এক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন সরু নালা
খুলনায় একসময়ের খরস্রোতা শোলমারী নদী আজ প্রাণধারা হারিয়ে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। দুই তীরে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর, যার অনেকাংশই এখন দখল ও দখলচাপের মুখে। যে নদীতে একসময় ফেরি চলত, জোয়ার-ভাটার ঢেউয়ে মুখর থাকত তীরবর্তী জনপদ—সেই নদী এখন প্রায় নিঃশব্দ, পানির প্রবাহও হয়ে পড়েছে ক্ষীণ। বটিয়াঘাটা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ভৈরব নদী থেকে এসে বটিয়াঘাটা ব্রিজের নিচ দিয়ে সামান্য যে পানি বয়ে চলেছে, তাতে নেই আগের সেই স্রোত। মানুষ এখন সহজেই হেঁটে পার হচ্ছে নদী। চরজুড়ে জন্ম নিয়েছে ঘাস আর এক সময়ে ব্যস্ত ঘাটে পড়ে আছে জরাজীর্ণ ফেরি। স্থানীয় জানায়, এক সময় শোলমারী নদী দিয়ে বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ-স্টিমারসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করতো। বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়া অঞ্চলের কৃষকদের পানির অন্যতম উৎস এই শোলমারী নদী। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রাণ হারিয়ে ফেলায় কৃষি কাজে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। এমনকি বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হচ্ছে। শোলমারী নদীর দুই তীরে বিস্তীর্ণ চর জেগে/ ছবি: জাগো নিউজ আরও পড়ুন:চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের দেখা পান দুই মিনিটঅবশেষে যশোরবাসীর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বপ্ন পূরণের পথেসরকারি হাসপাতালের দুঃখ জ
খুলনায় একসময়ের খরস্রোতা শোলমারী নদী আজ প্রাণধারা হারিয়ে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। দুই তীরে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর, যার অনেকাংশই এখন দখল ও দখলচাপের মুখে। যে নদীতে একসময় ফেরি চলত, জোয়ার-ভাটার ঢেউয়ে মুখর থাকত তীরবর্তী জনপদ—সেই নদী এখন প্রায় নিঃশব্দ, পানির প্রবাহও হয়ে পড়েছে ক্ষীণ।
বটিয়াঘাটা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ভৈরব নদী থেকে এসে বটিয়াঘাটা ব্রিজের নিচ দিয়ে সামান্য যে পানি বয়ে চলেছে, তাতে নেই আগের সেই স্রোত। মানুষ এখন সহজেই হেঁটে পার হচ্ছে নদী। চরজুড়ে জন্ম নিয়েছে ঘাস আর এক সময়ে ব্যস্ত ঘাটে পড়ে আছে জরাজীর্ণ ফেরি।
স্থানীয় জানায়, এক সময় শোলমারী নদী দিয়ে বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ-স্টিমারসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করতো। বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়া অঞ্চলের কৃষকদের পানির অন্যতম উৎস এই শোলমারী নদী। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রাণ হারিয়ে ফেলায় কৃষি কাজে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। এমনকি বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হচ্ছে।

শোলমারী নদীর দুই তীরে বিস্তীর্ণ চর জেগে/ ছবি: জাগো নিউজ
আরও পড়ুন:
চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের দেখা পান দুই মিনিট
অবশেষে যশোরবাসীর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বপ্ন পূরণের পথে
সরকারি হাসপাতালের দুঃখ জনবল খরা, আধুনিক যন্ত্রপাতি যেন ‘শো-পিস’
প্রিয়জনের হলুদ খাম এখন অতীত, যা আসে আইনি-তালাক নোটিশ
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোলমারী নদীর দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার। প্রস্থ ১৫০ মিটার এবং গড় গভীরতা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার। কিন্তু চর পড়ে এখন নদীর প্রশস্ত কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন থেকে চার ফুটে। বটিয়াঘাটা উপজেলার কাজীবাছা নদী থেকে শোলমারী নদীর উৎপত্তি। বিল ডাকাতিয়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ও পঞ্চু নদীর মধ্য দিয়ে সালতা নদীর সঙ্গে মিশেছে এটি। এরপর আবার জলমার কাছে মিলিত হয়েছে কাজীবাছা নদীতে।
‘জোয়ারে দাপিয়ে বেড়ানো নদীটি চোখের সামনেই নিস্তেজ হয়ে গেছে। আমরা এলাকাবাসীরা বিভিন্ন সময়ে নদীটি রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কেউ উদ্যোগ নেয়নি’
বটিয়াঘাটার স্থানীয় বাসিন্দা হিরক গোলদার বলেন, জোয়ারে দাপিয়ে বেড়ানো নদীটি চোখের সামনেই নিস্তেজ হয়ে গেছে। আমরা এলাকাবাসীরা বিভিন্ন সময়ে নদীটি রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কেউ উদ্যোগ নেয়নি। প্রায় এক যুগ ধরে নদীটি ছোট হতে হতে এখন নালায় পরিণত হয়েছে। অনেক বড় এলাকাজুড়ে চর পড়েছে। এখন নদীটি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে এই চর দখল হয়ে যাবে।
বটিয়াঘাটার বাসিন্দা মাছ ব্যবসায়ী তারক বলেন, সপ্তাহে ৩-৪ দিন মাছ নিয়ে শহরে যেতে হয়। একটা সময় শোলমারী নদী ট্রলার-ফেরিতে পাড় হয়ে ভ্যানে করে শহরে যেতে হতো। তারও আগে কাতিয়ানাংলা চরের পাড়ে দাঁড়াতাম। নদী পথে মাছ কিনে নিয়ে যেতো মোকামের লোকজন। তাদের কাছে ভালো লাভে নগদে মাছ বিক্রি করা যেতো। কিন্তু সেগুলো এখন আর নেই।
‘শোলমারী নদী প্রায় ৩০ কিলোমিটার। তার মধ্যে বটিয়াঘাটা অংশের সাড়ে ১২ কিলোমিটার খননের জন্য একটা প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হতে আরও দুই মাস সময় লাগতে পারে’
তিনি আরও বলেন, শোলমারী নদী এখন হেঁটে পাড় হওয়া যায়। আগে স্রোতের কারণে নদীর পাড়ে যেতেও ভয় লাগতো। সে দিনের কথা মনে পড়লে অনেকটা খারাপ লাগে। নদীটি এখন মরে গেছে।
আরও পড়ুন:
তাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট
কালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ
লোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকের
ডুমুরিয়ার বাসিন্দা ফরিদুল ইসলাম বলেন, শোলমারী নদীটি বটিয়াঘাটা হয়ে বিল ডাকাতিয়ার কাছে থেকে ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ও পঞ্চু নদীর মধ্য দিয়ে সালতা নদীর সঙ্গে মিশেছে। নদীর দৃশ্যমান উপকারিতা অনেক মানুষ টের না পেলেও পানি নিষ্কাশনে এই নদীর একটা বড় ভূমিকা ছিল। নদীটির সংযোগ পথগুলো চিহ্নহীন হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে ডুমুরিয়ার অনেক অংশ এখন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। জলাবদ্ধতা দূর করতে শোলমারী নদীর খনন প্রয়োজন।
‘সপ্তাহে ৩-৪ দিন মাছ নিয়ে শহরে যেতে হয়। একটা সময় শোলমারী নদী ট্রলার-ফেরিতে পাড় হয়ে ভ্যানে করে শহরে যেতে হতো। তারও আগে কাতিয়ানাংলা চরের পাড়ে দাঁড়াতাম। নদী পথে মাছ কিনে নিয়ে যেতো মোকামের লোকজন। তাদের কাছে ভালো লাভে নগদে মাছ বিক্রি করা যেতো। কিন্তু সেগুলো এখন আর নেই’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিপ্রযুক্তি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র সরকার বলেন, কৃষিতে নদীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকলেও পরোক্ষ একটা ভূমিকা রয়েছে। একটা সময় কৃষি আর ব্যবসা বাণিজ্য নদী কেন্দ্রিক ছিল।
নদীর মতো অনেক নদী বিলীন হয়ে যাওয়ায় কৃষি কাজ থেকে অনেক মানুষ সরে এসেছে। কৃষিপণ্য নিয়ে সড়ক পথে অনেক ঘুরে যেতে হয়। কিন্তু নদী পথে সহজে যাতায়াত করা যায়। এজন্য মানুষ একটা সময় কৃষি কাজে বেশি আগ্রহী থাকতো।
ফসলের সময় নদীর পানির প্রয়োজন না হলেও বৃষ্টির সময় মিষ্টি পানি প্রবাহে নদীর বড় ভূমিকা থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, লোকালয়ের সঙ্গে নদীর ক্যানেল বা কৃত্রিম জলপথ থাকলে একদিকে লোকালয়ের পানি বের হতে পারবে আর অন্যদিকে খড়ার সময়ে ক্যানেল আটকে নদীর পানি ব্যবহার করা যায়।
‘শোলমারী নদী এখন হেঁটে পাড় হওয়া যায়। আগে স্রোতের কারণে নদীর পাড়ে যেতেও ভয় লাগতো। সে দিনের কথা মনে পড়লে অনেকটা খারাপ লাগে। নদীটি এখন মরে গেছে’
ড. বিধান চন্দ্র সরকার বলেন, নদীর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় এই অঞ্চলের একমাত্র ফসল আমন উৎপাদনেও অনেক সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া বাস্তুসংস্থানেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। চর পড়ছে এবং তা দখল হয়ে যাচ্ছে। আমন ধান কাটার পরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় পানি সহজে নিষ্কাশন না হওয়াতে অন্য ফসল উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এজন্য নদী সংরক্ষণ এবং লোকালয়ের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও উন্নত হওয়া প্রয়োজন।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন জাগো নিউজকে বলেন, শোলমারী নদী প্রায় ৩০ কিলোমিটার। তার মধ্যে বটিয়াঘাটা অংশের সাড়ে ১২ কিলোমিটার খননের জন্য একটা প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হতে আরও দুই মাস সময় লাগতে পারে।
এআরএএন/এনএইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?