‌‘ছাত্রদের রক্ত দেখে শিক্ষক ঘরে থাকতে পারেন না’

‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে রাজপথে যখন রক্ত ঝরছিল, তখন শ্রেণিকক্ষ কিংবা নিজের কোয়ার্টারে নিশ্চুপ বসে থাকা সম্ভব হয়নি অনেক শিক্ষকের পক্ষেই। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নৈতিক দায়িত্ব পালনের মূল্য দিতে গিয়ে সহকর্মীদের সমালোচনা ও প্রশাসনিক চাপ—সবই সইতে হয়েছে।’ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাদানের নৈতিকতা, গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা এবং ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জাগো নিউজের মুখোমুখি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিস্তার জাহান কবীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক। জাগো নিউজ: জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? ড. নিস্তার জাহান কবীর: জুলাই আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিনি। একজন শিক্ষক হিসেবে দেখেছি। যখন আমার শিক্ষার্থীরা ফোন করে বলছে, তাদের ধরে ধরে মারধর করা হচ্ছে, তখন একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সামনে দুটি পথ ছিল। নীরব থাকা কিংবা তাদের পাশে দাঁড়ানো। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছি। আমার বিশ্বাস, রাস্তায় থাকা একজন শিক্ষার্থীর ঝুঁকি একজন শিক্ষকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। একটি গুলি স

‌‘ছাত্রদের রক্ত দেখে শিক্ষক ঘরে থাকতে পারেন না’

‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে রাজপথে যখন রক্ত ঝরছিল, তখন শ্রেণিকক্ষ কিংবা নিজের কোয়ার্টারে নিশ্চুপ বসে থাকা সম্ভব হয়নি অনেক শিক্ষকের পক্ষেই। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নৈতিক দায়িত্ব পালনের মূল্য দিতে গিয়ে সহকর্মীদের সমালোচনা ও প্রশাসনিক চাপ—সবই সইতে হয়েছে।’

আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাদানের নৈতিকতা, গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা এবং ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জাগো নিউজের মুখোমুখি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিস্তার জাহান কবীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক।

জাগো নিউজ: জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: জুলাই আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিনি। একজন শিক্ষক হিসেবে দেখেছি। যখন আমার শিক্ষার্থীরা ফোন করে বলছে, তাদের ধরে ধরে মারধর করা হচ্ছে, তখন একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সামনে দুটি পথ ছিল। নীরব থাকা কিংবা তাদের পাশে দাঁড়ানো। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছি।

আমার বিশ্বাস, রাস্তায় থাকা একজন শিক্ষার্থীর ঝুঁকি একজন শিক্ষকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। একটি গুলি সবসময় তাদের জন্য প্রস্তুত ছিল। আমাদের জন্য নয়। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে আহত শিক্ষার্থীদের অবস্থা জানতে পারি। তখন আরও স্পষ্ট হয়, পরিস্থিতি কত ভয়াবহ ছিল।

jagonews24জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিস্তার জাহান কবীর/ছবি: শিক্ষকের সৌজন্যে

একজন শিক্ষক যদি নিজের শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত, আহত কিংবা নিহত হতে দেখেও ঘরে বসে থাকেন, তাহলে শিক্ষকতার নৈতিক দায় তিনি পালন করছেন না। আমি তখন কোনো দল, মত বা রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করিনি। আমার কাছে তখন শুধু আমার শিক্ষার্থীরাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জাগো নিউজ: জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানকে একজন শিক্ষক এবং সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরাসরি সাহায্যের আবেদন পেয়েছিলাম। তারা বলছিল, তাদের ওপর হামলা হচ্ছে, কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছে না। আমি মনে করেছি, একজন শিক্ষক হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরে বিভিন্ন ভিডিও, ছবি ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় যে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র দেখেছি, তা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

বিশেষ করে সন্তান হারানো মায়েদের আহাজারি, আহত তরুণদের দৃশ্য- এসব কোনো সংবেদনশীল মানুষকে স্থির থাকতে দেয় না। আন্দোলন শেষ হওয়ার পরও সেই মানসিক অভিঘাত দীর্ঘদিন আমাকে তাড়া করেছে।

জাগো নিউজ: সংকটকালে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোকে আপনি কীভাবে দেখেন? এই আন্দোলনে শিক্ষকদের সার্বিক ভূমিকা কেমন ছিল?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: আমি মনে করি, একজন শিক্ষকের প্রথম পরিচয় তিনি শিক্ষক। তিনি কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, সেটা পরে। যখন শিক্ষার্থীরা সংকটে থাকে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোই একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব।

যারা সেই সময় শিক্ষার্থীদের কষ্ট, ভয় ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি সহানুভূতি দেখাননি, তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একজন শিক্ষক যদি নিজের শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নেও নীরব থাকেন, তাহলে সেটি আত্মসমালোচনার বিষয়।

জাগো নিউজ: শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আপনাকে কী কোনো ব্যক্তিগত চাপ, হয়রানি বা সহকর্মীদের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: হ্যাঁ, আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক সংগঠন, বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি- বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এসবের একটি বড় অংশ এসেছে আমারই সহকর্মীদের কাছ থেকে। এগুলো আমাকে ব্যক্তিগতভাবে কষ্ট দিয়েছে। কারণ, আমি যা করেছি, তা একজন শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ববোধ থেকেই করেছি। 

জাগো নিউজ: আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ত্যাগ ও ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বৃহত্তর স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। আমি মনে করি, ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস লিখতে গেলে এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা বিশেষভাবে স্থান পাবে।

jagonews24জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিস্তার জাহান কবীর/ছবি: আশিকুজ্জামান

জাগো নিউজ: আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও সত্যি ঘটনা প্রচারে ছবি, ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতটা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ঘটনা প্রচলিত গণমাধ্যমে আসার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে। ছবি ও ভিডিও শুধু তথ্য দেয়নি, মানুষের আবেগকেও নাড়া দিয়েছে। একটি শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল অনেক সময় শত শব্দের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশনের শিক্ষার্থীদের জন্য এখান থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো। ক্যামেরা শুধু শিল্পের মাধ্যম নয়, ইতিহাস সংরক্ষণেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

জাগো নিউজ: মিডিয়া ও ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশনের শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের ঘটনা থেকে প্রধান শিক্ষণীয় দিক কী হতে পারে?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিডিও বা ছবি ধারণ করার পাশাপাশি তার সত্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ডকুমেন্টেশন শুধু একটি ঘটনার রেকর্ড নয়; এটি ভবিষ্যতের গবেষণার উপাদান। তাই নৈতিকতা, নির্ভুলতা এবং সংবেদনশীলতা- এই তিনটি বিষয় সবসময় মাথায় রাখতে হবে।

জাগো নিউজ: আন্দোলনের দুই বছর পর ফিরে তাকালে কী মনে হয়, এর মূল উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: এক-দুই বছরে সব পরিবর্তন সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা নানা কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে সময় লাগে। তবে সংস্কারের প্রক্রিয়া যেন সঠিক পথে এগোয়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যে কোনো সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা এবং ভুল কাজের সমালোচনা-দুটিই নাগরিক দায়িত্ব।

জাগো নিউজ: বর্তমান সময়ে সমাজে বিদ্যমান বিভাজন, অপপ্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: সমাজে বিভাজন ও প্রচারণাভিত্তিক রাজনীতি বড় চ্যালেঞ্জ। সত্য ও গুজবের পার্থক্য বোঝা এখন আগের চেয়ে বেশি জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য বা পুরোনো ঘটনাকে নতুন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সুতরাং তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করা উচিত নয়।

জাগো নিউজ: স্বৈরাচার পরবর্তীসময়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন কী ধরনের জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মানুষের একাডেমিক অবদান, গবেষণা, আচরণ, নেতৃত্ব এবং নৈতিক অবস্থান- এসব বিবেচনায় মূল্যায়ন হওয়া উচিত। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে কাউকে বিচার করা উচিত নয়। ভালো মানুষকে সামনে আনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

জাগো নিউজ: বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জুলাইয়ের চেতনা এখনো আছে বলে মনে করেন?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: আমার অভিজ্ঞতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষা এখনো রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন আসে। আমি চাই তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ঘৃণা না করে। মানুষকে তার কাজ ও চরিত্র দিয়ে মূল্যায়ন করুক।

জাগো নিউজ: জুলাই আন্দোলনের চেতনা রক্ষায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

ড. নিস্তার জাহান কবীর: এটি এখনই পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। ভিডিও, ছবি, সাক্ষাৎকার, দলিল- সবকিছু পদ্ধতিগতভাবে আর্কাইভে রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ আর্কাইভ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান- সবাইকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

কারণ, ৫০ বা ১০০ বছর পরে গবেষকরা যখন এই সময় নিয়ে কাজ করবেন, তখন এসব দলিলই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শুধু ইতিবাচক নয়, বিতর্কিত বা ভিন্নমতও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ইতিহাস তখনই পূর্ণাঙ্গ হয়, যখন তার সব দিক সংরক্ষিত থাকে।

জাগো নিউজ: জাগো নিউজকে সময় দেওয়ায় আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. নিস্তার জাহান কবীর: জাগো নিউজকেও অনেক ধন্যবাদ।

এমডিএএ/এমআরএম/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow