ঈদ পরবর্তী সময়ে খাদ্যাভ্যাস যেমন হবে

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার মাস। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার ফলে শরীরের খাদ্যাভ্যাস ও বিপাকক্রিয়ায় একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু রমজান শেষে ঈদ আসে আনন্দ ও আপ্যায়নের বার্তা নিয়ে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়ার একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। ঈদের এই আনন্দঘন সময়টিতে সেমাই, পোলাও, কোরমা, কাবাব, মিষ্টি, বিরিয়ানি, বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া এবং লাল মাংসের খাবার টানা কয়েকদিন ধরে খাওয়া হয়। ফলে ঈদের পরপরই চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের চেম্বারে একটি পরিচিত চিত্র প্রায় প্রতি বছরই দেখা যায়। এসময় অনেকের ওজন বেড়ে যাওয়া, রক্তের চর্বি বা লিপিড প্রোফাইলের অবনতি, ইউরিক এসিড বৃদ্ধি, ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। তাই ঈদ পরবর্তী সময়ে খাদ্যাভ্যাস কেমন হবে তা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিক ও ধানমন্ডি বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালস এর সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিসিয়ান ইসরাত জাহান ইফাত। ছবি: পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ইফাত কেন ঈদের পরে বিপাকজনিত সমস্যা বাড়ে? রমজান ম

ঈদ পরবর্তী সময়ে খাদ্যাভ্যাস যেমন হবে

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার মাস। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার ফলে শরীরের খাদ্যাভ্যাস ও বিপাকক্রিয়ায় একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু রমজান শেষে ঈদ আসে আনন্দ ও আপ্যায়নের বার্তা নিয়ে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়ার একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত।

ঈদের এই আনন্দঘন সময়টিতে সেমাই, পোলাও, কোরমা, কাবাব, মিষ্টি, বিরিয়ানি, বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া এবং লাল মাংসের খাবার টানা কয়েকদিন ধরে খাওয়া হয়। ফলে ঈদের পরপরই চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের চেম্বারে একটি পরিচিত চিত্র প্রায় প্রতি বছরই দেখা যায়। এসময় অনেকের ওজন বেড়ে যাওয়া, রক্তের চর্বি বা লিপিড প্রোফাইলের অবনতি, ইউরিক এসিড বৃদ্ধি, ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি হয়ে থাকে।

তাই ঈদ পরবর্তী সময়ে খাদ্যাভ্যাস কেমন হবে তা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিক ও ধানমন্ডি বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালস এর সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিসিয়ান ইসরাত জাহান ইফাত

ছবি: পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ইফাতছবি: পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ইফাত

কেন ঈদের পরে বিপাকজনিত সমস্যা বাড়ে?

রমজান মাসে খাবারের সময় সীমিত থাকলেও অনেকেই ইফতার ও সেহেরিতে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করেন। এরপর ঈদের কয়েকদিন ধরে অতিরিক্ত চিনি, তেল ও লাল মাংসের খাবার খাওয়ার প্রবণতা শরীরের বিপাকক্রিয়ায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। এর ফলে-রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যায়, অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার কারণে ইউরিক এসিড বৃদ্ধি, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে, অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের কারণে ব্লাড প্রেসার বৃদ্ধি, পেটের চারপাশে ভিসেরাল ফ্যাট জমা। তাই ঈদের পরের সময়টিকে অনেকটা শরীরের জন্য একটি ‘মেটাবলিক রিসেট’ বা পুনরায় ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনার সময় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

দিনব্যাপী স্বাস্থ্যকর খাবারের গাইড

সকালই সুস্থ দিনের সঠিক সূচনা। তাই ঘুম থেকে ওঠার পর এক গ্লাস হালকা গরম পানি পান করলে শরীরের হজমপ্রক্রিয়া সক্রিয় হতে সাহায্য করে। সকালের নাস্তা হতে পারে ওটস বা লাল আটার রুটি ১–২টি, একটি সেদ্ধ ডিম, শাকসবজি (পালং, টমেটো, শসা), একটি ফল (পেয়ারা, আপেল বা পেঁপে) সকালের নাস্তা ৪০ মিনিট পর এক কাপ, চিনি ছাড়া চা বা গ্রিন টি- এই ধরনের নাস্তা লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ও উচ্চ আঁশযুক্ত হওয়ায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে।

মধ্য সকালের খাবার হবে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর, সকালের নাস্তার কয়েক ঘণ্টা পর অনেকেই চা-বিস্কুট খেয়ে থাকেন। কিন্তু এতে দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে পারে। এর পরিবর্তে খাওয়া যেতে পারে এক মুঠো বাদাম অবশ্যই ছয় ঘণ্টা ভেজানো, একটি মৌসুমি ফল অথবা এক বাটি টক দই। বাদামে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি ও ম্যাগনেসিয়াম শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে সাহায্য করে।

দুপুরের খাবারে একটি সুষম প্লেট নীতি মেনে চলা ভালো। প্লেটে রাখতে পারেন বিভিন্ন সবজি (লাউ, করলা, ঝিঙা, পটল, মিষ্টি কুমড়া), কার্বোহাইড্রেট (লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি, যবের রুটি অথবা ওটস বা লাল চিড়া), প্রোটিন (মাছ, মুরগি, ডাল)। মাছ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রসেসড লাল মাংস ইউরিক এসিড বাড়াতে পারে, তাই এটি সপ্তাহে সীমিত রাখা ভালো।

বিকেলের দিকে অনেকেই ক্ষুধার কারণে মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার খেয়ে ফেলেন। এর পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে ভেজানো ছোলা, ভেজানো বাদাম, সবজি সালাদ, লেবু দেওয়া হালকা চা- এতে রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা কম হয়।

রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত ২ ঘণ্টা আগে খাওয়া উচিত। রাতের খাবারে রাখা যেতে পারে সবজি স্যুপ, একটি রুটি বা অল্প ভাত, মাছ বা মুরগি, সালাদ। রাতে ভারী ও তেলযুক্ত খাবার খেলে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে।

ছবি: পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ইফাতছবি: পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ইফাত

ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস

যা বাদ দিতে হবে

  • অতিরিক্ত লাল মাংস
  • কলিজা ও অর্গান মিট
  • অতিরিক্ত মিষ্টি শরবত এবং কোল্ড ড্রিংকস
  • সফট ড্রিংক

যা বেশি খেতে হবে

  • পর্যাপ্ত পানি
  • সবুজ শাকসবজি
  • বাসায় বানানো টক দই
  • ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল
  • পর্যাপ্ত পানি শরীর থেকে ইউরিক এসিড বের হতে সাহায্য করে।

রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে করণীয়

  • ভাজাপোড়া ও ট্রান্স ফ্যাট এবং বেকারের সকল খাবার বাদ
  • নিয়মিত মাছ খাওয়া
  • আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানো
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম
  • ওটস ও ডালজাতীয় খাবারের সোলুবল ফাইবার কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপন

  • নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া
  • চিনি, গুড়, মধু ও মিষ্টি বাদ দেয়া
  • প্রতিদিন হাঁটা
  • পর্যাপ্ত ঘুম
  • খাবারের ৩০ মিনিট পরে ১৫–২০ মিনিট হাঁটা রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস

  • অতিরিক্ত লবণ, সস ও আচার, ডুবো তেলে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলা
  • পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার (কলা, শাকসবজি) খাওয়া
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা
  • মানসিক চাপ কমানো
  • স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাঁচটি মূলনীতি

আরও পড়ুন:

ঈদের পর শারীরিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে কিছু সহজ কিছু নিয়ম

  • প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট হাঁটা
  • পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা)
  • পর্যাপ্ত পানি পান
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

সচেতনতার মধ্যেই সুস্থতার পথ

ঈদ আনন্দের উৎসব আর প্রিয়জনদের সঙ্গে খাবারের আনন্দও তারই অংশ। তবে সামান্য সচেতনতা বজায় রাখলে এই আনন্দ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হবে না। সুষম খাদ্য, পরিমিত ক্যালরি গ্রহণ, নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত পানি পান ও মানসিক প্রশান্তি এই কয়েকটি অভ্যাস যদি দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা যায়, তবে ঈদের পরেও শরীর থাকবে সুস্থ ও প্রাণবন্ত। স্বাস্থ্য রক্ষা কোনো সাময়িক বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জীবনধারা। তাই উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সুস্থ অভ্যাস গড়ে তোলাই আমাদের সবার জন্য সবচেয়ে জরুরি।

জেএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow