বৃষ্টি সবার কাছে উপভোগের নয়

মাহাফুজা শিরিন বৈরী আবহাওয়া, ঝুম বৃষ্টি, জানলার ফাঁক গলে ঠান্ডা বাতাসের আনাগোনা, ঠিক এরকম মুহূর্তে ​জানালার পাশে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা, সঙ্গে রবিঠাকুরের গান আর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে রোমান্টিক হয়ে ওঠার মতো সুযোগ এ সমাজে সবার হয় না। আমাদের কাছে চেনা এই প্রিয় বর্ষা অনেকের কাছেই দুর্ভোগ, চরম নিষ্ঠুরতা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের নাম। এই সংগ্রাম ​যাদের জীবনে আছে তাদের কাছে বৃষ্টি কোনো উৎসব বা উদযাপনের বার্তা নিয়ে আসে না, বরং নিয়ে আসে একরাশ হতাশা, দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তা। ​রিকশাচালক ও ভ্যানচালক বৃষ্টির মধ্যে একদিন বের হতে না পারলে উনুন জ্বলে না। আবার কোনোভাবে বের হতে পারলেও বৃষ্টির মধ্যে যাত্রী কমে যায়, ভিজলে অসুখ হওয়ার ভয় থাকে। সব মিলিয়ে কী অসহায়তা। এদের মধ্যে আরও আছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ, ​যাদের প্রতিদিনের আয়ের ওপর পুরো পরিবারের অন্নসংস্থান নির্ভর করে, বৃষ্টি তো তাদের জন্য এক বড় অভিশাপ। ​প্রতিদিনের আয়ের ওপর পুরো পরিবারের অন্নসংস্থান নির্ভর করে। ছবি:জাগো নিউজ এরকম পরিস্থিতিতে ফেরিওয়ালা ও উন্মুক্ত বাজারের বিক্রেতাদের অবস্থাও হয়ে পড়ে করুণ। খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে যারা ব্যবসা করেন, বৃষ্ট

বৃষ্টি সবার কাছে উপভোগের নয়

মাহাফুজা শিরিন

বৈরী আবহাওয়া, ঝুম বৃষ্টি, জানলার ফাঁক গলে ঠান্ডা বাতাসের আনাগোনা, ঠিক এরকম মুহূর্তে ​জানালার পাশে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা, সঙ্গে রবিঠাকুরের গান আর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে রোমান্টিক হয়ে ওঠার মতো সুযোগ এ সমাজে সবার হয় না। আমাদের কাছে চেনা এই প্রিয় বর্ষা অনেকের কাছেই দুর্ভোগ, চরম নিষ্ঠুরতা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের নাম। এই সংগ্রাম ​যাদের জীবনে আছে তাদের কাছে বৃষ্টি কোনো উৎসব বা উদযাপনের বার্তা নিয়ে আসে না, বরং নিয়ে আসে একরাশ হতাশা, দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তা।

রিকশাচালক ও ভ্যানচালক বৃষ্টির মধ্যে একদিন বের হতে না পারলে উনুন জ্বলে না। আবার কোনোভাবে বের হতে পারলেও বৃষ্টির মধ্যে যাত্রী কমে যায়, ভিজলে অসুখ হওয়ার ভয় থাকে। সব মিলিয়ে কী অসহায়তা। এদের মধ্যে আরও আছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ, ​যাদের প্রতিদিনের আয়ের ওপর পুরো পরিবারের অন্নসংস্থান নির্ভর করে, বৃষ্টি তো তাদের জন্য এক বড় অভিশাপ।

jagonews
​প্রতিদিনের আয়ের ওপর পুরো পরিবারের অন্নসংস্থান নির্ভর করে। ছবি:জাগো নিউজ

এরকম পরিস্থিতিতে ফেরিওয়ালা ও উন্মুক্ত বাজারের বিক্রেতাদের অবস্থাও হয়ে পড়ে করুণ। খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে যারা ব্যবসা করেন, বৃষ্টির তোড়ে তাদের পণ্য নষ্ট হয় এবং বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ​নির্মাণ শ্রমিক যারা আছেন তাদের বৃষ্টির দিনে সব ধরনের কনস্ট্রাকশনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে দিনমজুরেরা মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। বন্ধ হয়ে যায় সংসারের চাকা। এরকম ছিন্নমূল মানুষদের কাছে বৃষ্টি মানেই এক বিভীষিকা।

ফুটপাতের বাসিন্দা যারা, যারা রাতে স্টেশন, বাস টার্মিনাল বা ফুটপাতে ঘুমান, বৃষ্টির রাতে তাদের মাথা গোঁজার মতো কোনো শুকনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকে না। এসকল বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষ ​যাদের মাথার ওপর পাকা কোন ছাদ নেই, সামান্য বৃষ্টিতেই বস্তির নিচু ঘরগুলোতে নর্দমার নোংরা পানি ঢুকে পড়ে। বিছানা-বালিশ ভিজিয়ে চালের ফুটো দিয়ে পড়া পানি তাদের বিনিদ্র রাত কাটাতে বাধ্য করে। তাদের ঘরে চাল নেই, কাজ নেই, এরকম আবহাওয়ার কারণে ঠান্ডাজনিত কোনো অসুখ হলে জোটে না যথাযথ চিকিৎসা।

ভারী বর্ষণে বা বর্ষার মৌসুমে শুধু যে নিম্মবিত্তরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন নয়। এমন পরিবেশে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকেন শহরের সাধারণ পথচারী ও চাকরিজীবী মধ্যবিত্তরাও। কারণ প্রতিদিনের মতো তাদের কাজের জন্য ছুটতে হতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হতে হয়, অফিস, স্কুল, কলেজে যাতায়াতে করা কঠিন হয়ে যায়।

jagoপরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া যা মধ্যবিত্তদের জন্য ভীষণ চাপে। ছবি:জাগো নিউজ

ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্টি হয় ​জলাবদ্ধতা ও শহরের রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। নোংরা ও সংক্রামক পানি মাড়িয়ে, খোলা ম্যানহোলের ঝুঁকি নিয়ে তাদের পথ চলতে হয়। অর্থাৎ ​যাদের প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে বের হতেই হয়, তাদের ভোগান্তির আর শেষ থাকে না। এরপর দেখা যায় ​পরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া যা মধ্যবিত্তদের জন্য ভীষণ চাপের। বৃষ্টির কারণে গণপরিবহন কমে যায় এবং রিকশা বা সিএনজিচালকেরা দ্বিগুণ-ত্রিগুণ ভাড়া দাবি করে।

​গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের কাছে অতিবৃষ্টি মানেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাতছানি। নদীভাঙন ও হাওর অঞ্চলের মানুষরাও বৃষ্টির কবল থেকে বাঁচতে পারেন না। বর্ষায় নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। চোখের পলকে তাদের ভিটেমাটি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অতিরিক্ত ভারী বৃষ্টিতে কৃষকের পাকা ধান বা সবজি খেত তলিয়ে যায়, যা তাদের ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলে।

​এক ফোঁটা বৃষ্টি কারো কাছে ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ি আর কড়কড়ে করে ভাজা ইলিশ মাছ খাওয়া কোনো দুপুরের গল্প, কারো কাছে বৃষ্টি মানেই কবিতার ছন্দ, আবার কারো কাছে বুক চিরে আসা কঠিন এক দীর্ঘশ্বাস। সমাজ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যই নির্ধারণ করে দেয় প্রকৃতির এই দান কার কাছে আশীর্বাদ হবে আর কার কাছে হবে চরম দুর্ভোগ বা অশান্তির কারণ।

এই দুর্ভোগ কেবল প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, এর পেছনে রয়েছে কাঠামোগত ও সামাজিক বৈষম্য। এই অসহায় মানুষগুলোর কষ্ট লাঘবে প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগ।

সমাজের উচ্চবিত্ত ও সামর্থ্যবানদের উচিৎ ​সমাজের এই সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের প্রতি মানবিক সহানুভূতি ও সচেতনতা নিয়ে কাজ করা অথবা যারা সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে কাজ করে তাদের সাথে যুক্ত হওয়া। এছাড়াও বৃষ্টির দিনে দারোয়ান, গৃহকর্মী, গাড়িচালক বা অফিসের পিয়নদের কাজের চাপ কমানো এবং প্রয়োজনে তাদের আগে বাড়ি ফেরার সুযোগ দেওয়া।

বৃষ্টির দিনে যে রিকশাচালক বা ভ্যানচালক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিচ্ছেন, তাকে অতিরিক্ত কিছু টাকা দেওয়া-যা তাদের ওই অভাব পূরণে সাহায্য করবে। অতিবৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার দিনগুলোতে নিজস্ব উদ্যোগে বা কমিউনিটি ক্লাবের মাধ্যমে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা উচিৎ।

jagonewsরিকশাচালক ও ভ্যানচালক বৃষ্টির মধ্যে একদিন বের হতে না পারলে উনুন জ্বলে না। ছবি:জাগো নিউজ

এছাড়াও বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বর্ষা মৌসুমে ভাসমান মানুষদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয় বা রেইনকোট/ছাতা বিতরণের মতো প্রকল্প হাতে নিতে পারে। যাতে করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর কিছুটা হলেও আচান হয়।

​শুধু উচ্চবিত্ত বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নয়, ​একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। ​দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে শতভাগ কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং খাল ও জলাশয়গুলো দখলমুক্ত করা, ​ছিন্নমূল ও বস্তিবাসীদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে ‘সবার জন্য বাসস্থান‘ প্রকল্পের আওতায় ফুটপাতে ঘুমানো ও বস্তিতে থাকা মানুষদের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ আবাসন গড়ে তোলা উচিত।

চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে প্রতিটি ওয়ার্ড বা এলাকায় দুর্যোগকালীন অস্থায়ী জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা এবং জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বর্ষাবাহিত রোগ (ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, টাইফয়েড) মোকাবিলায় বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা,​ বৃষ্টির দোহাই দিয়ে পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের উৎসব চলে, তা কঠোর হাতে দমন করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারি বাড়ানো সরকারের আবশ্য কর্তব্য।

বৃষ্টি যেমন প্রকৃতির আশীর্বাদ, ঠিক তেমনি বৃষ্টি যেন কারো জন্য অভিশাপ না হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের কাঠামোগত উন্নয়ন এবং উচ্চবিত্তের মানবিক দায়বদ্ধতাই পারে একটি সমতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে, যেখানে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা সবার মনে সমান আনন্দ জোগাবে। বৃষ্টি কারো কাছে ভোগান্তির কারণ না হয়ে সবার কাছে উপভোগের বিষয় হবে।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow