রক্ত, আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাসে লেখা ২১ জুলাই: যে দিন সাভারের আকাশ ভারী হয়েছিল কান্নায়
২১ জুলাই ২০২৪। তারিখটি এলেই সাভারের অসংখ্য মানুষের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি। রাস্তাজুড়ে ধোঁয়া, গুলির শব্দ, মানুষের ছুটোছুটি আর স্বজন হারানোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছিল পুরো জনপদ। কারফিউ উপেক্ষা করে হাজারো ছাত্র-জনতা যখন রাজপথে নেমেছিলেন, তখন কেউ ভাবেননি দিনের শেষে ঝরে যাবে ছয়টি তাজা প্রাণ, আর অসংখ্য পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হবে আজীবনের ক্ষত।
সকাল থেকেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কজুড়ে বিরাজ করছিল থমথমে পরিস্থিতি। একদিকে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে থানা বাসস্ট্যান্ড, পাকিজা মোড়, শিমুলতলা, রেডিও কলোনি, বিশমাইল, বাইপাইলসহ আশপাশের এলাকায়। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দুপুরের দিকে সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ নিলে গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তবে সেদিনের গল্প শুধু রাজপথেই থেমে থাকেনি। বিকেল গড়াতেই আতঙ্ক ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে। অনেক পরিবারের অভিযোগ, রাতভর চলে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। কেউ হারিয়েছেন জীবনের সঞ্চয়, কেউ স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী। কারও ঘরবাড়ি পরিণত হয়েছ
২১ জুলাই ২০২৪। তারিখটি এলেই সাভারের অসংখ্য মানুষের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি। রাস্তাজুড়ে ধোঁয়া, গুলির শব্দ, মানুষের ছুটোছুটি আর স্বজন হারানোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছিল পুরো জনপদ। কারফিউ উপেক্ষা করে হাজারো ছাত্র-জনতা যখন রাজপথে নেমেছিলেন, তখন কেউ ভাবেননি দিনের শেষে ঝরে যাবে ছয়টি তাজা প্রাণ, আর অসংখ্য পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হবে আজীবনের ক্ষত।
সকাল থেকেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কজুড়ে বিরাজ করছিল থমথমে পরিস্থিতি। একদিকে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে থানা বাসস্ট্যান্ড, পাকিজা মোড়, শিমুলতলা, রেডিও কলোনি, বিশমাইল, বাইপাইলসহ আশপাশের এলাকায়। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দুপুরের দিকে সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ নিলে গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তবে সেদিনের গল্প শুধু রাজপথেই থেমে থাকেনি। বিকেল গড়াতেই আতঙ্ক ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে। অনেক পরিবারের অভিযোগ, রাতভর চলে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। কেউ হারিয়েছেন জীবনের সঞ্চয়, কেউ স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী। কারও ঘরবাড়ি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।
ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম অভিযোগ করেন, তাকে না পেয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে হামলা চালানো হয়। এ সময় নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়। গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় এবং একাধিক যানবাহন ভাঙচুর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
খোরশেদ আলমের অভিযোগ, সেদিন পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা তার শ্যালকের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও রেহাই দেয়নি। ভয়ে ও আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে তার শ্বশুরবাড়ির পরিবার।
সেদিনের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমার স্ত্রীও সেদিন আমার শ্বশুরবাড়িতে ছিল। এখনো মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে ভয় পেয়ে সে “আমাকে বাঁচাও” বলে চিৎকার করে ওঠে। তখন খুব কষ্ট হয়। শুধু রাজনীতি করার কারণে নিজের পরিবারকেও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি—এই ভাবনা আমাকে কষ্ট দেয়। নিজেও দীর্ঘ ১৭ বছর ঘরবাড়ি ছেড়ে ভবঘুরের মতো জীবন কাটিয়েছি।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের ভাষ্য, সেদিন শুধু সম্পদই নষ্ট হয়নি, ভেঙে গিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়ের বিশ্বাসও।
সেদিন রেহাই পাননি সাংবাদিকরাও। শেখ নয়ন ফয়সাল নামে এক গণমাধ্যমকর্মী হামলার শিকার হন। তার অভিযোগ, আপেল মাহমুদ নামে এক আওয়ামী লীগ নেতার নেতৃত্বে তার ওপর হামলা চালানো হয়। হামলার পর ভয়ে তিনি সাভার ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে শেখ নয়ন ফয়সাল নওগাঁয় বিজয় টেলিভিশনের উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।
এ ছাড়া সাভারে সংঘটিত তাণ্ডবের সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক কালবেলা ও এখন টেলিভিশনের সাভার প্রতিনিধি হুমায়ুন কবিরকেও প্রকাশ্যে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে তৎকালীন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফির বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ, ছাত্র হত্যাসহ একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করে ডিবি পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বাদ যায়নি স্থানীয় পত্রিকা কার্যালয়ও। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফির নেতৃত্বে দৈনিক ফুলকি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক নজমুল হুদা শাহীনকে আটক করে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিক নজমুল হুদা শাহীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি তৎকালীন পুলিশি হামলা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন।
যারা সেদিন রাজপথে ছিলেন, তাদের অনেকেই বলেন, ২১ জুলাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি ভয়, রক্ত, কান্না ও প্রতিরোধের স্মৃতি। সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আজও তাদের তাড়া করে ফেরে। গুলির শব্দ থেমে গেছে, ধোঁয়া মিলিয়ে গেছে। কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনা, ভাঙচুর হওয়া ঘরের স্মৃতি আর আতঙ্কের সেই দীর্ঘ রাত এখনো অনেক পরিবারের জীবনে অমোচনীয় হয়ে আছে।
ইতিহাসের পাতায় ২১ জুলাই সাভারের মানুষের কাছে শুধু একটি দিন নয়। এটি এমন এক ক্ষত, যার দাগ সময়ও মুছে দিতে পারেনি।