। তখনও মহিউদ্দিন ভাই অফিসে আসেননি। তাকে ফোন দিলাম, তিনি ফোন বুলবুল ভাইকে দিতে বললেন। বুঝলাম কম্পিউটারে বসিয়ে কিছু কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কাজ করতে আপত্তি নেই, কিন্তু সমস্যায় পড়লাম অন্য জায়গায়। ইংরেজি কি-বোর্ড! ওই কি-বোর্ডে কাজ করার অভ্যাস একেবারেই নেই। তাই ভাবলাম মানে মানে কেটে পড়াই ভালো! মনে মনে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম! মহিউদ্দিন ভাইকে আবার ফোন দিলাম। বললাম, শরীর খারাপ। আজকে আসি, আরেকদিন আসবো। কিন্তু মহিউদ্দিন ভাইয়ের এক কথা- আসছো যেহেতু কিছু কাজ করে যাও। ফোনে তার চাপাচাপিতে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে হলেও ডেক্সটপে বসে কাজ করে দিলাম। কাজ শেষ করে পালাতে পারলেই বাঁচি! তাই ঝটপট শেষ করে সেদিনের মতো পালালাম।

এরপর বেশ কিছুদিন হলো আর ডাকাডাকির নাম নেই। আনোয়ার ভাইকে ফোন দিলাম, তিনিও তেমন কিছু বলতে পারলেন না। এর কিছুদিন পরে ডাক পেলাম। এবার রীতিমতো বোর্ড বসিয়ে কথা। তিনজন ছিলেন- মহিউদ্দিন ভাই, বর্তমান সম্পাদক জিয়াউল হক ভাই (তখনকার ম্যানেজিং এডিটর) ও আরিফুল ইসলাম আরমান ভাই। কথায় বুঝলাম তারা নিতে চাচ্ছেন, কিন্তু যা দিতে চান তাতে আমি নিমরাজি ছিলাম। যাহোক পরে রাজি হলাম। এর কিছুদিন পর এইচআর থেকে ফোন, সার্টিফিকেটসহ হাজির হতে হবে। সব কাগজ নিয়ে হাজির হতে সময় চাইলাম। সব মিলে জয়েন করতে বোধহয় দু’তিন মাস সময় লেগে গেল।

এরপর সহ-সম্পাদক হিসেবে জয়েন করলাম সেন্ট্রাল ডেস্কে। কয়েক বছরের মধ্যে মহিউদ্দিন ভাই বললেন শিফট ইনচার্জের দায়িত্ব নিতে। আমি রাজি ছিলাম না। একদিন দেখি অফিসিয়াল মেইল। মানে ফরমান জারি। অগত্যা কাজ শুরু করতে হলো। সে যাত্রা এতো দীর্ঘ হবে তা আর ভাবতে পারিনি। বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে করতে বেলা কেটে যায়। রাত দুইটার দিকেও অনলাইনে অ্যাকটিভ দেখলে মহিউদ্দিন ভাই ইনবক্সে নক নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল নিউজ করিয়ে নিয়েছেন। ঈদে কিংবা ফ্যামিলি ডে সব দিনই উৎসাহ নিয়ে কাজ করেছি। ঈদের দিনের পাঠক ঘাটতি পুষিয়ে নিতে নিজে গল্প লিখেও আপ করেছি। কোনো এক ফ্যামিলি ডে ছিল ছুটি রিসোর্টে, সবাই ছুটাছুটি করছে অথচ আমি দুয়েকজন সঙ্গে নিয়ে সেখানেও বসে কাজ করছি। মহিউদ্দিন ভাই বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি এখানেও কাজ করছো!

জাগো নিউজের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো সহকর্মীদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক। সহকর্মীদের মাঝে এমন সুসম্পর্ক খুঁজে পাওয়াটা সত্যিই সৌভাগ্যের। এখানকার অগ্রজ-অনুজ সম্পর্কও মধুর। ড. হারুন রশীদ ভাই, মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল ভাই, আরিফুর রহমান বাবু ভাই কিংবা রফিকুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে অনুজদের সম্পর্ক বন্ধুসুলভ বড় ভাইয়ের মতো। স্পোর্টস এডিটর ইমাম হোসাইন সোহেল ভাই ও কান্ট্রি এডিটর আনোয়ার হোসেন ভাইয়ের মধ্যেও মুরব্বিসুলভ আচরণ নেই। অন্য যারা বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন তারাও একটা ভালো কর্মপরিবেশের মধ্যেই এখানে কাজ করেন। নতুন এসেও এখানে একজন অনায়াসে ঘরোয়া পরিবেশে বহুদিন কাজ করে যেতে পারেন।

এর ফলেই প্রতিষ্ঠানটি এতদিন টিকে আছে। যদিও ভাঙনের রেকর্ড আছে। তবে সেটাকে আমরা ভাঙন বলি না। জাগো নিউজের কর্মীদেরই একদল আরেকটি অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটা একটা বড় যোগ্যতা। আর যারা জাগো নিউজে থেকে গেছেন তারা এই প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করেছেন। এর ফলে দুটি প্রতিষ্ঠানে অনেক গণমাধ্যকর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রাপ্তিটা মূলত এখানেই। কে কোন প্রতিষ্ঠানে আছি, সেটা মুখ্য নয়। এখনও আমাদের মধ্যে সুস্পর্ক বজায় আছে। এখানে যারা বর্তমানে কাজ করছেন আর যারা এখান থেকে অন্য কোথাও গিয়ে কাজ করছেন, তাদের সবার মাঝেই সুসম্পর্কের অনুপম দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায়।

অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অনেকেই চলে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা হয়নি, সবাইকে বিস্মিত করে জাগো নিউজ এখনও টিকে আছে। সেই টিকে থাকার জন্য মালিকপক্ষের দীর্ঘদিনের সাপোর্ট ও বর্তমান সম্পাদক জিয়াউল হক ভাইয়ের অবদান অসামান্য। তিনি শুরু থেকেই জাগো নিউজের সঙ্গী। এই প্রতিষ্ঠানের বড় প্রাপ্তি হলো পুরোনো কিছু কর্মী। যারা কেবল প্রাপ্তির আশায় প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে শামিল হয়নি। তাদের প্রত্যাশা- সময়ের আবর্তনে তারা থাক আর না থাক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের এই প্ল্যাটফরমটি যেন দাঁড়িয়ে থাকে আপন মহিমায়। দেশে একটি গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যমের যেমন চাহিদা আছে তেমনি গণমাধ্যম কর্মীরও প্রয়োজন। এ দুটোই তৈরি হতে সময় লাগে, লাগে সুন্দর পরিবেশ। জাগো নিউজ কর্তৃপক্ষ সেই পরিবেশটা দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাগো নিউজের কর্মীরা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছে আরও গ্রহণযোগ্য।

আমার সেন্ট্রাল ডেস্কের দীর্ঘ সময়ের সহকর্মী দুই শিফট ইনচার্জ বুলবুল ভাই ও জোনায়েত ভাই, সেইসঙ্গে ডেস্কের একমাত্র নারী সহকর্মী রত্না আপুসহ যে ডজন খানেক মানুষ আমরা এক সঙ্গে কাজ করি তাদের সবার মাঝে অম্ল-মধুর সম্পর্ক বিদ্যমান। এমন সুসস্পর্কের কারণেই কর্মপরিবেশ সুন্দর থাকে। প্রতিটি ডেস্কের অভ্যন্তরে অত্যন্ত সুসম্পর্ক আছে। সেইসঙ্গে এক ডেস্কের সঙ্গে আরেক ডেস্কের সম্পর্কও অনেক ভালো। ডেস্ক-রিপোর্টিংয়ের সমন্বয়ও চমৎকার।

তবে প্রায় এগারো বছর আগে সেই যে ইংরেজি কি-বোর্ড দেখে জাগো নিউজ থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, তা আর হয়ে ওঠে নি। কালো চুলের অনেকগুলো সাদা হয়ে গেছে। ষাটের নিচে থাকা আমার ওজন সত্তুর পেরিয়েছে। ব্যাচেলর-বিবাগী জীবনেরও গতি হয়েছে। আজ জাগো নিউজের যুগপূর্তি, কাল এই প্রতিষ্ঠানে আমার ১১ বছর পূর্ণ হবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও যুগপূর্তিতে জাগো নিউজের জন্য নিরন্তর শুভ কামনা। ভালো থাকুক ভালোবাসার এই প্রিয় প্রতিষ্ঠান।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক ও ইনচার্জ, সেন্ট্রাল ডেস্ক

এসএইচএস/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow