নিখুঁত লাইন-লেন্থ আর সুইংয়ে অজিদের নাকানিচুবানি, মুগ্ধ সুজন
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া। টেস্টের প্রথম দিনেই ট্রাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেন, স্টিভ স্মিথদের মতো সমৃদ্ধ ব্যাটিং লাইনআপকে ২০০ রানের নিচে অলআউট করা চাট্টিখানি কথা নয়। ভারত ও ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর পক্ষেও এমনটা বলে-কয়ে করা প্রায় দুঃসাধ্য। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, বাংলাদেশের তিন পেসার হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন সেই প্রায় অসম্ভব কাজটিই করে দেখিয়েছেন। ৫৩ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস গুটিয়ে গেছে মাত্র ১৯৮ রানে। এর পেছনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন লক্ষীপুরের ২৬ বছর বয়সী পেসার হাসান মাহমুদ। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। আরও পড়ুন ডারউইন টেস্ট / অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাথা উঁচু করেই প্রথম দিন শেষ করলো বাংলাদেশ চারদিকে বাংলাদেশের পেসারদের প্রশংসা, স্তুতি ও বন্দনা। টিভি ধারাভাষ্যে গিলক্রিস্ট, রিকি পন্টিং ও ম্যাথু হেইডেনরা বারবার বাংলাদেশের পেসারদের বোলিংয়ের গুণগান করেছেন। তাদের সুরে সুর মিলিয়েছেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ও অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারও। হাসান মাহমুদ, তাসকিন ও এবাদতের বোলিংয়ে ম
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া। টেস্টের প্রথম দিনেই ট্রাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেন, স্টিভ স্মিথদের মতো সমৃদ্ধ ব্যাটিং লাইনআপকে ২০০ রানের নিচে অলআউট করা চাট্টিখানি কথা নয়। ভারত ও ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর পক্ষেও এমনটা বলে-কয়ে করা প্রায় দুঃসাধ্য।
কিন্তু কঠিন সত্য হলো, বাংলাদেশের তিন পেসার হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন সেই প্রায় অসম্ভব কাজটিই করে দেখিয়েছেন। ৫৩ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস গুটিয়ে গেছে মাত্র ১৯৮ রানে। এর পেছনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন লক্ষীপুরের ২৬ বছর বয়সী পেসার হাসান মাহমুদ। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি।
চারদিকে বাংলাদেশের পেসারদের প্রশংসা, স্তুতি ও বন্দনা। টিভি ধারাভাষ্যে গিলক্রিস্ট, রিকি পন্টিং ও ম্যাথু হেইডেনরা বারবার বাংলাদেশের পেসারদের বোলিংয়ের গুণগান করেছেন। তাদের সুরে সুর মিলিয়েছেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ও অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারও।
হাসান মাহমুদ, তাসকিন ও এবাদতের বোলিংয়ে মুগ্ধ ওয়ার্নার প্রথম দিনের খেলা শেষে বলেই ফেলেছেন, ‘আমি আমার জীবনে খুব কম বিদেশি দলকে অস্ট্রেলিয়ায় এসে এত দ্রুত এখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এত নিখুঁত বোলিং করতে দেখেছি।’
ডেভিড ওয়ার্নারের ভাষায়, বাংলাদেশের তিন পেসারই খুব জায়গামতো বল করেছেন এবং সেটিও ধারাবাহিকভাবে। অস্ট্রেলিয়ায় এসে এতটা ধারাবাহিক ও নিখুঁত বোলিং করা সহজ কাজ নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার, পেস বোলিং অলরাউন্ডার ও অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনও বাংলাদেশের তিন পেসারের বোলিংয়ে ভীষণ সন্তুষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টাইগারদের ফাস্টবোলিং নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন সুজন।
সুজন প্রথমেই বলেন, ‘আমি আর কী বলব? অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ডেভিড ওয়ার্নারই তো বলে ফেলেছেন, যেকোনো বিদেশি দল অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে এসে এত দ্রুত এখানকার উইকেট বুঝে উঠতে পারে না। ঘুরিয়ে বললে, অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনে কোন লাইন-লেন্থে ও কোন জায়গায় বল করলে সফল হওয়া যাবে, সেটা বুঝে উঠতে সময় লাগে। পারলেও সেই অনুযায়ী বল ফেলতে বেশ সময় লাগে। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা আজ শুরু থেকেই জায়গামতো বোলিং করার সামর্থ্য দেখিয়েছে। যা আমি খুব কম বিদেশি দলের ফাস্টবোলারদের ক্ষেত্রে দেখেছি। সেদিক থেকে বাংলাদেশের ফাস্টবোলাররা আমাকে অবাক করেছে, বাজিমাত করেছে। তারা খুব দ্রুত উইকেটের চরিত্র বুঝে সঠিক জায়গা খুঁজে নিয়ে সেখানে বোলিং করেছে। তিন ফাস্টবোলারই দুর্দান্ত বোলিং করে সফল হয়েছে।’
সুজনের এই মন্তব্যেই পরিষ্কার ফুটে ওঠে বাংলাদেশের বোলাররা ঠিক কী করেছেন, কতটা ভালো বোলিং করেছেন এবং তাদের সাফল্যের পেছনের রহস্যটাই বা কী।
২০০৩ সালে বাংলাদেশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলা দলের সদস্য ছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। সেই অভিজ্ঞ সাবেক অধিনায়ককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘হাসান, তাসকিন ও এবাদতের এই অসামান্য বোলিং সাফল্য কি ফ্লুক?’
সুজনের উত্তর, ‘যে ক্রিকেট বোঝে, সে এটা বলবে না। ক্রিকেট বোঝেন এমন কেউ আমাদের পেস বোলারদের আজকের বোলিংকে ফ্লুক বলবেন না। কিছুতেই না। এটা পরিশ্রমের ফল, সঠিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন। এটাই আমাদের সাফল্যের পেছনের কাহিনি। আমার মনে হয়, আজ তিন সেশনেই আমরা জিতেছি। কিন্তু খেলাটা টেস্ট। আরও ১২ সেশন খেলা বাকি। আমাদের সফল হতে হলে আরও পরিশ্রম করতে হবে। আরও ছয়টি সেশন যদি জিততে পারি, তাহলে এই টেস্ট জেতার সম্ভাবনা থাকবে।’
একসময় নিজেও পেসার ছিলেন সুজন। জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট ও ওয়ানডেতে নিয়মিত পেস বোলিং করেছেন। আজ যে তিন পেসার অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে নাকানিচুবানি খাইয়েছেন, তাদের ক্লাব ক্রিকেট ও জাতীয় দলেও কোচিং করিয়েছেন তিনি।
কী এমন বৈশিষ্ট্য ছিল টাইগার বোলারদের, যার সঠিক জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটাররা? সুজনের ব্যাখ্যা, ‘আমরা একটা পারফেক্ট লাইন-লেন্থে বল করে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের ওপর চাপ তৈরি করতে চেয়েছি। হাসান সবসময়ই কোয়ালিটি বোলার। গত দুই বছরে সে আরও পরিণত হয়েছে। সে এমন একজন বোলার, যে ইনসুইং ও আউটসুইং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’
‘তাসকিন, নো ডাউট, আমাদের অন্যতম সেরা ফাস্টবোলার। এবাদত আত্মবিশ্বাসী আছে। ইনজুরি ও অস্ত্রোপচারের ধাক্কায় সে পিছিয়ে পড়েছিল। দেখে ভালো লাগল, সে আবার ফিরে এসেছে এবং ধীরে ধীরে নিজের সেই বিশ্বাস ও আস্থাটা ফিরে পেতে শুরু করেছে। আজ সে অসাধারণ সমর্থন দিয়েছে, ভালো বোলিং করেছে।’
তারপরও অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের কাছ থেকে এমন সমীহ আদায় করে নেওয়া এবং প্রথম দিনেই ৫৩ ওভারে তাদের সবাইকে ১৯৮ রানে অলআউট করা কঠিন কাজ। সেটা সম্ভব হলো কীভাবে?
সুজনের অনুভব, ‘টাইট লাইন-লেন্থে বল করেছে আমাদের পেসাররা। পেসারদের হাত থেকে হঠাৎ কিছু আলগা ডেলিভারি, ওভারপিচ বা হাফভলি আসবেই। মাঝেমধ্যে সেটাও হয়েছে। তার বাইরে সবাই মাপা লাইন-লেন্থে বোলিং করেছে। ইনটেনশন ছিল খুব ভালো। প্রপার গুড লেন্থে এবং উইকেট টু উইকেট বল করার চেষ্টা ছিল সবার। সঙ্গে সুইংও করিয়েছে সবাই। হাসান ছিল ব্রিলিয়ান্ট। তাসকিন ও এবাদতও খুব ভালো বোলিং করেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের তিন ফাস্টবোলারের পরিকল্পনাটা খুব পরিষ্কার ছিল। তারা কী করতে চায়, সেটা সবাই জানত। জেনে-বুঝেই সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। আমরা পরিকল্পনা করে সঠিক কাজটি করতে পেরেছি। তিনজন ধারাবাহিকভাবে ভালো জায়গায় বল করেছে, বুদ্ধি খাটিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করেছে। এটাই অস্ট্রেলিয়ানদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবাই ধারাবাহিকভাবে ভালো বল করায় অস্ট্রেলিয়ানরা বিপাকে পড়ে যায়।’
অস্ট্রেলিয়া একপর্যায়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে। এর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন দেশের ক্রিকেটের পরিচিত মুখ সুজন, ‘অস্ট্রেলিয়ানরা সবসময় আক্রমণাত্মকভাবে খেলতে চায়। খেলেও। আমাদের মতো দলের বিপক্ষে চালিয়ে খেলা মানে হাত খুলে দ্রুত রান করবে, আমাদের সামনে একটা চ্যালেঞ্জিং টোটাল দাঁড় করাবে। এমন ইনটেনশন রেখেই নিশ্চয়ই অস্ট্রেলিয়া ইনিংস শুরু করেছিল।’
কিন্তু বাংলাদেশের বোলারদের চ্যালেঞ্জের মুখে আর ইনিংস মেরামত করতে পারেনি পেসাররা, ‘কিন্তু আমাদের বোলাররা, বিশেষ করে পেসাররা, ক্রমাগত খুব ভালো জায়গায় বল ফেলে তাদের সেই পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। নিজেরা সফল হয়ে অস্ট্রেলিয়ানদের ব্যর্থ করে দিয়েছে। আমার মনে হয়, আমাদের পেসাররা দীর্ঘ সময় টাইট লাইন-লেন্থে বল ফেলায় অস্ট্রেলিয়ানদের আক্রমণাত্মক অ্যাপ্রোচ সফল হয়নি। বরং সেটা ব্যাকফায়ার করেছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের কেউ রান করতে না পেরে, কেউ ইনসাইড এজে বোল্ড হয়েছে। কেউ আবার বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছে।’
এআরবি/আইএন
What's Your Reaction?

