কংক্রিটের উইকেটও নেই, তবু আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন: মিরপুরের রাতুলের গল্প
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা। যেখানে নেই বড় কোনো স্টেডিয়াম, নেই আধুনিক একাডেমি। স্থানীয় কোচ ও ক্রিকেটার রায়হান উদ্দিন বলছিলেন, ‘আমাদের এমন একটা উপজেলা যেখানে কিন্তু কংক্রিটের কোনো উইকেটও নেই।’ সেই জায়গা থেকেই ধীরে ধীরে উঠে আসছেন সামিউন বাশার রাতুল। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের চলতি আসরে ব্যাটে-বলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে ইতোমধ্যেই আলোচনায় এই তরুণ অলরাউন্ডার। এরইমধ্যে খেলেছেন একটি যুব বিশ্বকাপও। তবে তার গল্পটা শুধু রান-উইকেটের নয়। এর ভেতরে আছে পরিবারের অদ্ভুত রকম সমর্থন, এক কোচের দীর্ঘ পরিকল্পনা, আর এক তরুণের নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষুধা। রাতুল যত ভালোই করেন, ক্ষুধা মেটে না। বলা হয় বড় ক্রিকেটার হতে গেলে ক্ষুধার সীমারেখা থাকা যাবে না। রাতুল যেন তারই উদাহরণ। নিজের সমালোচক নিজেই, নিজেকেই বলেন যেটা করছেন সেটা যথেষ্ট নয়। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে উঠতি এই ক্রিকেটার কথা বলেছেন তার শুরু, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে। ডিপিএলে সময়টা দারুণ কাটছে কি না—এমন প্রশ্নে রাতুলের উত্তরেই যেন ফুটে ওঠে তার মানসিকতা। রাতুল বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, চেষ্টা করছি ভালো করার। দলও যাতে আমার থেকে যেন অনেক কিছু পায়, দলের জন্য কন্ট্রিবিউট
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা। যেখানে নেই বড় কোনো স্টেডিয়াম, নেই আধুনিক একাডেমি। স্থানীয় কোচ ও ক্রিকেটার রায়হান উদ্দিন বলছিলেন, ‘আমাদের এমন একটা উপজেলা যেখানে কিন্তু কংক্রিটের কোনো উইকেটও নেই।’ সেই জায়গা থেকেই ধীরে ধীরে উঠে আসছেন সামিউন বাশার রাতুল। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের চলতি আসরে ব্যাটে-বলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে ইতোমধ্যেই আলোচনায় এই তরুণ অলরাউন্ডার। এরইমধ্যে খেলেছেন একটি যুব বিশ্বকাপও। তবে তার গল্পটা শুধু রান-উইকেটের নয়। এর ভেতরে আছে পরিবারের অদ্ভুত রকম সমর্থন, এক কোচের দীর্ঘ পরিকল্পনা, আর এক তরুণের নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষুধা। রাতুল যত ভালোই করেন, ক্ষুধা মেটে না। বলা হয় বড় ক্রিকেটার হতে গেলে ক্ষুধার সীমারেখা থাকা যাবে না। রাতুল যেন তারই উদাহরণ। নিজের সমালোচক নিজেই, নিজেকেই বলেন যেটা করছেন সেটা যথেষ্ট নয়। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে উঠতি এই ক্রিকেটার কথা বলেছেন তার শুরু, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে।
ডিপিএলে সময়টা দারুণ কাটছে কি না—এমন প্রশ্নে রাতুলের উত্তরেই যেন ফুটে ওঠে তার মানসিকতা। রাতুল বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, চেষ্টা করছি ভালো করার। দলও যাতে আমার থেকে যেন অনেক কিছু পায়, দলের জন্য কন্ট্রিবিউট করতে পারি এটাই চেষ্টা করে যাচ্ছি প্রথম থেকেই। কিন্তু আমি মনে করি আপ টু দ্য মার্ক হচ্ছে না এখনো, কারণ প্রতিটা ম্যাচেই ভুল করতেছি, ৪৬-৪০ করে আউট হয়ে যাচ্ছি। আরো ভালো করার দরকার। নেক্সট টাইমে ইনশাল্লাহ আরো ভালো হবে।’
ছয় ম্যাচে বিধ্বংসী এক সেঞ্চুরিতে ২৯৩ রান, সঙ্গে ১০ উইকেট। অনেকের কাছে দুর্দান্ত শুরু। কিন্তু রাতুলের নিজের চোখে এখনো অপূর্ণতা, ‘যতটুকু হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু অনেক জায়গা আছে যেমন আমি মনে করি ব্যাটিংয়ের বিষয়ে যে তিনটা ম্যাচে ৪৬, ৪৭ আর আজকে ৪৩ করে আউট হয়েছি। এখান থেকে অনেক, আরো বেশি কিছু করতে পারতাম টিমের জন্য। আর বোলিংয়ে তো আমি মনে করি আমি আহামরি এত ভালো করছি না। আমি চেষ্টা করছি আরো ভালো নিজের দলকে... আমার বোলিং দিয়ে আরো কন্ট্রিবিউট করতে পারি নিজের দলকে (জেতাতে পারি), চেষ্টা করছি। ইনশাল্লাহ নেক্সটে আরো ভালো কিছু হবে।’
এই আত্মসমালোচনার জায়গাটাই হয়তো রাতুলকে আলাদা করে। কারণ ৪৬ কিংবা ৪৭-এ থেমে যাওয়াতেও সে হতাশ হয়। ৬৪ বলে সেঞ্চুরির পর অনেকেই অবাক হয়েছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন আক্রমণাত্মক ইনিংস এখনও খুব নিয়মিত নয়। কিন্তু রাতুলের কাছে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ‘আমি নরমালি ওইভাবেই খেলি।’
লেগ সাইডে তার দাপট, স্লগ সুইপ, বিশাল ছক্কা—এসবের পেছনেও আছে ছোটবেলার গড়ে ওঠা। রাতুল বলছিলেন, ‘আলাদা কাজ বলতে ছোটবেলা থেকেই আমি স্বাধীনতা পেয়েছি আমার যে কোচদের সাথে প্র্যাকটিস করছি, ওনারাই বলছে খুব ভালো হয় ছয়... ছোটবেলা থেকেই শর্টস খেলে খেলে বড় হয়েছি, এটার জন্য এখন আর... কিছু মনে হয় না। মনে হয় যে ব্যাটে ভালোভাবে লাগলে বল পার হয়ে যাবে এটাই।’
তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না, ‘প্রতিনিয়ত উন্নতি করার চেষ্টা তো করতে হবে। না হলে একই জায়গায় থাকলে তো আর হবে না। জাতীয় পর্যায়েও যদি খেলি ইনশাল্লাহ ডমিনেট করতে হবে তো। সেটার জন্য যে স্কিল আছে এখান থেকে আরো কিছু ইম্প্রুভ করার আছে।’
বাঁহাতি ব্যাটিং-বোলিং, অলরাউন্ড পারফরম্যান্স—স্বাভাবিকভাবেই অনেকে তার মধ্যে সাকিব আল হাসানের ছায়া খুঁজছেন। কিন্তু রাতুল নিজের পরিচয় নিজেই গড়তে চান, ‘আমি নিজেকে রাতুল হিসেবেই বড় হতে চাই। আমি কখনো সাকিব আল হাসানের সাথে নিজেরে তুলনা করি না। আমি নিজেকে রাতুল, রাতুল হিসেবেই বড় হইতে চাই। সাকিব আল হাসান কিংবদন্তি আমি চেষ্টা করবো নিজের মতো হওয়ার। আর সাকিব ভাই তো সাকিব ভাই, উনার জায়গা কেউ নিতে পারবে না।’
বাংলাদেশের অনেক তরুণ ক্রিকেটারের গল্পেই পরিবার নিয়ে সংশয়, বাধা বা অনিশ্চয়তার কথা থাকে। রাতুলের গল্পটা উল্টো। তিনি বলছিলেন, ‘আমার ফ্যামিলি সাপোর্ট শুরু থেকে এ পর্যন্ত... আলহামদুলিল্লাহ কখনো আমাকে আমি খারাপ করছি বা ভালো করছি কখনো আমাকে কোনদিন আমাকে কিছু বলেনি। অনেক সময় খেলাধুলা করলে বা খারাপ খেললে অনেক পরিবার থেকেই নানা কথা শোনায়। কিন্তু আমার কোনোদিন কোনো কথা শোনা লাগেনি।’
ক্রিকেটে রাতুলের হাতেখড়ি বড় ভাই রায়হান উদ্দিনের কাছে। তাকে নিয়ে বলছিলেন, ‘আমার ক্রিকেট জার্নি বলতে আমার এক বড় ভাই আছে উনার কাছ থেকে শুরু, রায়হান উদ্দিন তার নাম। উনি আমার কোচিং করায় এখনো। উনিও ফার্স্ট ক্লাস প্লেয়ার, লিস্ট এ ক্রিকেট খেলছে। আমার কোচ ছিল সাইফ আহমেদ। সাইফ ভাই আমাকে অনেক কাজ করিয়েছে। আমি সবসময় তাদের কথাই বলি, আমার কোচ যারা যারা তাদের কথাই সবসময় স্মরণ করি। রিপন (ইমদাদুল বাশার) স্যার আছে।’
বাংলাদেশে বাঁহাতি স্পিনারের সংখ্যা অনেক। প্রতিযোগিতাও কঠিন। কিন্তু এ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা নেই রাতুলের। কারণ তার নিজের ভাষায়, ‘আমি তো ব্যাটিং করতে পারি।’ বোলিং নিয়েও তার দর্শন সহজ, ‘আমার নিজের কাছে মনে হয়... আমার শক্তির জায়গা... আমার বোলিং অ্যাকশন।’ আর বৈচিত্র্যের চেয়ে নিজের স্বাভাবিক বোলিংয়েই আস্থা বেশি, ‘আমি আমার স্টক বল করি। স্টক বলে আল্লাহর রহমতে ভালো কিছু হয়। স্টক... মানে নরমাল যে বোলিং করি ঐ বোলিংটাই করার চেষ্টা করি। অত ইম্প্রোভাইজ করার চেষ্টা করি না সচরাচর।’
বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে ডিপিএল পর্যন্ত নিজের যাত্রাটাকেও পুরোপুরি সফল বলতে রাজি নন রাতুল, ‘আমি সবসময় পারফর্ম করেই বড় হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ বয়স ভিত্তিক ক্রিকেটে। কিন্তু আমি আমার পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট না, আন্ডার নাইনটিনে যে খেলাগুলো হয়েছে। এখন চেষ্টা করবো আমি যেখানেই খেলি আমার পারফর্মটা দেখানোর। কারণ পারফর্মেই তো সবার কথা বলে।’
প্রিয় ক্রিকেটার নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো নাম দিতে চাননি, ‘আমি ওইভাবে কাউকে ফলো করি না। বাট আমার অনেকগুলা প্লেয়ার পছন্দ। সাকিব ভাইয়ের বোলিং আছে, দেন... আছে, কার নাম বলবো, আমি সবার খেলাই দেখি… বেন স্টোকসের ব্যাটিং দেখি।’
রাতুলের গল্পের সবচেয়ে আবেগী অংশটা হয়তো তার কোচ ও আত্মীয় রায়হান উদ্দিনের কথাতেই। রায়হান এখনও খেলেন। কোচিংও করান। আর সেই মানুষটাই প্রথম ছোট্ট রাতুলের মধ্যে কিছু একটা দেখেছিলেন। রাতুলের শুরু নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ও মাঝে মাঝে মাঠে আসতো। এসে বল-টল মারতো ওই দেখতাম যে বাম হাত দিয়ে বল মারতেছে। তিন চার ড্রপে বল আমার কাছে পৌঁছাতো অনেক ছোট ছিল। মানে চার পাঁচ বছর বয়স ওই সময়। এরপর একদিন ওর পরিবার থেকে আমাকে বললো যে আমার ছেলেটা তোমার হাতে দিয়ে দিতে চাই।’
আজও রাতুলের জীবনের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তে জড়িয়ে আছেন তিনি, ‘ওর যত প্র্যাকটিস আছে, তারপরে ওর দৈনন্দিন রুটিন থেকে শুরু করে, ওর সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা জিনিসই ও এখনো আমি কন্ট্রোল করি।’
রাতুলের পাওয়ার হিটিংয়ের পেছনের গল্পটাও আলাদা, ‘আমি ওকে কখনোই মানে খারাপ উইকেটে বাইরে খেলতে যেতে দেই নাই। খারাপ উইকেটে খেললে তো ছোট একটা নষ্ট হইতে পারে।’
তারপর আসে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অংশ, ‘রাতুলকে আমি বালুর ভিতরে প্র্যাকটিস করিয়েছি। কারণ ওর ওই যে লেফট সাইড খেলার প্রবণতা বেশি থাকতো। ওর ব্যালেন্সটা একটু কম পেতো। আমি ওকে বালুর ভিতরে লাস্ট কয়েকটা দিন প্র্যাকটিস করিয়েছি। ব্যাটিং কিন্তু বালুর ভিতরে প্র্যাকটিস হয় না। কিন্তু আমি বালুর ভিতরে ওর ব্যাটিং করাইছি। টেনিস বলে, পেস বলে, স্পিন সব।’
রায়হানের বিশ্বাস, সেই অনুশীলনের ফল এখন দেখা যাচ্ছে, ‘ও বলছে ভাইয়া বালুর ভিতর প্র্যাকটিস করার কারণে আমার এই প্রিমিয়ার লিগে এসে শটগুলো আমি মারতে পারছি।’
তবে তার কাছে এটুকু যথেষ্ট নয়। ‘আমি বলছি যে খুশি হওয়ার কিছুই নাই। জাস্ট এটা শুরু। আমি চাই যে ২০ বছর এইভাবে বাংলাদেশকে সার্ভিস দিবে অবশ্যই জাতীয় দলে।’
জাতীয় দলে খেলতে কী করতে হবে, সেটাও খুব ভালো করেই জানেন রাতুল, ‘ধারাবাহিক পারফর্ম করতে হবে। যেখানে সুযোগ পাবো সেখানে পারফর্ম করবো ইনশাআল্লাহ। করতে হবে। করবো বলতে করতে হবে। না হলে তো আর সিলেক্টররা সুযোগ দিবে না।’
আর তার কোচ রায়হান উদ্দিনের স্বপ্ন, আমি চাই যে রাতুল ন্যাশনাল টিমে খেলবে। ন্যাশনাল টিমে খেলবে এবং খেলার পরে আমার এলাকায় যেন খেলার কালচারটা আরেকটু ডেভেলপ হয়।’
এসকেডি/আইএন
What's Your Reaction?