শিক্ষক বনাম ছাত্র: বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন দ্বৈরথ

ফুটবল শুধু ট্রফি, গোল কিংবা জয়-পরাজয়ের গল্প নয়। কখনও এটি এমন কিছু সম্পর্কের জন্ম দেয়, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়। একদিন যে শ্রেণিকক্ষে একজন শিখিয়েছিলেন কীভাবে একজন ভালো কোচ হতে হয়, কয়েক বছর পর সেই শিক্ষককেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে তারই ছাত্রকে। ভাগ্যের এমন চিত্রনাট্য হয়তো সিনেমায়ও লেখা কঠিন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ঠিক এমনই এক মানবিক গল্পের সাক্ষী হতে চলেছে। রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং বর্তমান বিশ্ব ও কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে এই ফাইনালের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ দুই কোচ-স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি। কারণ, নয় বছর আগে স্কালোনি ছিলেন দে লা ফুয়েন্তের ছাত্র। আরও পড়ুন প্রত্যাবর্তনে বিশ্বকাপের সেরা স্কালোনির দল ২০১৭ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিং লাইসেন্স অর্জনের জন্য স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের লাস রোজাস প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন স্কালোনি। সেখানে তার অন্যতম শিক্ষক ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। তখন কেউই কল্পনা করেননি, কয়েক

শিক্ষক বনাম ছাত্র: বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন দ্বৈরথ

ফুটবল শুধু ট্রফি, গোল কিংবা জয়-পরাজয়ের গল্প নয়। কখনও এটি এমন কিছু সম্পর্কের জন্ম দেয়, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়। একদিন যে শ্রেণিকক্ষে একজন শিখিয়েছিলেন কীভাবে একজন ভালো কোচ হতে হয়, কয়েক বছর পর সেই শিক্ষককেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে তারই ছাত্রকে। ভাগ্যের এমন চিত্রনাট্য হয়তো সিনেমায়ও লেখা কঠিন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ঠিক এমনই এক মানবিক গল্পের সাক্ষী হতে চলেছে।

রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং বর্তমান বিশ্ব ও কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে এই ফাইনালের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ দুই কোচ-স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি। কারণ, নয় বছর আগে স্কালোনি ছিলেন দে লা ফুয়েন্তের ছাত্র।

২০১৭ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিং লাইসেন্স অর্জনের জন্য স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের লাস রোজাস প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন স্কালোনি। সেখানে তার অন্যতম শিক্ষক ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। তখন কেউই কল্পনা করেননি, কয়েক বছরের মধ্যেই দুইজন বিশ্বকাপের ফাইনালে দুই ভিন্ন দেশের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে একে অপরের বিপক্ষে লড়বেন।

jagonews

২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেন স্কালোনি। শুরুতে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হলেও খুব দ্রুতই তিনি আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল কোচে পরিণত হন। তার অধীনে ২০২১ সালে ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর আসে ২০২২ বিশ্বকাপ, ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং এখন টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি।

অন্যদিকে, ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেনের হতাশাজনক বিদায়ের পর জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন ৬৫ বছর বয়সী দে লা ফুয়েন্তে। তার হাত ধরেই স্পেন আবার ইউরোপ ও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ ইউরো জয়ের পর নেশনস লিগের ফাইনালে ওঠে লা রোজা, আর এবার বিশ্বকাপের ফাইনালেও পৌঁছে গেছে তারা।

ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর নিজের সাবেক শিক্ষককে নিয়ে আবেগঘন মন্তব্য করেন স্কালোনি। আর্জেন্টিনা কোচ বলেন, ‘তিনি আমার মেন্টর। কোচিং সম্পর্কে যা শিখেছি, তার অনেকটাই তার কাছ থেকে। আর এখন ভাগ্যের পরিহাসে আমরা বিশ্বকাপ ফাইনালে একে অপরের মুখোমুখি। কাতার বিশ্বকাপের পরও তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছিলাম। তিনি অসাধারণ কাজ করছেন, আমি তার জন্য সত্যিই খুশি।’

jago

স্কালোনির সঙ্গে স্পেনের সম্পর্ক শুধু কোচিং কোর্সেই সীমাবদ্ধ নয়। তার স্ত্রী এলিসা মনতেরো স্প্যানিশ। তাদের দুই সন্তানও স্পেনে জন্মেছে এবং পরিবার নিয়ে তারা মায়োর্কায় বসবাস করেন। খেলোয়াড়ি জীবনেও স্কালোনি দীর্ঘ সময় খেলেছেন দেপোর্তিভো লা করুনা, রাসিং সান্তান্দের ও মায়োর্কার হয়ে।

তবু ফাইনালে আবেগের কোনো জায়গা নেই বলে জানিয়ে আর্জেন্টাইন কোচ বলেন, ‘সবাই জানে আমি স্পেনে থাকি, আমার পরিবারও স্প্যানিশ। কিন্তু আমি দুঃখিত, আমি মি. দে লা ফুয়েন্তেকে হারানোরই চেষ্টা করব। একজন কোচ এবং মানুষ হিসেবে তার প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা রয়েছে।’

স্কালোনির প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল দে লা ফুয়েন্তেও। তিনি তার সাবেক ছাত্রকে স্মরণ করে বলেন, ‘লিওনেলের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। সে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সবকিছু জিতেছে। কোচ হিসেবে এবং মানুষ হিসেবেও আমি তাকে ভীষণ সম্মান করি।’

jago

নিজের ছাত্র সম্পর্কে দে লা ফুয়েন্তের মূল্যায়নও ছিল প্রশংসায় ভরা, ‘সে ছিল অত্যন্ত মনোযোগী এবং পরিশ্রমী ছাত্র। শেখার আগ্রহ ছিল অসাধারণ। তার শিক্ষক হতে পারাটা আমার জন্য গর্বের। তবে সবচেয়ে বড় কথা, সে আমার বন্ধু। আজও আমাদের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে।’

বিশ্বকাপের ফাইনালে সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন তারকা ফুটবলাররা। কিন্তু এবার ডাগআউটেও রয়েছে সমান আকর্ষণ। এক পাশে শিক্ষক, অন্য পাশে তারই ছাত্র। একজন চাইবেন স্পেনকে ১৬ বছর পর আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে, অন্যজন চাইবেন ব্রাজিলের ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে আর্জেন্টিনাকে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জেতাতে।

রোববার ৯০ মিনিটের জন্য বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা আর স্মৃতিগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখবেন দুজনই। কারণ শ্রেণিকক্ষের সেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবার রূপ নেবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ লড়াইয়ে।

আরআর/এমএমআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow