ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির অন্যতম ‘জাকাত’। জাকাত শব্দের অর্থ পবিত্র হওয়া, পরিশুদ্ধ হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া। মহান আল্লাহ জাকাতকে ‘বঞ্চিত ও মুখাপেক্ষী মানুষের অধিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাকাতকে সুদবিহীন দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের বাহন এবং নিজের অর্জিত সম্পদ পবিত্র করার মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা জারিয়াতের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তাদের (সম্পদশালীদের) ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।’ সুরা তওবার ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি ওদের ধনসম্পদ থেকে সদকা আদায় করো, এর দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করে দেবে।’ সুরা রোমের ৩৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য তোমরা যা সুদ দিয়ে থাকো তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জাকাত দাও, তাদের ধনসম্পদ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।’ এভাবে জাকাতের মাধ্যমে সামর্থ্যবানদের ধনসম্পদের কিছু অংশ ব্যয়ের ফলে তাদের অবশিষ্ট ধনসম্পদ পরিশুদ্ধ বা পবিত্র হয়।
ইসলামে জাকাতের অবস্থান
ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি ইমান, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। পবিত্র কোরআনে নামাজের পরই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জাকাতের। কোরআনের বহু স্থানে নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে তা আল্লাহর কাছে যাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১১০)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো, জাকাত দাও এবং রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে পারো।’ (সুরা নুর: আয়াত ৫৬)
জাকাত ফরজ যাদের ওপর
আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য জাকাত দেওয়া আবশ্যক। যার কাছে নিসাব পরিমাণ (যে পরিমাণ ধনসম্পদ থাকলে জাকাত প্রদান করা ফরজ হয়, ইসলামী পরিভাষায় তাকে নেসাব বলা হয়) সম্পদ আছে এমন স্বাধীন ও পূর্ণবয়স্ক মুসলিম নর-নারী জাকাত আদায় করবে। তাদের ওপর জাকাত ফরজ। তবে এর জন্য শর্ত হলো এক. সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা থাকতে হবে। দুই. সম্পদ উৎপাদনক্ষম ও বর্ধনশীল হতে হবে। তিন. নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। চার. সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই শুধু জাকাত ফরজ হবে। পাঁচ. ঋণমুক্ত হওয়ার পর নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। ছয়. কারও কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকলেই শুধু ওই সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে। জাকাতের টাকায় অসহায়-গরিবরা সচ্ছল হবেন, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করবেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা এমন লোক যাদের আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করি, তারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে, সৎকাজের আদেশ করে ও মন্দকাজে বাধা প্রদান করে।’ (সুরা হজ: আয়াত ৪১)
কতটুকু সম্পদে জাকাত দিতে হয়
জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ (শতকরা হিসাবে আড়াই ভাগ) জাকাত আদায় করতে হয়। অর্থাৎ, সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ এবং শতকরা আড়াই টাকা হারে এক হাজারে পঁচিশ টাকা এবং এক লাখে আড়াই হাজার টাকা জাকাত ফরজ হবে। জাকাত ফরজ হওয়া সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে সঠিক মূল্য নির্ধারণ করে এর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা জাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে। সামান্য কম হলেও জাকাত আদায় হবে না। জাকাতের টাকা একজনকে দেওয়া যায়, আবার একাধিক ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করেও দেওয়া যায়। তবে জাকাতের নামে নিম্নমানের শাড়ি-লুঙ্গি দেওয়া ঠিক না। বরং অসহায় মানুষকে জাকাতের টাকায় স্বাবলম্বী করে তোলাই হোক লক্ষ্য।
জাকাতের নেসাব
স্বর্ণ-রুপা, নগদ টাকা, ব্যবসায়ী পণ্য, গবাদি পশু এবং কৃষি ফসলের জাকাত দিতে হয়। নিচে কোনটার কী নেসাব তা উল্লেখ করা হলো—
স্বর্ণ-রুপার নেসাব: স্বর্ণের নেসাব হলো সাড়ে সাত ভরি (তোলা)। রুপার নেসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন ভরি (তোলা)। স্বর্ণ ও রুপা উভয়টি যদি কারও কাছে থাকে এবং এর কোনোটাই নেসাব পরিমাণ না হয়, তবে উভয়টির মূল্য হিসাব করে দেখতে হবে। মূল্য যদি একত্রে রুপার নেসাব পরিমাণ হয়ে যায়, অর্থাৎ সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার মূল্যের সমান হয়ে যায় তবেই জাকাত আদায় করতে হবে।
নগদ টাকার নেসাব: নগদ টাকার নেসাব হলো, বাজারদর হিসাবে অন্তত সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার মূল্যের পরিমাণ টাকা এক বছর জমা থাকলে এর জাকাত আদায় করতে হবে (এ বছর সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার বাজারদর প্রায় তিয়াত্তর হাজার টাকা)। হাতে ও ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি, শেয়ার সার্টিফিকেট ইত্যাদি নগদ অর্থ বলে গণ্য হবে।
ব্যবসায়ী পণ্যের নেসাব: ব্যবসায়ী পণ্যের নেসাব হলো, কোনো জিনিস বিক্রি করার উদ্দেশ্যে রাখা হলে তাকে ব্যবসার পণ্য মনে করা হবে। সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার মূল্যের সমান মূল্যমান সম্পন্ন ব্যবসার পণ্যের জাকাত দিতে হবে। বছরান্তে তখনকার বাজারদর হিসাবে মূল্য ধরতে হবে। খরিদ মূল্য ধরলে চলবে না।
কৃষি ফসলের নেসাব: কৃষি ফসলের ক্ষেত্রে প্রতিটি শ্রেণির ফসলের নেসাব পৃথক পৃথকভাবে হিসাব করে নেসাব পরিমাণ ফসল হলে উশর দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ধান যদি ত্রিশ মণ বা তার বেশি হয়, পাট যদি ত্রিশ মণ বা তার বেশি হয়, তাহলে ফসল তোলার সময়ই তার উশর দিতে হবে। তেমনিভাবে কলাই, সরিষা, মধু ইত্যাদি প্রতিটির নেসাব পৃথকভাবে ধরতে হবে। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে কোনো নেসাব নেই। খনিজ সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় থাকলে সম্পদ উত্তোলনের পরই হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। খনিজ সম্পদের জাকাতের হার হচ্ছে বিশ শতাংশ।
সম্পদ এক বছর পূর্ণ হওয়া
জাকাত আদায় ফরজ হওয়ার একটি মৌলিক শর্ত হলো স্বর্ণ, রুপা, টাকা-পয়সা বা ব্যবসার পণ্য নেসাব পরিমাণ হওয়ার পর তৎক্ষণাৎ জাকাত আদায় করা ফরজ হয় না; বরং এক বছর পর্যন্ত নিজের মালিকানাধীন থাকলেই জাকাত আদায় করা ফরজ হয়। অতএব নেসাব পরিমাণ হওয়ার সঙ্গে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বছরের শুরুতে যদি নেসাব পরিমাণ মাল বা টাকা-পয়সা থাকে আর বছরের মধ্যবর্তী সময় নেসাবের চেয়ে কম হয়, আবার বছরের শেষাংশে নেসাবের পরিমাণ হয়ে যায় অথবা বছরের মধ্যবর্তী সময় আরও বৃদ্ধি পায়—উভয় অবস্থাতেই বছরান্তে যে পরিমাণ মাল বা টাকা থাকবে তার জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, বছরের শেষে কী পরিমাণ থাকে তাই ধর্তব্য। মধ্য বছরের হ্রাস-বৃদ্ধি ধর্তব্য নয়।
জাকাত যাদের দেওয়া যাবে
যে ব্যক্তির কাছে জাকাতযোগ্য সম্পদ নেসাব পরিমাণ নেই এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত অন্য ধরনের মালও নেসাব পরিমাণ নেই, এ ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া যাবে। পবিত্র কোরআনের সুরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আট শ্রেণির লোকের কথা উল্লেখ রয়েছে, যাদের জাকাত দেওয়া যাবে। তারা হলেন—১. ফকির: বাংলায় তাদের গরিব বলা হয়। ২. মিসকিন: যাদের আর্থিক অবস্থা গরিবদের চেয়েও খারাপ, তারাই মিসকিন। ৩. আমেল: জাকাতের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি। ৪. মন জয় করার জন্য: ইসলামের বিরোধিতা বন্ধ করা বা ইসলামের সহায়তার জন্য কারও মন জয় করার প্রয়োজন হলে তাকে জাকাত দেওয়া যাবে। ইসলামের শুরুর দিকে এর প্রয়োজনীয়তা ছিল। বর্তমানে এই খাতের খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবে নওমুসলিমদের সমস্যা দূর করার জন্য জাকাত তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করা যাবে। ৫. দাস মুক্তি: দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ লোক এবং ইসলামের জন্য বন্দিদের মুক্ত করাতে তাদের জন্য জাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে। ৬. ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ: ঋণভারে জর্জরিত লোকেরা মানসিকভাবে সর্বদাই ক্লিষ্ট থাকে এবং কখনো কখনো জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের ঋণমুক্তির জন্য জাকাতের টাকা দেওয়া যাবে। ৭. আল্লাহর পথে ব্যয়: কোরআনের ভাষায় এ খাতের নাম বলা হয়েছে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’, যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে। আল্লাহর পথে কথাটি খুব ব্যাপক। মুসলমানদের সব নেক কাজ আল্লাহর পথেরই কাজ। ৮. মুসাফির: মুসাফির বা প্রবাসী লোকের বাড়িতে যত ধনসম্পত্তিই থাকুক না কেন, পথে বা প্রবাসে সে যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে জাকাত তহবিল হতে প্রয়োজনীয় সাহায্য দেওয়া যাবে।
জাকাত না দেওয়ার শাস্তি
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, যাকে আল্লাহ ধনসম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর জাকাত আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তার সম্পদকে (বিষের তীব্রতার কারণে) টেকো মাথাবিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখের দুই পাশ কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তেলাওয়াত করেন, ‘আল্লাহ যাদের সম্পদশালী করেছেন অথচ তারা সে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করেছে, তাদের ধারণা করা উচিত নয় যে সেই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, বরং তা তাদের জন্য কেয়ামত দিবসে, অচিরেই অকল্যাণকর হবে, যা কার্পণ্য করছে তা দিয়ে তাদের গলদেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হবে।’ (বুখারি: হাদিস ১৩২১)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যে সম্পদের জাকাত দেওয়া হয়নি তাকে বিষধর সাপে রূপান্তর করে ওই সম্পদের মালিকের গলায় জড়িয়ে দেওয়া হবে এবং সাপটি তাকে ছোবল দিতে দিতে বলবে, আমি তোমার প্রিয় সম্পদ, গুপ্তধন।’ (বুখারি: ১৪০৩)।
লেখক: মুহাদ্দিস ও ইসলামী চিন্তাবিদ