লাইফলাইন যখন ‘ডেথ ট্র্যাপ’: ফেনীর ২৭ কিলোমিটার পথ যেন আতঙ্কের করিডোর
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে বলা হয় দেশের অর্থনীতির প্রাণরেখা। রাজধানীর সঙ্গে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করা এই মহাসড়ক দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলাচল করে। কিন্তু সেই মহাসড়কের ফেনী অংশের মাত্র ২৭ কিলোমিটার এখন পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে। বর্ষার বৃষ্টিতে ক্ষতবিক্ষত সড়ক, অসংখ্য খানাখন্দ, দীর্ঘ যানজট এবং অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। গত সাত মাসেই এই অংশে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৭ জন। শুধু দুর্ঘটনায় প্রাণহানিই নয়, সড়কের এই বেহাল চিত্রের কারণে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন লাখো মানুষ। বাড়ছে পরিবহন ব্যয়, নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের যন্ত্রাংশ, বিলম্বিত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর। গর্ত এড়াতে গিয়ে ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা টানা বৃষ্টি আর ভারী যানবাহনের চাপে মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনের বিভিন্ন স্থানে উঠে গেছে কার্পেটিং। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও আবার পানি জমে তা ছোট পুকুরের রূপ নিয়েছে। এসব গর্তের অনেকগুলোই পানির নিচে থাকায় চালকদের পক্ষে গভীরতা বো
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে বলা হয় দেশের অর্থনীতির প্রাণরেখা। রাজধানীর সঙ্গে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করা এই মহাসড়ক দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলাচল করে। কিন্তু সেই মহাসড়কের ফেনী অংশের মাত্র ২৭ কিলোমিটার এখন পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে।
বর্ষার বৃষ্টিতে ক্ষতবিক্ষত সড়ক, অসংখ্য খানাখন্দ, দীর্ঘ যানজট এবং অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। গত সাত মাসেই এই অংশে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৭ জন। শুধু দুর্ঘটনায় প্রাণহানিই নয়, সড়কের এই বেহাল চিত্রের কারণে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন লাখো মানুষ। বাড়ছে পরিবহন ব্যয়, নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের যন্ত্রাংশ, বিলম্বিত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর।
গর্ত এড়াতে গিয়ে ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা
টানা বৃষ্টি আর ভারী যানবাহনের চাপে মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনের বিভিন্ন স্থানে উঠে গেছে কার্পেটিং। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও আবার পানি জমে তা ছোট পুকুরের রূপ নিয়েছে। এসব গর্তের অনেকগুলোই পানির নিচে থাকায় চালকদের পক্ষে গভীরতা বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সরেজমিনে নতুন সমিতি বাজার থেকে মুহুরীগঞ্জ, কসকা, লেমুয়া সেতু হয়ে লালপোল পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, পুরো সড়কজুড়েই ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও কোথাও সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) পক্ষ থেকে ইট ফেলে সাময়িক সংস্কারের চেষ্টা করা হলেও তা উল্টো সড়ককে আরও এবড়োখেবড়ো করে তুলেছে। ফলে প্রতিটি যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে এবং সামান্য অসতর্কতায় ঘটছে দুর্ঘটনা।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। বৃষ্টির পানিতে ঢেকে থাকা গর্ত এড়াতে গিয়ে অনেক চালক হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছেন। এতে বিপরীত দিক থেকে আসা বা পাশ দিয়ে চলা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।
মোটরসাইকেল চালক মুস্তাফিজ মুরাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চট্টগ্রামমুখী লেনের পুরোটা জুড়েই ছোট-বড় গর্ত। অনেক জায়গায় পানি জমে থাকায় বোঝার উপায় নেই গভীরতা কতটা। মোটরসাইকেল নিয়ে বের হওয়া মানে এখন জীবন বাজি রাখা।
সিএনজি অটোরিকশা চালক নাসির উদ্দিন বলেন, বড় বড় বাস-ট্রাক যখন এই ভাঙা রাস্তা দিয়া তাড়াহুড়া করে যেতে চায়, তখন আমাদের মতো ছোট গাড়িগুলোকে কেউ গুনায় ধরে না। সাইড দিতে গিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। প্রায় দিনই এই ২৭ কিলোমিটারে ছোট-বড় দুর্ঘটনা চোখের সামনে দেখি। পেটের দায়ে তাও গাড়ি নিয়া নামা লাগে, কিন্তু সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি।
ট্রাক চালক মোহাম্মদ আলী বলেন, এই ২৭ কিলোমিটার পার হতে ভয় লাগে, রাস্তায় যে বড় বড় গর্ত, কখন গাড়ি উল্টে যায় সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। ভাঙা রাস্তার কারণে গাড়ির এক্সেল, স্প্রিং প্রায়ই ভেঙে যায়। একবার জ্যামে পড়লে কয়েক ঘণ্টাও আটকে থাকা লাগে। একদিকে মালিকের চাপ, অন্যদিকে রাস্তায় ডাকাতির ভয়-সব মিলিয়ে এই পথে গাড়ি চালানো অনেক ঝুঁকি।
বাস চালক শহীদ উল্লাহ বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে টাইমিং মেইনটেইন করা আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু ফেনীর এই অংশে আসলেই সব শিডিউল ওলটপালট হয়ে যায়। খানাখন্দের কারণে যাত্রীরা বাসের ভেতর ঝাঁকুনিতে অসুস্থ হয়ে পড়ে, আমাদের গালিগালাজ করে। ভাঙা রাস্তায় স্টিয়ারিং ধরে রাখতে রাখতে হাত-পা ব্যথা হয়ে যায়। আমাদের দাবি- সড়ক বিভাগ যেন এর দ্রুত মেরামত করে।
তার ভাষ্য, গর্ত এড়াতে গিয়ে দ্রুতগতির যানবাহনগুলো হঠাৎ দিক পরিবর্তন করছে, আর তাতেই ঘটছে মুখোমুখি বা পাশ থেকে আসা গাড়ির মারাত্মক সংঘর্ষ।
অর্থনীতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জনজীবন
মহাসড়কের এই বেহাল অবস্থা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, এর বড় প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট এটি। কিন্তু ধীরগতির কারণে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
এছাড়া সড়কেরই বেহাল অবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রীরা। জরুরি রোগী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীদের জন্য এ পরিস্থিতি অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাসচালক নূরুল আফসার জানান, বারৈয়ারহাট থেকে মহিপাল আসতে এখন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগছে। যানবাহন ধীরগতিতে চলায় একদিকে যেমন বাড়ছে জ্বালানি খরচ, অন্যদিকে বিকল হচ্ছে গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রাংশ।
তিনি বলেন, তবে সবচেয়ে অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রী, নারী ও শিশুরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে।
মহাসড়কের পাশের বাসিন্দা জহিরুল হক বলেন, আমরা যারা রাস্তার পাশে থাকি, আমাদের দিন-রাত কাটে আতঙ্কের মধ্যে। বিকট শব্দে ব্রেক করার আওয়াজ পেলেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে-ভাবি আবার কার প্রাণ গেল। রাস্তা ভাঙা থাকায় ধুলাবালিতে ঘরে টেকা যায় না, বাচ্চারাসহ আমরা কাশিতে ভুগছি। আবার রাস্তা পারাপার হওয়া তো এখন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া।
ফেনী চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক নুর উদ্দিন বলেন, এই ২৭ কিলোমিটার মহাসড়ক এখন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, ব্যবসায় খাতের জন্যও বড় একটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক এই রুটে আটকে থাকছে। খানাখন্দ আর তীব্র যানজটের কারণে সময়মতো বন্দরে বা কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছানো যাচ্ছে না। যার খেসারত দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। আমরা দ্রুত এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই ও মহাসড়কের এই অংশের স্থায়ী সংস্কার দাবি করছি।
সাত মাসে ৩৭ প্রাণ, থামছে না মৃত্যুমিছিল
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মহাসড়কের ফেনী অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৭ জন। এর মধ্যে ফাজিলপুর এলাকায় ৯ জন এবং মহিপাল এলাকায় ২৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ।
এ সময় ৩৫টি মামলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের নথিভুক্ত তথ্যের বাইরেও অনেক দুর্ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর সব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি। ফলে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ফেনী জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান দারা বলেন, দুর্ঘটনার জন্য শুধু সড়কের অবস্থা দায়ী নয়। চালকদের দক্ষতার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত পণ্য বহন এবং ট্রাফিক নিয়ম না মানাও বড় কারণ।
অন্যদিকে হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, মহাসড়কে আলাদা সার্ভিস লেন না থাকাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। একই সড়কে ভারী ট্রাক, দ্রুতগতির বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটরসাইকেল চলাচল করায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তাদের মতে, দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানোর কারণে অনেক চালক ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গাড়ি চালানোর ঘটনাও কম নয়, যা ভয়াবহ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
জোড়াতালির মেরামত ও সওজ-এর আশ্বাস
ভোক্তভোগী চালক ও যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনটি ভেঙেচুরে একাকার হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আসা অতিরিক্ত পণ্যবাহী ট্রাকের চাপে এই লেনের ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রতিবারই চলে জোড়াতালির সাময়িক মেরামত, যা পরের বছরের বৃষ্টিতে আবার ধুয়ে যায়।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে ঢাকামুখী লেনে ভারী যানবাহনের চাপে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের সংস্কারকাজ চলমান। আগামী দুই দিন যদি বৃষ্টি না হয়, তবে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। সংস্কারকাজ শেষ হলে মহিপাল ও ফাজিলপুর অংশে দুর্ঘটনার শঙ্কা কমবে বলে আশা করছে হাইওয়ে পুলিশ।
এবিএএম/কেএইচকে/এএসএম
What's Your Reaction?


