কোরবানি ইসলামের অন্যতম বিধান। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ এই তিন দিনের যে কোনো এক দিন পশু কোরবানি করতে হয়। মহান আল্লাহর কাছে এ দিনগুলোয় কোরবানি করার চেয়ে প্রিয় আর কিছুই নেই। আসুন জেনে নিই কাদের ওপর কোরবানি করা আবশ্যক। কত টাকার মালিক হলে আপনাকে পশু জবাই করতে হবে। মহিলা ও শিশুদের কোরবানির বিধান বিষয়েও জানা জরুরি
কোরবানি যাদের ওপর ওয়াজিব
শরিয়তে পরিভাষায় কোরবানির জন্য সামর্থ্যবান হওয়ার ব্যাপারটি নিরূপণ করা হয় আর্থিক সামর্থ্যের মাধ্যমে। তাই কোরবানির দিনগুলোয় যদি কেউ শরিয়তের পরিমাপে সম্পদশালী হয়, তা হলে তার পক্ষ থেকে কোরবানি আদায় করতে হবে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত ভরি। আর রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি। আর অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের সম্পদ। স্বর্ণ বা রুপার কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না হয়, তবে স্বর্ণ-রুপা উভয় মিলে কিংবা এর সঙ্গে প্রয়োজন-অতিরিক্ত অন্য বস্তুর মূল্য মিলে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের হলেও সম্পদশালী হিসেবে গণ্য হবে এবং কোরবানি ওয়াজিব হবে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) পক্ষ থেকে ঘোষিত ৫ মে ২০২৬ তারিখের তথ্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রূপার দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রূপা ৫ হাজার ১৯০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৪৯০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রূপার দাম ৩ হাজার ৩৮৩ টাকা। এই দরের ভিত্তিতে, বিশেষত মধ্যম মানের ১৮ ক্যারেট রুপার বাজারমূল্য বিবেচনায়, এ বছর যদি কারও কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৫ (দুই লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার সাতশ পঁচিশ) টাকার সমপরিমাণ সম্পদ বা নগদ অর্থ থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। তবে স্বর্ণ ও রুপার বাজারমূল্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। তাই ১০ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে যে মূল্য কার্যকর থাকবে, সে অনুযায়ী কোরবানির নিসাবও নির্ধারিত হবে। তাই ওপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সময়ের মধ্যে যে দর ঘোষিত হবে, তার ওপর ভিত্তি করে কোরবানি ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬, আলমুহিতুল বুরহানি: ৮/৪৫৫)/
কুরবানি কি শুধু পরিবারপ্রধান দেবেন?
আমাদের দেশে অধিকাংশ স্থানে শুধু পরিবারপ্রধানের পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া হয়। এটা ভুল পদ্ধতি। ইসলাম ব্যক্তি স্বাধীনতায় ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাস করে। তাই প্রত্যেক ব্যক্তি আলাদা আলাদাভাবে সম্পদশালী হলে প্রত্যেকের পক্ষ থেকে কোরবানি দিতে হবে।
মহিলাদের পক্ষ থেকে কোরবানি
মহিলারাও কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে সম্পদশালী হতে পারেন। পিতার পক্ষ থেকে উপহার পাওয়ার মাধ্যমে, স্বামীর পক্ষ থেকে দেনমোহর প্রাপ্তির মাধ্যমে, চাকরি করার সুবাদে, ব্যবসা করার মাধ্যমে, উত্তরাধিকার মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়ে। যদি কোনো মহিলা নিজস্বভাবে সম্পদশালী হন, তা হলে তার নিজের পক্ষ থেকেও কোরবানি করতে হবে। নিজ দায়িত্বে কোরবানি না করলে গুনাহগার হবে। তবে তার পক্ষ থেকে স্বামী, পিতা, ছেলে, ভাই বা অন্য কেউ আদায় করে দিলে সে দায়িত্বমুক্ত হবে।
বাচ্চাদের পক্ষ থেকে কোরবানি
অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয় না। বাচ্চারা সম্পদশালী হলেও তার পক্ষ থেকে কোরবানি করা ওয়াজিব হয় না। তবে তার পক্ষ থেকে অভিভাবক কোরবানি করলে তা জায়েজ হবে। পিতা বা মাতা যদি আলাদাভাবে সম্পদশালী না হন, তার পক্ষ থেকেও কোরবানি করলে তা আদায় হবে। মুসাফিরের পক্ষ থেকে কোরবানি করা ওয়াজিব নয়। তবে আদায় করলে তা জায়েজ হবে। গরিব ব্যক্তির পক্ষ থেকেও কোরবানি নেই। তবে আদায় করলে তা জায়েজ হবে। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তারা যেন সানন্দে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করে সুন্নতে ইবরাহিমি আদায় করতে পারি। আল্লাহতায়ালা আমাদের তওফিক দিন।
লেখক: ইমাম ও মাদ্রাসা শিক্ষক