বেশি ওজনের গরুর মাংসে হৃদরোগের ঝুঁকি, উত্তম ২০০-২৫০ কেজি

শিঙের গোড়া তুলনামূলক মোটা হলে বুঝতে হবে গরু সুস্থ মাংসের বিন্যাস সর্বত্র সমান-মসৃণ হলে পশুটি প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বোঝায় মাংস সরাসরি ডিপ ফ্রিজে রাখা ভুল পদ্ধতি পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশজুড়ে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। তবে মাংস ভালো পাওয়ার জন্য শুধু গরুর আকার বা দাম নয়, কোন জাতের গরু এবং সেটি কীভাবে চিনবেন, এই বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরুর শারীরিক গঠন, মাংসের বিন্যাস ও স্বাস্থ্যের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখে সহজেই বোঝা যায় কোন গরুর মাংস হবে বেশি সুস্বাদু, নরম ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ। তার মতে, বেশি ওজনের গরুর মাংসে হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে। তবে দেশি জাতের ২০০-২৫০ কেজি ওজনের গরুর মাংস উত্তম। অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‌‘ভালো মানের মাংসের জন্য গরুর শরীরে মাংসের বিন্যাস সমান ও মসৃণ হওয়া জরুরি। রানের অংশে অতিরিক্ত মাংস কিংবা শরীরে থোকা থোকা ক্লাস্টারের মতো গঠন থাকলে সেই মাংসের স্বাদ ও টেক্সচার ভালো হয় না। গলার নিচের ঝুলন্ত অংশ বা ডিউল্য

বেশি ওজনের গরুর মাংসে হৃদরোগের ঝুঁকি, উত্তম ২০০-২৫০ কেজি
  • শিঙের গোড়া তুলনামূলক মোটা হলে বুঝতে হবে গরু সুস্থ
  • মাংসের বিন্যাস সর্বত্র সমান-মসৃণ হলে পশুটি প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বোঝায়
  • মাংস সরাসরি ডিপ ফ্রিজে রাখা ভুল পদ্ধতি

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশজুড়ে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। তবে মাংস ভালো পাওয়ার জন্য শুধু গরুর আকার বা দাম নয়, কোন জাতের গরু এবং সেটি কীভাবে চিনবেন, এই বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরুর শারীরিক গঠন, মাংসের বিন্যাস ও স্বাস্থ্যের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখে সহজেই বোঝা যায় কোন গরুর মাংস হবে বেশি সুস্বাদু, নরম ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ।

এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ। তার মতে, বেশি ওজনের গরুর মাংসে হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে। তবে দেশি জাতের ২০০-২৫০ কেজি ওজনের গরুর মাংস উত্তম।

অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‌‘ভালো মানের মাংসের জন্য গরুর শরীরে মাংসের বিন্যাস সমান ও মসৃণ হওয়া জরুরি। রানের অংশে অতিরিক্ত মাংস কিংবা শরীরে থোকা থোকা ক্লাস্টারের মতো গঠন থাকলে সেই মাংসের স্বাদ ও টেক্সচার ভালো হয় না। গলার নিচের ঝুলন্ত অংশ বা ডিউল্যাপ সমান থাকলে মাংসের গঠন ভালো হয়। তবে সেটি ফুলে থাকলে পশুর শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।’

গরুর জাত ও মূল্যমান প্রসঙ্গে বাকৃবির এই অধ্যাপক জানান, রেড চিটাগাং, শাহিওয়াল ক্রস, পাবনা ক্যাটেল কিংবা বগুড়ার সারিয়াকান্দির নর্দান গ্রে’র মতো প্রিমিয়াম দেশি জাতের সঙ্গে যখন অস্ট্রেলিয়ান জাতের ক্রস ব্রিডিং করা হয়, তখন পশুর ওজন ৩৫০-৪০০ কেজির ওপরে চলে যায়। তবে ৩৫০ কেজির বেশি ওজনের গরুর মাংসের মান খারাপ হয়। কারণ এগুলোতে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা চর্বি থাকে। দেশীয় ঘাস-লতা খাইয়ে এত বড় গরু লালন-পালন করা সম্ভব নয় বলে বাণিজ্যিক খাবার দেওয়া হয়, যা ফ্যাটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এই মাংস জুসি ও টেস্টি হলেও আসল গরুর মাংসের অ্যারোমা বা শক্ত টেক্সচার পাওয়া যায় না এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকায় তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই গুণগত মানের মাংসের জন্য ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে ২০০-২৫০ কেজি ওজনের দুই দাঁতের দেশি গরু কেনা সবচেয়ে উত্তম।

ভালো মানের গরু চেনার উপায় বিষয়ে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ভালো মাংসের জন্য গরুর শরীরের মাংসের বিন্যাস সমান হতে হবে। রানের অংশে মাংস বেশি এবং শরীরে কম, কিংবা আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ক্লাস্টার ফর্মে মাংস থাকলে সেই গরুর মাংস সুস্বাদু হয় না। মাংসের বিন্যাস সর্বত্র সমান ও মসৃণ হলে বুঝতে হবে পশুটি প্রাকৃতিকভাবে বড় করা এবং এতে কোনো ভেজাল নেই। গরুর গলার নিচের ফ্ল্যাপ বা ঝুলন্ত অংশ একদম প্লেইন বা সমান হলে মাংসের গঠন ভালো থাকে। কিন্তু এটি যদি ইডিমার মতো ফুলে থাকে তবে বুঝতে হবে পশুর শরীরে সমস্যা আছে।’

হাটে গরুর সুস্থতা যাচাইয়ের জন্য তার অ্যালার্টনেস বা সতর্কতা দেখতে হবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘একটি সুস্থ গরু সোজা ও সতর্ক হয়ে দাঁড়াবে। সামনে দিয়ে মানুষ হাঁটলে সে খেয়াল রাখবে এবং মুখের সামনে খাবার দিলে আগ্রহ দেখাবে। যদি পশুর পিঠে বা পেটে চাপ দিলে আঙুল দেবে যায় এবং সেই দেবে যাওয়া অংশ এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসে, তবে বুঝতে হবে পশুটির শরীরে অস্বাভাবিকতা আছে।’

হাটে গরুর পিঠে বা রাউন্ডে থাপ্পড় মারার রেওয়াজ প্রসঙ্গে বাকৃবির এই অধ্যাপক বলেন, ‘এটি মূলত গরুর অ্যালার্টনেস পরীক্ষার জন্য করা হয়। ড্রাগ বা স্টেরয়েড দেওয়া গরু নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকে, থাপ্পড় মারলেও নড়াচড়া করে না। তবে ভুল হ্যান্ডেলিং বা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধার কারণেও পশু সাময়িক ভিন্ন আচরণ করতে পারে। তাই শুধু অ্যালার্টনেস দেখে সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো।’

ক্রেতারা হাটে দাঁত দেখতে না পারলে বা বিক্রেতা না দেখাতে চাইলে শিঙের গোড়া দেখে বয়স অনুমান করা যাবে বলে জানান অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ।

তিনি বলেন, ‌‘শিঙের রুট বা গোড়া তুলনামূলক মোটা হলে বুঝতে হবে গরুর দুটি দাঁত উঠেছে। দুই শিঙের মাঝখানের ফাঁকা দেখে নতুন ক্রেতাদের পক্ষে বয়স বোঝা সম্ভব নয়।’

মাংস ফ্রিজে সংরক্ষণের সমস্যা নিয়ে ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কোরবানির পর মাংস সরাসরি মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ডিপ ফ্রিজে রেখে দেওয়া সম্পূর্ণ ভুল পদ্ধতি। এতে মাংসের ভেতরের এটিপি ভাঙার সুযোগ পায় না। পরবর্তী সময়ে যখন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কক্ষ তাপমাত্রায় ডি-ফ্রিজ করতে পানিতে বা বাইরে রাখা হয়, তখন মাইনাস ১৮ থেকে প্লাস ২৫ ডিগ্রির বিশাল পার্থক্যের কারণে এবং ভেতরে এটিপি অক্ষুণ্ন থাকায় মাংস স্যান্ডউইচের মতো সংকুচিত হয়ে অভ্যন্তরীণ মাইক্রোস্ট্রাকচার ভেঙে ফেলে। ফলে মাংসের ভেতরের পানি, যা আসলে প্রোটিন, তা ধুয়ে বের হয়ে যায় এবং কেবল ছিবড়ে বা ফাইবারটুকু অবশিষ্ট থাকে, যা নরমাল পদ্ধতির চেয়েও খারাপ।’

মাংস সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাংস পাওয়ার পর ব্যাকটেরিয়াল লোড ঠেকাতে প্রথমে ডিপ ফ্রিজে দুই থেকে তিন ঘণ্টা রেখে দিতে হবে, যাতে বাতাসের ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া কাজ করতে না পারে এবং পচন রোধ হয়। এরপর মাংস বের করে এক বা দুই কেজির প্যাকেট করে সাধারণ ফ্রিজের নরমাল অংশে অর্থাৎ ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বা দুই দিন রেখে দিতে হবে। এই সময়ে মাংসের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমবে, এটিপি ভেঙে অ্যামিনো এসিড তৈরি হবে এবং মাংসের গুণগত মান ও প্রোটিন অটুট থাকবে। নরমালে দুই দিন রাখার পর ডিপ ফ্রিজে স্থানান্তর করলে তা ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ অবস্থায় থাকবে।’

এসআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow