বন ধ্বংস-খাদ্যসংকটে বিলুপ্তির শঙ্কায় বন্যহাতি

এক সময় কক্সবাজারে টেকনাফ বনাঞ্চলে বন্যহাতির অবাধ বিচরণ ছিল। স্থানীয়দের কাছে হাতির পাল দেখা ছিল পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি সম্প্রসারণ, হাতির চলাচলের করিডোর দখল এবং খাদ্যের সংকটে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আবাসস্থল ও নিরাপদ বিচরণপথ হারিয়ে টেকনাফে দিন দিন কমছে বন্যহাতির সংখ্যা। ফলে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে এ অঞ্চলের হাতির টিকে থাকার ভবিষ্যৎ। স্থানীয়দের মতে, বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাবে বন্যহাতিগুলো প্রায়ই খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এতে একদিকে ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়, অন্যদিকে মানুষ ও হাতি, উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। লোকালয়ে আসা হাতিগুলোর অনেককেই দুর্বল ও অপুষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। সম্প্রতি টেকনাফে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে এসে একটি বন্য মা হাতি উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও এ সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, টেকনাফের বনাঞ্চল বন্যহাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু বছরের পর বছর বনভূমি ধ্বংস, অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা এবং হাতির চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় হাতিগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল ও খাদ্য স

বন ধ্বংস-খাদ্যসংকটে বিলুপ্তির শঙ্কায় বন্যহাতি

এক সময় কক্সবাজারে টেকনাফ বনাঞ্চলে বন্যহাতির অবাধ বিচরণ ছিল। স্থানীয়দের কাছে হাতির পাল দেখা ছিল পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি সম্প্রসারণ, হাতির চলাচলের করিডোর দখল এবং খাদ্যের সংকটে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আবাসস্থল ও নিরাপদ বিচরণপথ হারিয়ে টেকনাফে দিন দিন কমছে বন্যহাতির সংখ্যা। ফলে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে এ অঞ্চলের হাতির টিকে থাকার ভবিষ্যৎ।

স্থানীয়দের মতে, বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাবে বন্যহাতিগুলো প্রায়ই খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এতে একদিকে ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়, অন্যদিকে মানুষ ও হাতি, উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। লোকালয়ে আসা হাতিগুলোর অনেককেই দুর্বল ও অপুষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। সম্প্রতি টেকনাফে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে এসে একটি বন্য মা হাতি উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও এ সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, টেকনাফের বনাঞ্চল বন্যহাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু বছরের পর বছর বনভূমি ধ্বংস, অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা এবং হাতির চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় হাতিগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল ও খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে মানুষ-হাতি সংঘাতও বাড়ছে।

‘বনে হাতির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কাজ চলছে। হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে। কিন্তু হাতির চলাচলের করিডোর এখন আর আগের মতো নেই। যেসব এলাকায় হাতির চলাচলের পথ ছিল, সেখানে এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রেললাইন ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।’

তিনি বলেন, আজ থেকে ১১-১২ বছর আগেও এ বনাঞ্চলে ১৫ থেকে ২০টি হাতির একাধিক পাল নিয়মিত বিচরণ করতো। বনের আশপাশে এসব হাতির অবাধ চলাচল ছিল সাধারণ দৃশ্য। স্থানীয় মানুষ হাতির পাল দেখে ছবি তুলতেন, ভিডিও ধারণ করতেন। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট এবং মানুষের দখলদারিত্বের কারণে এক সময়ের সেই হাতির পাল অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, গত ১১ জুলাই টেকনাফের নাইট্যাংপাড়া পাহাড়ি এলাকায় খাদ্যের সন্ধানে আসা একটি বন্য মা হাতি উঁচু পাহাড় থেকে নিচে পড়ে মারা যায়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। এটি হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যসংকটের ভয়াবহ বাস্তবতারই একটি করুণ উদাহরণ।

স্থানীয় শিক্ষক মাস্টার ইলিয়াস বলেন, বন্যহাতি সংরক্ষণে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংরক্ষণ, বন উজাড় বন্ধ, পাহাড় ধ্বংস রোধ, বনাঞ্চলে হাতির উপযোগী খাদ্যগাছ রোপণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে মানুষ-হাতি সংঘাত কমানোর পাশাপাশি বন্যহাতি সংরক্ষণও অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব।

‘একসময় এসব হাতি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতো। কিন্তু বর্তমানে সীমান্তে কাঁটাতার ও ল্যান্ডমাইন থাকায় তাদের আগের চলাচলের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাতিগুলো আগের মতো সীমান্তের দুই পাশে যাতায়াত করতে পারে না।’

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগের পাশাপাশি প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আহত বা বিপদগ্রস্ত হাতির দ্রুত উদ্ধার, নিয়মিত নজরদারি এবং হাতির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা গেলে টেকনাফে বর্তমানে যেসব হাতির অবস্থানসহ চলাচল রয়েছে সে বন্য হাতিগুলোকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

বন-বিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বলেন, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)পরিচালিত ২০১৬ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বর্ষাকালে ৪৮টি এবং গ্রীষ্মকালে গড়ে ৭৮টি বন্য হাতির চলাচল রেকর্ড করা হয়। বর্তমানে কয়টি হাতি আছে বা চলাচল করে সেটার সঠিক তথ্য জানা নেই।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বনে হাতির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কাজ চলছে। হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে। কিন্তু হাতির চলাচলের করিডোর এখন আর আগের মতো নেই। যেসব এলাকায় হাতির চলাচলের পথ ছিল, সেখানে এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রেললাইন ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

‘বন বিভাগের পাশাপাশি প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আহত বা বিপদগ্রস্ত হাতির দ্রুত উদ্ধার, নিয়মিত নজরদারি এবং হাতির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা গেলে টেকনাফে বর্তমানে যেসব হাতির অবস্থানসহ চলাচল রয়েছে সে বন্য হাতিগুলোকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

তিনি আরও বলেন, একটি বন্যহাতি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার হাঁটে। উখিয়া-টেকনাফে এখন এমন কোনো বন নেই টানা ২০ কিলোমিটার। কারণ বনাঞ্চলের মাঝখানে বসতি ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপিত হওয়ায় হাতিগুলো (আইসোলেটেড) হয়ে পড়েছে। এর ফলে তাদের মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। একসময় এসব হাতি নাফ নদী পেরিয়ে মিয়ানমারে যেত এবং সেখান থেকে আবার ফিরে আসত। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রাকৃতিক করিডোরগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ২০০ কেজি খাদ্যের প্রয়োজন হয়। হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত কমাতে বন বিভাগ ২৭টি ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) গঠন করেছে, যারা স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি হাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে নতুনভাবে হাতির জরিপ করার জন্য একটি প্রজেক্ট থেকে কাজ শুরু করা হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাতি চলাচলের জন্য আলাদা কোনো করিডোর তৈরি করা হয়নি। তবে যতদূর জানা যায়, ক্যাম্প-সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় হাতিগুলো বিচরণ করে।

তিনি আরও বলেন, একসময় এসব হাতি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতো। কিন্তু বর্তমানে সীমান্তে কাঁটাতার ও ল্যান্ডমাইন থাকায় তাদের আগের চলাচলের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাতিগুলো আগের মতো সীমান্তের দুই পাশে যাতায়াত করতে পারে না।

মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে হাতির স্বাভাবিক চলাচলের করিডোরও আর নেই। তবে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি বনাঞ্চলে এখনও বন্য হাতির উপস্থিতি রয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, বনাঞ্চলে কোথাও কেউ যদি হাতির চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বা হাতির কোনো ধরনের ক্ষতির চেষ্টা করা হয় তাহলে প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে।

তিনি আরও বলেন, হাতি সংরক্ষণে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। হাতির চলাচলের করিডোর নষ্ট হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সমন্বয় সভায় আলোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও তুলে ধরা হবে।

এনএইচআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow