রাজনীতিতে নতুন মুখ, পুরোনো সংস্কৃতি

একটি নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যায়। পরিচিত মুখের জায়গায় নতুন মুখ আসে, পুরোনো দলের পাশে নতুন দল দাঁড়ায়, নতুন স্লোগান শোনা যায়, নতুন প্রতিশ্রুতি সামনে আসে। সংবাদপত্রের পাতায় তখন ‘পরিবর্তন’, ‘নতুন রাজনীতি’, ‘নতুন প্রজন্ম’—এই শব্দগুলো ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: মুখ বদলালেই কি রাজনীতি বদলায়? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দলীয় সংঘাত, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল স্থানীয় সরকার এবং নাগরিক আস্থার সংকটের পর মানুষ পরিবর্তন চায়। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং নতুন মুখের আবির্ভাব সেই আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। কিন্তু নতুন মুখ যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পোশাক পরে আসে, তাহলে পরিবর্তনের প্রত্যাশা দ্রুতই হতাশায় পরিণত হতে পারে। রাজনীতিতে নতুন মুখ প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বাংলাদেশের রাজনীতির বড় সংকট ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান। এখানে দল অনেক সময় রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, নেতা দলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন, আর দলীয় আনুগত্য নীতির জায়গা দখল করে

রাজনীতিতে নতুন মুখ, পুরোনো সংস্কৃতি

একটি নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যায়। পরিচিত মুখের জায়গায় নতুন মুখ আসে, পুরোনো দলের পাশে নতুন দল দাঁড়ায়, নতুন স্লোগান শোনা যায়, নতুন প্রতিশ্রুতি সামনে আসে। সংবাদপত্রের পাতায় তখন ‘পরিবর্তন’, ‘নতুন রাজনীতি’, ‘নতুন প্রজন্ম’—এই শব্দগুলো ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: মুখ বদলালেই কি রাজনীতি বদলায়?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দলীয় সংঘাত, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল স্থানীয় সরকার এবং নাগরিক আস্থার সংকটের পর মানুষ পরিবর্তন চায়। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং নতুন মুখের আবির্ভাব সেই আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। কিন্তু নতুন মুখ যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পোশাক পরে আসে, তাহলে পরিবর্তনের প্রত্যাশা দ্রুতই হতাশায় পরিণত হতে পারে।

রাজনীতিতে নতুন মুখ প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের রাজনীতির বড় সংকট ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান। এখানে দল অনেক সময় রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, নেতা দলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন, আর দলীয় আনুগত্য নীতির জায়গা দখল করে নেয়। ফলে নতুন কেউ রাজনীতিতে এলেও তাকে খুব দ্রুত পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। সে যদি প্রশ্ন করে, তাকে বিদ্রোহী বলা হয়; যদি ভিন্নমত প্রকাশ করে, তাকে শৃঙ্খলাভঙ্গকারী বলা হয়; যদি নেতৃত্বের সমালোচনা করে, তাকে দলবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশেও নতুন রাজনৈতিক শক্তির সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে রাজনীতিতে নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। দলের অভ্যন্তরে নিয়মিত নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা, নারীর ও তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ, দলীয় অর্থের প্রকাশ্য হিসাব, নীতিনির্ভর রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান—এসব বাস্তবায়ন করলে নতুন রাজনীতি কথার বিষয় থাকবে না; বাস্তবে রূপ নেবে।

এভাবে নতুন মুখ পুরোনো সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকে নিজেই পুরোনো হয়ে যায়।

রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তরুণেরা প্রযুক্তি বোঝেন, বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে সচেতন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত। তাঁদের অনেকেই পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে নাগরিক অধিকার, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, শিক্ষা, পরিবেশ ও সুশাসনের প্রশ্ন তুলছেন।

কিন্তু তরুণ হওয়া আর নতুন রাজনৈতিক চিন্তার অধিকারী হওয়া এক বিষয় নয়। বয়স কম হলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি নতুন হয় না। নতুন প্রজন্মের একজন নেতা যদি পুরোনো নেতার মতোই ব্যক্তিপূজা চান, বিরোধী মত সহ্য না করেন, দলের ভেতরে নির্বাচন না দেন, ক্ষমতা পেলে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের প্রাধান্য দেন—তাহলে তাঁর বয়স নতুন হলেও রাজনীতি পুরোনোই থাকে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বিপদটি বাস্তব।

রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই পরিবর্তনের কথা বলে, কিন্তু নিজেদের ভেতরে পরিবর্তন আনতে চায় না। জনগণের কাছে গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু দলের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় অল্প কয়েকজনের হাতে। স্বচ্ছতার কথা বলা হয়, কিন্তু দলীয় অর্থায়ন, প্রার্থী মনোনয়ন ও নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া অনেক সময় অস্বচ্ছ থাকে। জবাবদিহির কথা বলা হয়, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা এবং নিজের দলের সমালোচনার মধ্যে নৈতিক পার্থক্য তৈরি করা হয়।

এটি কেবল একটি দলের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি নির্বাচন। কিন্তু গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনটির নাম নয়। একটি দল কতটা গণতান্ত্রিক, তা বোঝা যায় তার অভ্যন্তরীণ আচরণে। দলের নেতা কীভাবে নির্বাচিত হন, প্রার্থী কীভাবে মনোনীত হন, ভিন্নমত কীভাবে গ্রহণ করা হয়, দলের অর্থ কোথা থেকে আসে এবং নেতারা নিজেদের সিদ্ধান্তের জন্য কতটা জবাবদিহি করেন—এসব প্রশ্নের উত্তরই রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকৃত পরিচয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের রাজনীতিতে নির্বাচনকে অনেক সময় ক্ষমতা অর্জনের পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ হিসেবে নয়। ফলে নির্বাচনের পর ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতি বদলায় না।

নতুন মুখের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তারা কি পুরোনো ক্ষমতার ভাষা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন?

পুরোনো রাজনীতির একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা। রাজনৈতিক মতভেদকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করা, সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা, বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা—এসব সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। অথচ গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ শত্রু নয়; প্রতিপক্ষ হলো বিকল্প মতের প্রতিনিধি।

একটি সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল জানে, আগামীকাল সে বিরোধী দলে যেতে পারে। বিরোধী দল জানে, একদিন তাকে সরকার পরিচালনা করতে হবে। এই পারস্পরিক সম্ভাবনাই রাজনৈতিক আচরণে সংযম তৈরি করে। কিন্তু যখন কোনো দল মনে করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী, তখন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। আর যখন বিরোধী দল মনে করে ক্ষমতায় গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, তখন তারা নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনটি ভুলে যায়।

নতুন রাজনৈতিক মুখদের এই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে বের হতে হবে।

তাঁদের বুঝতে হবে, মানুষ শুধু নতুন প্রার্থী চায় না; মানুষ নতুন আচরণ চায়। মানুষ এমন নেতা চায়, যিনি প্রশ্নের উত্তর দেবেন, সাংবাদিকের কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন না, নিজের দলের ভুল স্বীকার করবেন, ক্ষমতার সীমা বুঝবেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের বাইরে রাখতে পারবেন।

রাজনীতিতে নতুন মুখের অর্থ কেবল নতুন বয়স বা নতুন নাম নয়। নতুন মুখ মানে নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতা।

এর সঙ্গে যুক্ত আছে অর্থের প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনি ব্যয়, রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং ক্ষমতার সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের বিতর্ক। রাজনীতি যদি ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতিতে প্রবেশের পথ সংকুচিত হয়। তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে অর্থবান ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষেত্র।

নতুন রাজনীতি চাইলে রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনতে হবে। নির্বাচনি ব্যয়ের বাস্তবসম্মত সীমা, দলীয় অর্থের নিরীক্ষা, অনুদানের প্রকাশ্য হিসাব এবং রাজনৈতিক পদ ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয়ে দৃঢ় ব্যবস্থা দরকার। শুধু বক্তৃতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে হবে না; রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ হতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় রাজনীতি। জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মুখ এলেও যদি স্থানীয় পর্যায়ে পুরোনো দখলদারি, প্রভাব বিস্তার, পেশিশক্তি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব বজায় থাকে, তাহলে পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গণতন্ত্রের প্রকৃত বিদ্যালয় হলো স্থানীয় সরকার। ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে জনগণের অংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত না হলে জাতীয় পর্যায়ের গণতন্ত্রও দুর্বল থাকে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই স্থানীয় পর্যায় থেকে নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। দলীয় মনোনয়ন শুধু কেন্দ্রীয় আনুগত্যের পুরস্কার হলে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ হবে না। জনগণের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, নৈতিকতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।

বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলো সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন করেছে। নতুন নেতৃত্ব এসেছে, পুরোনো নীতির পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নির্বাচন ও সদস্যদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কোথাও তরুণ নেতৃত্ব পুরোনো দলকে নতুন ভাষা দিয়েছে, কোথাও নতুন দল পুরোনো দলগুলোকে নিজেদের সংস্কার করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু এই পরিবর্তন কেবল নেতৃত্ব বদলের মাধ্যমে আসেনি; এসেছে প্রতিষ্ঠান ও আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে।

বাংলাদেশেও নতুন রাজনৈতিক শক্তির সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে রাজনীতিতে নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। দলের অভ্যন্তরে নিয়মিত নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা, নারীর ও তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ, দলীয় অর্থের প্রকাশ্য হিসাব, নীতিনির্ভর রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান—এসব বাস্তবায়ন করলে নতুন রাজনীতি কথার বিষয় থাকবে না; বাস্তবে রূপ নেবে।

তবে এজন্য নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে। নতুন মুখ দেখলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে যাওয়ার বদলে তাঁদের কাজ, নীতি, অর্থায়ন, সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো নেতা নতুন বলে তাঁকে অন্ধ সমর্থন করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি পুরোনো বলে কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করাও যুক্তিসংগত নয়। গণতন্ত্রে ব্যক্তি নয়, নীতি ও প্রতিষ্ঠানকে বিচার করতে হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, জনগণকেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের অংশ হতে হবে। আমরা যদি প্রার্থীর যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়, অর্থ বা দলীয় আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দিই, তাহলে রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে না। আমরা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকে ‘আমাদের লোক’ বলে ক্ষমা করি, কিন্তু প্রতিপক্ষের একই অপরাধে ক্ষুব্ধ হই, তাহলে রাজনৈতিক নৈতিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়।

রাজনীতির সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত সমাজের সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন নতুন মুখের আবির্ভাবের সঙ্গে নতুন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশার এই মুহূর্তটি খুব দ্রুত হতাশায় পরিণত হতে পারে, যদি নতুন নেতৃত্ব পুরোনো রাজনীতির ভাষা, কৌশল ও ক্ষমতার কাঠামোকে শুধু নতুন মুখ দিয়ে পুনরুৎপাদন করে।

মনে রাখতে হবে, ইতিহাসে অনেক পরিবর্তন মুখ বদল দিয়ে শুরু হয়েছে, কিন্তু টেকসই হয়েছে প্রতিষ্ঠান বদলের মাধ্যমে। নতুন নেতা পুরোনো চেয়ারে বসে পুরোনো আচরণ করলে দেশ নতুন কিছু পায় না। নতুন দল পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসরণ করলে তার নতুনত্ব কেবল নামেই থাকে।

বাংলাদেশের সামনে এখন তাই আসল পরীক্ষা নির্বাচন নয়, নির্বাচনের পরের রাজনীতি। নতুন মুখেরা কি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, জনআস্থার আমানত হিসেবে দেখবেন? তাঁরা কি বিরোধী মতকে সহ্য করবেন? দলের ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন? রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনবেন? প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখবেন? জনগণের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশের রাজনীতি সত্যিই বদলেছে কি না।

নতুন মুখ ইতিহাসের একটি সুযোগ। কিন্তু নতুন সংস্কৃতি ছাড়া সেই সুযোগ দ্রুতই পুরোনো গল্পে পরিণত হবে। মানুষ এখন শুধু নতুন নেতার মুখ দেখতে চায় না; তারা নতুন রাজনীতির আচরণ দেখতে চায়। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে ক্ষমতা বদলালে শুধু পতাকা বদলাবে না—প্রশাসনের চরিত্র বদলাবে, জবাবদিহির সংস্কৃতি বদলাবে, নাগরিকের মর্যাদা বাড়বে।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতির প্রকৃত পরিবর্তন কোনো নির্বাচনি পোস্টারে লেখা থাকে না। তা প্রকাশ পায় ক্ষমতা পাওয়ার পর একজন নেতা কী করেন, ক্ষমতা হারানোর পর কীভাবে আচরণ করেন এবং নিজের দলের ভুলের সামনে তিনি কতটা সত্যবাদী থাকেন—সেখানেই।
বাংলাদেশে নতুন মুখ এসেছে, আসছে, আরও আসবে। এখন দেখার বিষয়, তারা কি পুরোনো সংস্কৃতির নতুন মুখ হয়ে থাকবেন, নাকি সত্যিই এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবেন, যেখানে নেতা নয়—প্রতিষ্ঠান বড়, দল নয়—রাষ্ট্র বড়, আর ক্ষমতা নয়—জনগণই শেষ কথা?

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow