খোয়াইয়ের বাঁধে ভাঙন, এক রাতেই ভেসে গেল মানুষের ঘর, ফসল ও স্বপ্ন

‘আজ তিন দিন ধইরা গো সোনা, ভাত কী জিনিস দেখতাছি না। ছেঁড়া কাপড় পইড়া আছি। একটা কাপড় ভিজে, আবার শুকাইলে ওইটাই পরি; বদলানোর মতো অন্য কোনো কাপড় নাই। ঘরদোর ভাইঙা পানিতে লইয়া গেছেগা। খাওয়ার মতো কিছু নাই। পোলাপান লইয়া একেবারে অসহায় হইয়া পড়ছি। একটু উঁচা জায়গায় বইয়া রইছি, পানি সব শেষ কইরা দিছে। আমার স্বামীর হার্টের অসুখ, প্রেসারের অসুখ। এই মানুষটারে লইয়া কেমনে বাঁচমু বাবা? তোমরা আমারে একটু সাহায্য করো...’ কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধা মরিয়ম বিবি। তার চোখের জল যেন শুধু নিজের নয়, খোয়াই নদীর ভয়াল বন্যায় সর্বস্ব হারানো হাজারো পরিবারের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। ভাঙা ঘর, কাদায় ডুবে থাকা আসবাবপত্র আর ভেসে যাওয়া চাল-ডাল সবকিছু যেন তার জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামকে মুহূর্তেই তছনছ করে দিয়েছে। মরিয়ম বিবির বাড়ির পাশেই চরহামুয়া গ্রাম। সেখানকার রোকেয়া বেগমের গল্পও ভিন্ন নয়। ঘরের পানি কিছুটা নামলেও এখনো সেখানে হাঁটুসমান পানি ও কাদার আস্তরণ। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘একবারে নির্মম অবস্থা। আমার ঘরে কোমর পর্যন্ত পানি উই

খোয়াইয়ের বাঁধে ভাঙন, এক রাতেই ভেসে গেল মানুষের ঘর, ফসল ও স্বপ্ন
‘আজ তিন দিন ধইরা গো সোনা, ভাত কী জিনিস দেখতাছি না। ছেঁড়া কাপড় পইড়া আছি। একটা কাপড় ভিজে, আবার শুকাইলে ওইটাই পরি; বদলানোর মতো অন্য কোনো কাপড় নাই। ঘরদোর ভাইঙা পানিতে লইয়া গেছেগা। খাওয়ার মতো কিছু নাই। পোলাপান লইয়া একেবারে অসহায় হইয়া পড়ছি। একটু উঁচা জায়গায় বইয়া রইছি, পানি সব শেষ কইরা দিছে। আমার স্বামীর হার্টের অসুখ, প্রেসারের অসুখ। এই মানুষটারে লইয়া কেমনে বাঁচমু বাবা? তোমরা আমারে একটু সাহায্য করো...’ কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধা মরিয়ম বিবি। তার চোখের জল যেন শুধু নিজের নয়, খোয়াই নদীর ভয়াল বন্যায় সর্বস্ব হারানো হাজারো পরিবারের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। ভাঙা ঘর, কাদায় ডুবে থাকা আসবাবপত্র আর ভেসে যাওয়া চাল-ডাল সবকিছু যেন তার জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামকে মুহূর্তেই তছনছ করে দিয়েছে। মরিয়ম বিবির বাড়ির পাশেই চরহামুয়া গ্রাম। সেখানকার রোকেয়া বেগমের গল্পও ভিন্ন নয়। ঘরের পানি কিছুটা নামলেও এখনো সেখানে হাঁটুসমান পানি ও কাদার আস্তরণ। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘একবারে নির্মম অবস্থা। আমার ঘরে কোমর পর্যন্ত পানি উইঠা গেছিল। ঘরের সব জিনিস নষ্ট হইয়া গেছে। আমাদের নতুন কইরা এই জীবনে আর জিনিসপত্র কেনার সামর্থ্য নাই রে সোনা।’ একই ইউনিয়নের নোয়াবাদ গ্রামের কৃষক মনু মিয়ার কণ্ঠেও চরম হতাশা। কয়েক মাসের পরিশ্রমে গড়ে তোলা চারটি মাছের ঘের, ক্ষেতের আউশ ধান আর ঘরে মজুত রাখা সাত-আট মণ ধান সবই কেড়ে নিয়েছে বন্যার পানি। সম্পদ হারানোর পাশাপাশি ভেঙে গেছে তার বসতঘরও। ঘর চাপা পড়ে আহত হয়েছে তার একমাত্র ছেলে।  চোখের পানি লুকিয়ে তিনি বলেন, ‘জীবনে যা কামাইছিলাম, এক রাতেই সব শেষ। আমি এখন একেবারে নিঃস্ব।’ মাত্র একটি রাত। কয়েক ঘণ্টার পাহাড়ি ঢল। আর তাতেই বদলে গেছে হবিগঞ্জের হাজারো মানুষের জীবন। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে ফুলে-ফেঁপে ওঠা খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় ভেঙে যায়। মুহূর্তের মধ্যে প্রবল স্রোতের পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। রাতের অন্ধকারে প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মানুষ। কেউ কোলে শিশু, কেউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে ধরে, কেউবা গরু-ছাগল নিয়ে ছুটেছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। অনেকেই কিছুই নিতে পারেননি। চোখের সামনে ভেসে গেছে জীবনের সব সঞ্চয়। বাঁধ ভাঙার ফলে সদর উপজেলার লস্করপুর ও পইল ইউনিয়ন এবং বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ইউনিয়নের অন্তত ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সবজির ক্ষেত, ফলের বাগান, মাছের ঘের, পোল্ট্রি খামার ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যায়। হবিগঞ্জ-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৬৯৭ হেক্টর আউশ ধান, ১৩১ হেক্টর শাকসবজি এবং ২০ হেক্টর ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকশ পুকুর ও মাছের ঘেরের মাছ ভেসে যাওয়ায় মৎস্যচাষিদের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। হাঁস-মুরগি, পোল্ট্রি খামার এবং ছোট শিল্প-প্রতিষ্ঠানও ক্ষতির মুখে পড়েছে। শুধু সদর উপজেলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র চালু করে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার তথ্যমতে, তিন উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৬ হাজার ৪৪৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং প্রায় ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নগদ অর্থ, ১০০ মেট্রিক টন চাল এবং শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবুও প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক পরিবার এখনও পর্যাপ্ত সহায়তার অপেক্ষায়। এদিকে খোয়াই নদীর পানি এখন কমতে শুরু করেছে৷ কিন্তু হাওরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কুশিয়ারা, কালনী-কুশিয়ারা ও সুতাং নদীর পানি এখনো কিছুটা বিপৎসীমার ওপরে থাকায় বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাইয়ের হাওরাঞ্চলেও নতুন করে বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ও তীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে।  চরহামুয়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রভাবশালীদের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। তাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ ফিরে আসবে। রোববার (১২ জুলাই) ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব জি কে গউছ অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।  তিনি বলেন, খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো বৈধ ইজারা নেই। আইন ভঙ্গ করে যারা এ কাজে জড়িত, তারা যে-ই হোক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খোয়াইয়ের পানি ধীরে ধীরে নামছে। কিন্তু বন্যার পানি যে ক্ষত মানুষের জীবনে রেখে গেছে, তা এতো সহজে শুকাবে না। মরিয়ম বিবির খালি হাঁড়ি, রোকেয়া বেগমের কাদায় ভরা ঘর আর মনু মিয়ার খালি মাছের ঘের- সবই সাক্ষ্য দিচ্ছে, একটি বাঁধ ভাঙা শুধু মাটি ভাঙে না; ভেঙে দেয় মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর বহু বছরের কষ্টে গড়া জীবনও।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow