চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। শপথ নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আসছেন তিনি। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে থাকছে আসন্ন অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)।
সাধারণত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেই রীতি পাল্টে বিএনপি সরকারের অনুষ্ঠিত তিনটি একনেক সভা সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয় গত ৬ এপ্রিল। এবার একনেক সভার ভেন্যু আবার ফিরে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন চত্বরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন। আগামীকাল সোমবার (১৮ মে) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন দেওয়া হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী।
ফলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথমবারের মতো তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আসছেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
আগামীকাল (সোমবার) এনইসি সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে আমরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিমূলক কাজ করছি।—মো. গোলাম মোছাদ্দেক
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে পরিকল্পনা কমিশনে এখন সাজ সাজ রব। পুরো চত্বরজুড়ে ব্যস্ততা ও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রণালয়ের সড়কজুড়ে পড়েছে নতুন বিটুমিন। ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছগুলো অপসারণে সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন। মন্ত্রণালয়ের আঙিনায় লাগানো হয়েছে নতুন নতুন বাহারি ফুলের চারা। পুরো মন্ত্রণালয়ে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ।
এনইসি সভা ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর অফিস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের আসবাবপত্রে রঙের আঁচড় পড়েছে। পাশাপাশি কিছু দেয়ালে পড়ছে রঙের প্রলেপ। কিছু কর্মকর্তা সব কিছু ঘুরে ঘুরে দেখছেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের লাইব্রেরিতে নতুন করে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে লিখা বইয়ের বাহারি কালেকশন দেখা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন বিভাগ) মো. গোলাম মোছাদ্দেক জাগো নিউজকে বলেছেন, ‘আগামীকাল (সোমবার) এনইসি সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে আমরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিমূলক কাজ করছি।’
গত ৯ মে কমিশনের বর্ধিত সভায় এডিপির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। খাতভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হয় গত ১৬ মে। এটি আগামীকাল ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
গত ৬ এপ্রিল বর্তমান সরকারের প্রথম একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয় সচিবালয়ে/সংগৃহীত ছবি
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে আরও ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার বেশি।
এবারের এডিপিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বড় অংশজুড়ে রয়েছে ‘থোক বরাদ্দ’। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। বিপরীতে সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত—৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত এডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে থোক বরাদ্দের পরিমাণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, অথচ একই খাতে থোক বরাদ্দ ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ—৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
তবে বড় আকারের এডিপি ও বিপুল থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদেরা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ অবস্থায় আরও বড় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি এবং কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি। পাশাপাশি ১ হাজার ২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্পও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এমওএস/এমকেআর