টিমের অভ্যন্তরীণ ফাটল ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রাণশক্তি রক্ষার কৌশল
আধুনিক কর্পোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ‘টিমওয়ার্ক’ বা দলগত প্রচেষ্টা। একটি প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত তার লক্ষ্যে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করে তার কর্মীদের পারস্পরিক সংহতির ওপর। কিন্তু প্যাট্রিক লেনসিওনি তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন, একটি শক্তিশালী টিম রাতারাতি গড়ে ওঠে না। বরং সূক্ষ্ম কিছু চারিত্রিক ত্রুটি বা মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির কারণে একটি সম্ভাবনাময় টিম তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক প্রতিষ্ঠানেই কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা বা অনীহা দেখা দেয়। ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কর্মীরা অলস বা অদক্ষ, কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায় তারা আসলে ‘টিম ডিসফাংশন’ বা প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকরতার শিকার। লেনসিওনির মতে, একটি প্রতিষ্ঠান কেন লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় তার পেছনে মূলত পাঁচটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে। ১. আস্থার অভাব একটি টিমের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস বা আস্থা। লেনসিওনির পিরামিডে এটিই একদম নিচের স্তর। যখন কর্মীরা একে অপরের সামনে নিজের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা বা ভুল স্বীকার করতে ভয় পায়, তখনই আস্থার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। যার প্রভাবে আস্থার অভাব প
আধুনিক কর্পোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ‘টিমওয়ার্ক’ বা দলগত প্রচেষ্টা। একটি প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত তার লক্ষ্যে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করে তার কর্মীদের পারস্পরিক সংহতির ওপর। কিন্তু প্যাট্রিক লেনসিওনি তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন, একটি শক্তিশালী টিম রাতারাতি গড়ে ওঠে না। বরং সূক্ষ্ম কিছু চারিত্রিক ত্রুটি বা মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির কারণে একটি সম্ভাবনাময় টিম তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক প্রতিষ্ঠানেই কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা বা অনীহা দেখা দেয়। ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কর্মীরা অলস বা অদক্ষ, কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায় তারা আসলে ‘টিম ডিসফাংশন’ বা প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকরতার শিকার। লেনসিওনির মতে, একটি প্রতিষ্ঠান কেন লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় তার পেছনে মূলত পাঁচটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে।
১. আস্থার অভাব
একটি টিমের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস বা আস্থা। লেনসিওনির পিরামিডে এটিই একদম নিচের স্তর। যখন কর্মীরা একে অপরের সামনে নিজের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা বা ভুল স্বীকার করতে ভয় পায়, তখনই আস্থার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
যার প্রভাবে আস্থার অভাব প্রকট আকার ধারণ করে। কর্মীরা সবসময় একটি ‘মাস্ক’ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকে। তারা সাহায্য চাইতে কুন্ঠাবোধ করে এবং নিজের ভুল লুকাতে গিয়ে আরও বড় ভুলের দিকে ধাবিত হয়। ফলে টিমের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক রাজনীতি শুরু হয়, যা সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে।
উদাহরণ হিসেবে গুগল-এর ‘প্রজেক্ট অ্যারিস্টটল’ গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ কর্মক্ষম টিমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘সাইকোলজিক্যাল সেফটি’ বা মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা। যেখানে এই নিরাপত্তা নেই, সেখানে কর্মীরা উপহাস বা তিরস্কারের ভয়ে নতুন কোনো আইডিয়া দিতে চায় না।
২. সংঘাতের ভয়
অনেকেই মনে করেন ঝগড়া বা মতপার্থক্য না হওয়াই একটি আদর্শ টিমের লক্ষণ। কিন্তু ধারণাটি ভুল। যখন কোনো টিমে গঠনমূলক বিতর্কের সুযোগ থাকে না, তখন কর্মীরা কৃত্রিমভাবে শান্ত থাকে।
তখন এই কৃত্রিম শান্তির আড়ালে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে। মিটিংগুলোতে কেউ দ্বিমত পোষণ করে না, কিন্তু আড়ালে গিয়ে সমালোচনা করে। ফলে কোনো সমস্যার প্রকৃত সমাধান বের হয় না। কর্মীরা মনে করে, "বলে কোনো লাভ নেই, যা হওয়ার তাই হবে"। এই উদাসীনতা তাদের কর্মক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়।
৩. অঙ্গীকারের ঘাটতি
লেনসিওনি দেখিয়েছেন, যখন কোনো বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা বা বিতর্ক হয় না, তখন কর্মীরা গৃহীত সিদ্ধান্তের সাথে একাত্ম হতে পারে না। একে বলা হয় ‘লোকদেখানো সম্মতি’।
যার প্রভাবে কর্মীরা ওপর থেকে সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও মনেপ্রাণে তা বিশ্বাস করে না। ফলে কাজে কোনো স্বচ্ছতা থাকে না। সংকটের সময় কর্মীরা দায় এড়িয়ে চলে এবং প্রজেক্টের মাঝপথে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কর্মী সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকে না, তাদের কাজের প্রতি একাগ্রতা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়।
৪. দায়বদ্ধতা এড়িয়ে চলা
টিমওয়ার্কের একটি বড় দিক হলো একে অপরকে জবাবদিহির আওতায় আনা। কিন্তু আস্থার অভাব থাকলে কেউ কাউকে ভুল ধরিয়ে দিতে চায় না, পাছে সম্পর্ক খারাপ হয়।
এর ফলে কর্মীরা বলতে শুরু করে ‘এটা আমার কাজ নয়’ বা ‘সে কেন করছে না তা আমি জানি না’। কর্মীরা নিজেদের কাজের মান বজায় রাখার চেয়ে সহকর্মীদের সাথে মেকি সুসম্পর্ক রাখা বা বিবাদ এড়িয়ে চলাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এতে কাজের সামগ্রিক গুণগত মান বা কোয়ালিটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
৫. ফলাফলের প্রতি অমনোযোগ
এটি লেনসিওনির পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তর। যখন কর্মীরা টিমের সামগ্রিক সাফল্যের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার, খ্যাতি বা ইগোকে বড় করে দেখে, তখন প্রতিষ্ঠান ডুবতে শুরু করে।
এমন মানসিকতার প্রভাবে প্রত্যেকে যার যার মতো কাজ করে, কিন্তু টিমের মূল লক্ষ্য অর্জিত হয় না। কর্মীরা কেবল মাস শেষে বেতন এবং পদোন্নতি নিয়েই ভাবেন, প্রতিষ্ঠানের বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনে তাদের কোনো আবেগ থাকে না।
উত্তরণের পথ- নেতৃত্বের সাহসী পদক্ষেপ
টিমের অভ্যন্তরীণ ফাটল থেকে প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে শীর্ষ নেতৃত্বকে বিশেষ কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। নিচে কার্যকর কিছু কৌশল আলোচনা করা হলো:
ক. আস্থার পরিবেশ তৈরি করা
টিম লিডার বা ম্যানেজারকে প্রথমে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করার সাহস দেখাতে হবে। ‘আমি এটা জানি না’ বা ‘আমি এখানে ভুল করেছি’—নেতার এই সততা কর্মীদের মধ্যে সাহস জোগায়। এছাড়া ব্যক্তিগত ৩৬০ ডিগ্রি ফিডব্যাক এবং নিয়মিত ‘চেক-ইন সেশন’ আস্থার পরিবেশ গড়তে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
খ. গঠনমূলক বিতর্কে উৎসাহ দান
মিটিংয়ে যেন সবাই কথা বলে তা নিশ্চিত করতে হবে। ভিন্ন মত পোষণ করাকে নেতিবাচকভাবে না দেখে বরং উৎসাহিত করতে হবে। লেনসিওনির মতে, "যে টিম গঠনমূলক বিতর্ক করে না, সেই টিম এগোতে পারে না"। তবে সেই বিতর্ক হতে হবে কাজের মান নিয়ে, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ইগো নিয়ে নয়।
গ. স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
প্রতিটি মিটিং শেষে সিদ্ধান্তগুলো লিখিত আকারে সবার কাছে পাঠাতে হবে। কার কী দায়িত্ব এবং ডেডলাইন কী, তা যেন আয়নার মতো পরিষ্কার থাকে। যখন কর্মীরা জানে তাদের নির্দিষ্ট অবদান প্রতিষ্ঠানের কোথায় প্রভাব ফেলছে, তখন তাদের মধ্যে অঙ্গীকার বা কমিটমেন্ট বাড়ে।
ঘ. জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা
পারফরম্যান্সের জন্য নির্দিষ্ট 'স্ট্যান্ডার্ড' বা মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। ভালো কাজের জন্য যেমন পুরস্কার থাকবে, তেমনি অবহেলার জন্য জবাবদিহিও থাকতে হবে। একজন ভালো কর্মী যখন দেখেন যে একজন ফাঁকিবাজ কর্মীকেও কোনো জবাবদিহি করতে হচ্ছে না, তখন তিনিও কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।
ঙ. দলগত লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া
টিম ড্যাশবোর্ড বা স্কোরকার্ড ব্যবহার করে সবার অগ্রগতি দৃশ্যমান করতে হবে। বোনাস বা ইনসেনটিভ কেবল ব্যক্তিগত কাজের ওপর ভিত্তি করে না দিয়ে টিমের সামগ্রিক অর্জনের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া উচিত। এতে কর্মীরা "আমি" কেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে "আমরা" হতে শিখবে।
দিনশেষে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের অনীহা কোনো রোগ নয়, বরং এটি উপরের পাঁচটি সমস্যার উপসর্গ মাত্র। কর্মীদের কেবল যান্ত্রিক দক্ষতা বাড়ানোর চেয়ে আগে তাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ স্থাপন জরুরি। যখন একজন কর্মী অনুভব করেন যে তিনি একটি নিরাপদ পরিবেশে আছেন, তার মতামতের মূল্য আছে এবং তার সাফল্যের সাথে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য জড়িত—তখনই তিনি নিজের সেরাটা উজাড় করে দেন।
আধুনিক যুগে সেই প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকবে, যারা কর্মীদের কেবল যন্ত্রের অংশ মনে করবে না, বরং একটি আত্মিক টিমে রূপান্তরিত হবে। মনে রাখতে হবে, টিমওয়ার্ক একটি অভাবনীয় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা, কারণ এটি অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমনি এটি বিরল ও শক্তিশালী। এই শক্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সততা এবং সঠিক নেতৃত্ব।
এম এম মাহবুব হাসান
ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক
What's Your Reaction?