জাফর ওবায়েদের গুচ্ছ কবিতা
বাগানে পড়েছে বুনো হাতি সহসাই, তোমার জমিনে একপাল বুনো হাতি শূঁড়ের তাণ্ডবে শস্যের বেহাল দশা তুমি ভুলে গেছ আত্মরক্ষার সংলাপ ভুলে গেছ সান্ধ্যসাহচর্য ভুলে গেছ নিয়মমাফিক স্নিগ্ধ রাতের সহিষ্ণু সুন্দর। অকল্পিত, অলস বিকেলে তোমার ঘরে ঢুকে পড়েছে ডাকাত— নৈরাজ্যে ঝিমানো উদলা রমণী তুমি এ তল্লাটে অযাচিত এক নিশিন্ধা নিলয়। আমি শিয়রে দাঁড়িয়ে দেখছি তোমার বুকভাঙা হাপিত্যেস। বাগানে পড়েছে একপাল বুনো হাতি। নিঃশব্দে, অজগর-রাত প্রাণের প্রদেশে প্রেম নিস্তরঙ্গ হলে বুঝে নিয়ো ডুবে গেছে প্রাণসূর্য বুঝে নিয়ো ছিঁড়ে গেছে স্নেহসুতো আত্মিক বন্ধন। সম্মুখে তখন, গোধূলির মতো লাল নিঃশব্দে নামবে অনল— অজগর-রাত। পাপের তামাদি নেই বিচার শব্দটি উচ্চারিত হলে যদি সরে যায় পায়ের মাটিও তবে তুমি অপরাধী। পাপের হাতটি ধরে অন্তত কিছুদিন তুমিও হেঁটেছ তুমিও জ্বলছ পাপবোধে তোমার ভেতরে এক পাপিষ্ঠ তুমি শঙ্কায়, দ্বিধায় নির্ঘুম। হয়ত তোমার হাত রক্তাক্ত হয়ত তোমার চেতনাজুড়েই এক খুনির বিচরণ। আইন শব্দটি শুনে যদি ধরে যায় দুচোখে আগুন তবে তুমি নিষ্পাপ নও। তোমার পাপকর্
বাগানে পড়েছে বুনো হাতি
সহসাই, তোমার জমিনে একপাল বুনো হাতি
শূঁড়ের তাণ্ডবে শস্যের বেহাল দশা
তুমি ভুলে গেছ আত্মরক্ষার সংলাপ
ভুলে গেছ সান্ধ্যসাহচর্য
ভুলে গেছ নিয়মমাফিক
স্নিগ্ধ রাতের সহিষ্ণু সুন্দর।
অকল্পিত, অলস বিকেলে
তোমার ঘরে ঢুকে পড়েছে ডাকাত—
নৈরাজ্যে ঝিমানো উদলা রমণী তুমি
এ তল্লাটে অযাচিত এক নিশিন্ধা নিলয়।
আমি শিয়রে দাঁড়িয়ে দেখছি
তোমার বুকভাঙা হাপিত্যেস।
বাগানে পড়েছে একপাল বুনো হাতি।
নিঃশব্দে, অজগর-রাত
প্রাণের প্রদেশে প্রেম নিস্তরঙ্গ হলে
বুঝে নিয়ো ডুবে গেছে
প্রাণসূর্য
বুঝে নিয়ো ছিঁড়ে গেছে স্নেহসুতো
আত্মিক বন্ধন।
সম্মুখে তখন, গোধূলির মতো লাল
নিঃশব্দে নামবে অনল—
অজগর-রাত।
পাপের তামাদি নেই
বিচার শব্দটি উচ্চারিত হলে যদি সরে যায় পায়ের মাটিও
তবে তুমি অপরাধী।
পাপের হাতটি ধরে অন্তত কিছুদিন তুমিও হেঁটেছ
তুমিও জ্বলছ পাপবোধে
তোমার ভেতরে এক পাপিষ্ঠ তুমি
শঙ্কায়, দ্বিধায় নির্ঘুম।
হয়ত তোমার হাত রক্তাক্ত
হয়ত তোমার চেতনাজুড়েই এক খুনির বিচরণ।
আইন শব্দটি শুনে যদি ধরে যায় দুচোখে আগুন
তবে তুমি নিষ্পাপ নও।
তোমার পাপকর্ম জেগে আছে
সম্মুখে বসে থেকে ভীতির বারুদ জ্বেলে দিচ্ছে
আড়াল করতে পারছ না কিছুতেই।
হয়ত-বা বসে আছ পাপের আগুনজ্বলা চুলোর উপর
হয়ত ডুবে আছ নিজেরই নরকে।
পাপের তামাদি নেই
তার বিচার হয়, হতেই হয়- সে হোক আজ অথবা কাল।
শব্দের শৃঙ্খলে নদীর মুখমণ্ডল
সেদিন হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল
কেমন একটা অস্থিরতা কাঁপিয়ে তুললো দেহমন।
নদীকে নিয়েই দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম লম্বা সময়।
ভালোবাসা থেকে
জন্মস্রোতের তরল টান থেকে
মনের তাগিদ থেকে
নদীকে লিখতে বসে যাই কলম হাতে।
শব্দের শৃঙ্খলে মুখমণ্ডল আঁকছি—
নাক-মুখ-চোখ-ঠোঁট খুব যত্ন করে তুলে আনতে চেষ্টা করছি।
সহসাই চোখ পড়ল তার মুখের বিস্তৃত মেঘের দিকে
ওরা নদীকে আড়াল করতে পারার সাফল্যে উল্লাস করছে
আবছা অন্ধকারের ভেতর আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি
গাদ্দার লেখা লাল প্ল্যাকার্ড হাতে ওরা হইচই করছে
হট্টগোল করে এগোবার চেষ্টা করছে।
এদিকে বেজে উঠেছে ‘সোনার বাংলা’ সংগীত
দুলে উঠছে দুনিয়ার সমস্ত লাল-সবুজ
ওরা ভ্রুক্ষেপ করছে না
হাত-পা ছুড়ছে, শাউয়া মাউয়া ছিঁড়ছে
চোখে মুখে আগুন উড়ছে
মাথার উপর এলোমেলো চুল ছাপিয়ে ধোঁয়া উঠছে
ভেসে উঠছে তাদের প্রকৃত রুচির ভূগোল।
তারপর নদীর শরীর, আর
চিরাচরিত গন্ধের মানচিত্র তরজমা করতে গিয়ে চমকে উঠি—
নদী কেমন শুকিয়ে গেছে
চলনে চর পড়েছে
যৌবন তাকে ত্যাগ করেছে
লাবণ্যে পড়েছে অশুভ অন্ধকারের আঁচড়
অনুবাদ কিংবা ভাবানুবাদ কিছুই যেন পাচ্ছে না হালে জল।
দুঃখগাছের কঙ্কাল
মনভূমে, বিস্তীর্ণ মাঠের দুঃখগাছগুলি
ছুঁয়েছে আকাশ
অনুকূল হাওয়ায় প্রতিদিন প্রসারিত হচ্ছে
অগুনতি শাখা-প্রশাখা
প্রতিরাতে গজিয়ে উঠছে কুঁড়ি
মানুষ মিছেই তৈরি করে কুড়াল-করাত
কাটতে পারে না দুঃখগাছ।
প্রতাপের ভরকেন্দ্রে বসা দুষ্টু মোড়লেরা
মালীর উর্দি পরে
বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায়
প্রতিদিন রুয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির নিত্যনতুন দুঃখগাছ
ওরা খোঁজে রত্নগর্ভ সোনাফলা মাটি
নিরীহ গৃহস্থ।
চিলচোখে ওরা খোঁজে কাদামাটি
দুর্বল ও নিরস্ত্র রক্ষীর ফটক
কলহলিপ্ত নড়বড়ে ঘর
গাজা, ইউক্রেন, ভেনিজুয়েলা, ইরান…
মেঘমুখে বিশ্ববাসীর হাহাকার
খালি চোখে দেখে যায়
দুঃখগাছে ঝুলছে মানবতার কঙ্কাল।
অভিজ্ঞান
খেয়াতরি অবিরাম এপার-ওপার করে যায়
দুঃখ-সুখের প্রীতিম্যাচ বিনিময়।
দ্রুততম মানবের মতো দৌড়ানো পোয়াতি নদী।
এপারের ঘাটে নৌকা ছেড়ে গেলে
ওপারের তিনঘাট ভাটিতে ভিড়ে।
গোদারায় যারা মাঝি, অনায়াসে
পৌঁছে দেয় ঘাটে, কাঙ্ক্ষিত সিঁড়ির পাশে।
হঠাৎই যারা বইঠা ধরে নতুনের হাতে
নৌকাটি ভেসে বেড়ায় মাঝনদীর স্রোতে।
আব্রু বাঁচাতে
আব্রু বাঁচাতে, বইছে রক্তগঙ্গা দেশে দেশে। ধূসর ধূলি ও বালিময় চরে তপ্ত খুন, রক্তের নির্লিপ্ত কাদা- প্রাণবায়ু মিশে ভারাক্রান্ত, বাতাসের বেগ। সময় নিয়েছে দাদুর হাতের লাঠি। তবু আব্রু লুট হচ্ছে নানান ছুতোয়- ভাটিতে নদীর পানি ঘোলা করবার দায় নিয়ে পুরোনো গল্পের মতো।
সম্মান বাঁচাতে, আত্মহত্যা করছে সভ্যতা।অসভ্যতা ক্রমেই অবাধ জয় করছে একের পর এক রাজ্য। রাজত্ব তার ছড়িয়ে পড়ছে মহাবীর আলেকজান্ডারের মতো। সন্ত্রস্ত মানুষের মৌন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী চরিত্র, ঘরকুনো চৈতন্যের ছাড়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ।
জীবন বাঁচাতে, শঙ্কিত সমস্ত কলমের শুকিয়েছে কালি। প্রতিবাদের পৃষ্ঠাগুলো পড়ে আছে সফেদ শরীরে। আঁচড় পড়ছে না কারো, সে বহুকাল।মরণ নীরবতা ভাঙবার বৈরিতা নিজের করে নিতে ইতস্তত লোকের কাঁধে বাড়ছে সহ্যের বোঝা। বেঁকে যাচ্ছে হাড়, সইছে তবু।
একদিন সহ্যেরও অসহ্য হবে ওসব। হয়ত সেদিন ওলটপালট হবে মানবীয় মৌরসের মৌলভূমি।
অমলটা গিয়েছিল মিছিলে সেদিন
তারপর অমলটা ফিরল না আর ঘরে।
ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষার রাত
নির্বাক মা-বাবা- বেহুঁশ বেকুব, অসহায়
ভাই-বোন, স্বজন- মাটির মতো জীবন্মৃত
দেয়ালে টাঙানো অমলেরা কেড়ে নিচ্ছে নজর
আর, তারাও যেন চেয়ে আছে
কথাবলা অমলের বাড়িফেরা পথ।
অমলের ছবির মতন ছোট্ট ঘর-
বিরহী বসন্তবহ্নি বুকে
পড়ে আছে বই, খাতাপত্র, জামাজুতো, ঘড়ি, রিং
বড়ো বড়ো চোখে ইশকুল ব্যাগ, ক্যালকুলেটর, ওয়ালেট
শখের গিটারে তার জমে আছে ধুলো
ধবধবে বিছানায় ছোপ ছোপ মেঘ।
পথের ধুলোরা মনমরা মৌল
তার ফিরবার হৃদয় বিছানো পথ চেয়ে পঙ্গু
উঠোনের আমগাছটি বেনওয়া বন্ধু
তালপুকুরটাও খাজুল প্রেমিকা
ও বাড়ির শর্মিলার কাচা চোখ ভেজা ভেজা রক্তবর্ণ
আকুলিবিকুলি মায়ের ফ্যাকাশে মন।
অমলটা গিয়েছিল মিছিলে সেদিন।
কে রেখেছে মনে দহনমথিত দিনে
কে রেখেছে মনে,
দিব্যি তো কেটে গেল এতটা বিরহী বছর?
আকাঙ্ক্ষার দুর্বিনীত দহনবুকে চেয়েছি
আরেকটু টেনে নেবে মায়ের মতো! হেরে যাব না…
অথচ
স্বপ্নবিভোর সময়ের চৌকাটে তোমার নিঃসীম দূরত্ব-
কতদিন দেখি না তো কালবৈশাখীর চিরচেনা তাণ্ডব
আম লিচু আর কাঁঠালের সমাবেশ
দেখি না তো সজল-কাজল মেঘ, অঝোর বৃষ্টি, জলমগ্ন জীবন।
আমার ঘুমের ভেতর এখন ঢুকে পড়ে না ঝলমলে নির্মল আকাশ
বকের সারির মতো সাদা মেঘ, শিশিরের সোনা ভেজা শিউলির মুখ
শ্বেতাঙ্গ রমণীর চুলের মতো উড়োউড়ো কাশফুল
স্মৃতিকাতর দৃষ্টির দরিয়ায় ফসলের সম্ভারে কৃষকের হাসি
সোনালি ধানের দৃশ্যে নবান্নের রঙ
কুয়াশার চাদর মোড়া বিবর্ণ গাছ। খেজুর রস, পিঠা-পায়েস
বর্ণিল ফুলের জলসা, আমের মুকুল, আর মৌমাছির গুঞ্জরণ!
কে রেখেছে মনে,
আলস্যভরা প্রত্যুষ, কবিতার বেদনাহত সংসার?
কারও আর মনে নাই, দহনমথিত দিনে।
গনি শিকদার
এভাবেই একদিন সমস্ত কিছু চলে যায় গনি শিকদারের বন্ধকী ঝোলায়
খান সাহেবের বাড়িতে যেভাবে হেঁটে হেঁটে চলে গিয়েছিল নিমার আলীর
উঠতি বয়সের তরুণী মেয়ের সুশ্রী অঙ্গসৌষ্ঠব
কিংবা, অভাবী মানুষের ক্ষেতের জমিন ও বসতভিটে।
সেদিন থেকেই তার ব্যক্তিত্বে যে আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য চেপে বসেছিল
তার থেকে নিজেকে মুক্তি দেবার সামর্থ্য আর কোনওদিন হয়নি।
মানুষ তিনি বরাবরই ভালো
যে ভালোটার স্বীকৃতি কেউ অবশ্য কোনওদিন দেয়নি!
আসলে মানুষগুলোই খারাপ! তারা শিকদারের একটু নারীপ্রেম
এইটুকু বিষয়-সম্পত্তি লোভকে সমুদ্রের মতো বড়ো করে তোলে
তারা এ রকম করে না-দেখলেও তো পারতো!
শিকদার আদতেই এক অদ্ভুত অসাধারণ মানুষ!
এই সাত গেরামে তাঁর মতো আরেকটি লোক দেখান তো?
শুধু যুদ্ধের দিনে পাকিস্তান প্রেমের জন্যে তিনি হানাদারদের দোসর ছিলেন
এক আধটু দালালি করেছেন- সুন্দরী তরুণীদের বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছেন
মুক্তিফৌজদের বাড়ি-ঘর পোড়াতে সাহায্য করেছেন
তার নিজের শত্রুদের দেশের শত্রু ট্যাগে মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন!
অবশ্য কাউকে কাউকে যে বাঁচাননি তা কিন্তু নয়
যদি তার নিজের মতন কেউ হয়!
অনিকেত
নদীজল নয় রাধা, রাজপথ নয়
আমি শুধু সেই অনিকেত
কূলহীন সাগরের মোহন মায়ায়
ডুবে আছি জীবনসমেত।
নকল বিপ্লবী
গরল শরাব পিয়ে ফুলেফেঁপে ওঠে নকল বিপ্লবী
পৈশাচিক হাত ওদের ভ্রমণ করে
নিষিদ্ধ নগর
ঘুরেফিরে, অলিগলি চেটে খায়
বেটে খায় রাজত্ব ও রাজকোষ;
হাতড়ায়, অসহায় মানুষের ছেঁড়া থলে।
লোকে বলে- ওরা প্রেমিক কিংবা বিপ্লবী নয়
ওরা ডাকাত, পরেছে শুধু বিপ্লবীর রঙিন মুখোশ।
What's Your Reaction?