গণপিটুনিতে নিহত রূপলালের ছেলে এখন বাবার পেশায়

9 hours ago 3

রংপুরের তারাগঞ্জ হাটের জুতাপট্টির সামনে একটি চকির ওপর বসে মনোযোগ দিয়ে জুতা সেলাই করছিল ১৪ বছরের কিশোর জয় দাস। কাজটি তার কাছে নতুন নয়। কারণ, এটি তার বাবা রূপলাল দাসেরই পেশা। তবে যে বয়সে তার হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সেই বয়সে স্কুল বাদ দিয়ে তাকে নামতে হয়েছে বাবার পেশায়। 

কারণ, গত ৯ আগস্ট একদল উত্তেজিত জনতা ভ্যান চোর সন্দেহে তার বাবা রূপলাল দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় রূপলালের জামাতা প্রদীপ দাসও নিহত হন।

পাঁচ সদস্যের পরিবারে রূপলালই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গণপিটুনিতে তার মৃত্যুর পর সংসারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। বাবা না থাকায় দাদি, মা ও দুই বোনকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে জয়। 

বাধ্য হয়ে তাকেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে পুরো পরিবারের দায়িত্ব। নিজের পড়াশোনা ছেড়ে বাবার পেশা, অর্থাৎ জুতা সেলাইকেই জীবন সংগ্রামের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে এই কিশোর।

তবে বাবা বেঁচে থাকলে এত দ্রুত তাকে সংসারের হাল ধরতে হতো না বলেই মনে করে জয়। তার ভাষায়, ‘বাবার মৃত্যুর পর দাদি, মা ও দুই বোনকে নিয়ে সংসার চালাতে শেষ পর্যন্ত বাবার পেশাটাই কর্ম হিসেবে বেছে নিলাম। তাদের (পরিবারের সদস্যদের) দেখাশোনার ও ভরণপোষণের দায়িত্ব তো এখন আমার ওপরেই। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি আমাকে সংসারের হাল ধরতে এ কাজে আসতে হতো না। এখন এ বয়সেই বাবার কাজে ফিরতে হলো।’

পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন ছিল বলেও জানায় জয়, ‘আজ আমি বাবাহারা, আমরা কর্মহীন পাঁচ সদস্যের পরিবার। যারা আমাকে স্কুলজীবন থেকে বঞ্চিত করে, পেটের ভাত জোগাতে কর্মে বসিয়েছে, আমি তাদের বিচার চাই। আমার ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা করার। আমি তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির মানবিক বিভাগে পড়ছি। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর আমরা তো দিশাহারা, পড়ালেখা আর হবে কি না উপরওয়ালা ভালো জানেন।’

জুতাপট্টির অনেকেই বলছেন, রূপলাল দাস ছিল একজন সহজ সরল মানুষ, চোখে পড়েনি কারও সঙ্গে কোনো ঝগড়া বিবাদ। কিছু দুষ্কৃতকারী নিরীহ লোকটিকে ভ্যান চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করেছে। পরিবারটি আজ নিঃস্ব, যে বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে জয় ধরেছে সংসারের হাল।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু হানিফ বলেন, গত ১২টি বছর রূপলাল আমার দোকানের সামনে বসে জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতেন। আজ সেই জায়গায় জীবন সংগ্রামের চেষ্টায় তার স্কুলপড়ুয়া ছেলে বসেছে— এ বেদনার দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে কষ্ট দেয়। রূপলাল খুব সরল ও সৎ মানুষ ছিলেন।

জয়ের মা মালতি রানী বলেন, ‘উপার্জন করার মতো সংসারে আর কোনো পুরুষ নেই, ছেলেটাই একমাত্র ভরসা। তার আয়ে আমাদের কোনোভাবে বাঁচতে হবে। কিছু মানুষ চিরদিনের জন্য আমাদের সুখ-শান্তি কেড়ে নিয়েছে। আমি তো মা! বুকটা ফেটে যায়, ছেলেটা স্কুলের বদলে কামাই (উপার্জন) করতে যায়।’

রূপলালের বড় মেয়ে নূপুর দাস বলেন, ‘ছোট ভাইকে স্কুল ছেড়ে ফুটপাতে জুতা সেলাইয়ের কাজ করতে হতো না, যদি বাবা বেঁচে থাকত।  সবচেয়ে বড় দুঃখ, ছোট ভাইয়ের রোজগারে চলছে আমাদের সংসার। আমার কোনো উপায় থাকলে জয়কে কাজ করতে যেতে দিতাম না।’

তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল হক বলেন, ‘জয় আমাদের ছাত্র, তাকে রাস্তায় জুতা সেলাই করতে দেখে মন ভেঙে গেছে। বাবাকে হারানোর শোক না কাটতেই তাকে পড়াশোনা ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব নিতে হলো। এ নিয়তি সমাজের জন্য এক নিদারুণ শিক্ষা।’

উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট রাতে রূপলাল দাস (৪৮) ও তার ভাগ্নি জামাই প্রদীপ লাল দাস (৪৭) ভ্যানে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে তারাগঞ্জের সয়ার ইউনিয়নের বুড়িরহাট বটতলায় ভ্যান চোর সন্দেহে স্থানীয়রা তাদের আটক করে। এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই সেখানে গণপিটুনিতে নিহত হন রূপলাল। গণপিটুনিতে আহত প্রদীপ লালকে হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। 

এ ঘটনায় পরদিন রূপলালের স্ত্রী মালতি রানী দাস অজ্ঞাত পরিচয় ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে আসামি করে তারাগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

Read Entire Article