‘টাইপিং’ দেখে নয়, রিসিভারের নিঃশ্বাসে প্রেমে পড়েছিলাম

কান্তা কাবির আমাদের প্রেম কোনো ‌‘নোটিফিকেশন’ ছিলো না— সে ছিলো উপাসনা। তার মন্দির ছিলো কাঠের টেবিলে বসানো এক কৃষ্ণবর্ণ ল্যান্ডফোন, আর তার সাক্ষী ছিলো সমগ্র পাড়া। গোধূলি নামলেই আমাদের রক্তে দামা বাজতো। টেলিফোনের ডায়ালটোন হয়ে উঠতো আমার প্রার্থনার সুর। একটা রিং... শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসতো। দুইটা রিং... ব্রহ্মাণ্ড স্তব্ধ হতো। তৃতীয় রিংয়ে আমরা আর মানুষ থাকতাম না—হয়ে যেতাম একখণ্ড কম্পমান প্রতীক্ষা। আরও পড়ুন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষায় সিসি ক্যামেরা সময়ের দাবি রিসিভার কানে তুলতাম, ওপাশে শুধু নৈঃশব্দ্যের আর্তনাদ। সে কথা বলতো না। বলার প্রয়োজন ছিলো না। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতাই ছিলো আমার কাছে চতুর্দশপদী কবিতা। ‘আছি’- এই অনুচ্চারিত শব্দেই লেখা হতো আমাদের সমগ্র মহাকাব্য। পাড়া ছিলো আমাদের নীরব সহযোগী, আমাদের গোপন বিচারক। প্রতিটি অলিগলি জানতো আমাদের মিথ্যা পদশব্দের ইতিহাস— ‘একটু দোকানে যাচ্ছি বা স‍্যারের বাসায়’। প্রতিটি নিমগাছ সাক্ষী ছিলো চোখের সেই বিদ্যুৎ-ঝলকের, যার দাম ছিলো সহস্র রজনীর আলিঙ্গনের চেয়েও বেশি। চায়ের দোকানের ধোঁয়া, পানের পিক, সন্ধ্যামালতীর ঘ্রাণ— সবাই জানতো, তবুও কেউ বলতো ন

‘টাইপিং’ দেখে নয়, রিসিভারের নিঃশ্বাসে প্রেমে পড়েছিলাম

কান্তা কাবির

আমাদের প্রেম কোনো ‌‘নোটিফিকেশন’ ছিলো না—
সে ছিলো উপাসনা।
তার মন্দির ছিলো কাঠের টেবিলে বসানো এক কৃষ্ণবর্ণ ল্যান্ডফোন,
আর তার সাক্ষী ছিলো সমগ্র পাড়া।

গোধূলি নামলেই আমাদের রক্তে দামা বাজতো।
টেলিফোনের ডায়ালটোন হয়ে উঠতো আমার প্রার্থনার সুর।
একটা রিং... শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসতো। দুইটা রিং... ব্রহ্মাণ্ড স্তব্ধ হতো।
তৃতীয় রিংয়ে আমরা আর মানুষ থাকতাম না—হয়ে যেতাম একখণ্ড কম্পমান প্রতীক্ষা।

রিসিভার কানে তুলতাম, ওপাশে শুধু নৈঃশব্দ্যের আর্তনাদ।
সে কথা বলতো না। বলার প্রয়োজন ছিলো না।
তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতাই ছিলো আমার কাছে চতুর্দশপদী কবিতা।
‘আছি’- এই অনুচ্চারিত শব্দেই লেখা হতো আমাদের সমগ্র মহাকাব্য।

পাড়া ছিলো আমাদের নীরব সহযোগী, আমাদের গোপন বিচারক।
প্রতিটি অলিগলি জানতো আমাদের মিথ্যা পদশব্দের ইতিহাস—
‘একটু দোকানে যাচ্ছি বা স‍্যারের বাসায়’।

প্রতিটি নিমগাছ সাক্ষী ছিলো চোখের সেই বিদ্যুৎ-ঝলকের,
যার দাম ছিলো সহস্র রজনীর আলিঙ্গনের চেয়েও বেশি।
চায়ের দোকানের ধোঁয়া, পানের পিক, সন্ধ্যামালতীর ঘ্রাণ—
সবাই জানতো, তবুও কেউ বলতো না।

এই না-বলাই ছিলো পাড়ার সবচেয়ে বড় সততা।
বর্ষা ছিলো আমাদের অভিশাপ।
বজ্রপাতের সাথে সাথে যখন টেলিফোনের তার মৃত ঘোষিত হতো,
আমাদের ভেতরেও প্রলয় নামতো।

‘যদি আজ সে ফোন করে? যদি আমি ধরতে না পারি?
যদি সে ভাবে আমি বিস্মৃত হয়েছি?’—

এই আশঙ্কায় আমাদের প্রতিটি রাত্রি হয়ে উঠতো নির্ঘুম কারবালা।
আমরা স্পর্শ করিনি কখনো। সময়ের শৃঙ্খল
আমাদের শিখিয়েছিলো সংযমই প্রেমের অলঙ্কার।

দুর্গাপুজার অঞ্জলির ভিড়ে এক পলকের দৃষ্টি,
মেলার নাগরদোলার নিচে আঙুলের অজান্ত ছোঁয়া—
এইটুকুই ছিলো আমাদের ব্যভিচার, এইটুকুই ছিলো আমাদের পবিত্রতা।
আর এখন?

এখন প্রেম থাকে মুঠোফোনের স্ক্রিনে বন্দী।
আইফোনের নীল আলোয় রাত জাগে,
কিন্তু চোখে ঘুম নেই, বুকে সেই কাঁপন নেই।
‘টাইপিং...’ দেখে বুক ধড়ফড় করে না,
'অনলাইন' দেখেও আর শান্তি আসে না।

কারণ এখন জানি—সে অনলাইন, কিন্তু আমার জন্য না।
এখন ‘লাস্ট সিন’ আছে, ‘ব্লু টিক’ আছে, ‘আনসেন্ড’ আছে,
‘স্টোরি ভিউ’ আছে, ‘লোকেশন শেয়ার’ আছে।
সব আছে। শুধু নেই বিশ্বাস।

শুধু নেই একটা ‘মিসড কল’ এর জন্য সারারাত জেগে থাকার দায়।
এখন প্রেম মানে ২জি স্পিডে ভয়েস নোট,
১৫ সেকেন্ডের রিলস, আর 'সিন' করে রেখে দেওয়া রিপ্লাই।
এখন ব্রেকআপ হয় ‘ব্লক’ বাটনে,
আর ‘ডিলিট চ্যাট’ করলেই স্মৃতি মুছে যায়।
কত সহজ। কত ঠুনকো।

তখন একটা চিঠি হারালে কাঁদতাম এক মাস।
এখন একটা ফোন হারালে কাঁদি—ফোনের জন্য, মানুষটার জন্য না।
তখন 'লাইন বিজি' মানে ছিলো মৃত্যুযন্ত্রণা।

এখন ‘লাস্ট সিন ২ ঘণ্টা আগে’ মানে শুধুই ‘ব্যস্ত’।
আমরা 'ব্যস্ত' শব্দটা দিয়ে কত সহজে প্রেমকে কবর দিই।
তোমাদের ফাইভ-জি এর যুগে গতি আছে, গভীরতা নেই।
কানেকশন আছে, কমিটমেন্ট নেই।

ফিল্টার আছে, অনুভূতি নেই।
১০০টা অ্যাপ আছে প্রেম করার,
কিন্তু একটা ল্যান্ডফোনের তারের মতো শক্ত বাঁধন নেই।
আমরা নব্বইয়ের মেয়েরা ছিলাম প্রতীক্ষার পিএইচডি।
আমরা ভালোবেসেছিলাম অধিকার করতে নয়,
আগলে রাখতে। সহ্য করতে।

আমাদের চিঠি টাইপ করা হতো না, রক্ত দিয়ে লেখা হতো।
আমাদের প্রতিশ্রুতি মেসেজে দেওয়া হতো না, চাঁদের কাছে দেওয়া হতো।
তাই প্রেম নিয়ে কথা বললে একটু নতজানু হয়ে বলো।

কারণ আমরা এমন এক প্রেম জেনেছি—
যা ছিলো উপাসনা, যা ছিলো যুদ্ধ, যা ছিলো অনন্ত প্রতীক্ষা।
যা বাস করতো ডায়ালটোনের দীর্ঘশ্বাসে,
আর মৃত্যু হতো প্রতিবার রিসিভার নামিয়ে রাখার শব্দে।
ল্যান্ডফোনের যুগের মেয়েদের বলছি—
আমরা প্রেমে পড়িনি শুধু।

আমরা প্রেমে বেঁচেছি, প্রেমে মরেছি।
আর তোমরা? তোমরা শুধু স্ক্রল করে যাচ্ছো।

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow