শিরীন শারমিন চৌধুরী এতদিন কোথায় ছিলেন?
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ফজরের নামাজ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখতেই ছড়িয়ে পড়ে একটি খবর—সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীকে রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মুহূর্তেই সংবাদটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই সঙ্গে শুরু হয় নতুন করে প্রশ্নের ঝড়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ধানমন্ডির ৮/এ রোডের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বাসাটি তার চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরীর বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে ভোর ৫টার দিকে তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় এবং সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরের স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলা এবং রাজধানীর উত্তরা ও বনানী থানায় দায়ের করা জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার মামলা। তবে তাকে গণঅভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক তথ্যের বাইরেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে—তি
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ফজরের নামাজ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখতেই ছড়িয়ে পড়ে একটি খবর—সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীকে রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মুহূর্তেই সংবাদটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই সঙ্গে শুরু হয় নতুন করে প্রশ্নের ঝড়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ধানমন্ডির ৮/এ রোডের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বাসাটি তার চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরীর বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে ভোর ৫টার দিকে তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় এবং সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরের স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলা এবং রাজধানীর উত্তরা ও বনানী থানায় দায়ের করা জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার মামলা। তবে তাকে গণঅভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক তথ্যের বাইরেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে—তিনি এতদিন কোথায় ছিলেন?
আত্মগোপন, নাকি পরিকল্পিত নীরবতা?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তিনি কার্যত জনসম্মুখ থেকে আড়ালে চলে যান। ২ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিলেও সেটি কোথা থেকে পাঠানো হয়েছিল—সে প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
আরও পড়ুন
সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আটক
লালবাগে হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো শিরীন শারমিন চৌধুরীকে
এই দীর্ঘ সময়জুড়ে জনমনে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়েছে—তিনি কি দেশে ছিলেন, নাকি বিদেশে অবস্থান করছিলেন? ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, তার গ্রেফতারের মধ্যদিয়ে তিনি যে দেশে ছিলেন, এ রহস্যের অবসান ঘটেছে। তবে এতদিন তার অবস্থান কীভাবে আড়ালে ছিল, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
সেনানিবাসে আশ্রয়ের তথ্য
গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) প্রকাশিত একটি তালিকায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল বলে জানা যায়।
এ তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—তাকে কি সেনানিবাস থেকেই অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল? এরপর তার গতিপথ কী ছিল? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কি তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ছিল? আরেকটি বড় প্রশ্ন—তিনি যদি এতদিন দেশেই থাকেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি তার অবস্থান জানতো?
অনেকের মতে একজন সাবেক স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির অবস্থান দীর্ঘদিন অজানা থাকা স্বাভাবিক নয়। আবার কেউ কেউ বলছেন, কৌশলগত কারণেই হয়তো এতদিন তাকে গ্রেফতার করা হয়নি।
পাসপোর্ট আবেদন নিয়ে বিতর্ক
আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সাবেতক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পাসপোর্ট আবেদন ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজে পাসপোর্ট অফিসে না গিয়েই বিশেষ ব্যবস্থায় বায়োমেট্রিক দিয়েছিন। যদিও পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তার আবেদন স্থগিত করা হয়। প্রশ্ন উঠছে—কে বা কারা এই সুবিধা দিয়েছিল? এটি কি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত?
৫ আগস্ট কোথায় ছিলেন?
সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের এক বক্তব্যে দাবি করা হয়, সরকার পতনের দিন তিনি সংসদ ভবনের একটি কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে এরপর তিনি কোথায় গেলেন? কার তত্ত্বাবধানে ছিলেন?
‘কম বিতর্কিত’ ইমেজ কি ভেঙে গেলো?
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বহু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও শিরীন শারমিন চৌধুরীকে তুলনামূলকভাবে ‘কম বিতর্কিত’ হিসেবে দেখা হতো। তাই তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এবং গ্রেফতারের ঘটনা অনেকের কাছেই বিস্ময় তৈরি করেছে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্পিকার নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্পিকার হন শিরিন শারমিন চৌধুরী এবং এরপর টানা এ দায়িত্বে ছিলেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট ডেপুটি স্পিকার শামসুল হককে রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
সব মিলিয়ে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতার কেবল একটি আইনগত ঘটনা নয়—এটি ঘিরে তৈরি হয়েছে বহুস্তরীয় প্রশ্ন, যার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
আদালতে উপস্থাপন ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর মিলতে পারে। তবে আপাতত জনমনে কৌতূহল ও সংশয়ের মেঘ কাটেনি।
এমইউ/ইএ
What's Your Reaction?