শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানও কি ইরান যুদ্ধে জড়াচ্ছে?

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পাকিস্তানকে নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি ইসলামাবাদকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আরও কাছাকাছি টেনে নিতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূমিকাও জটিল হয়ে উঠতে পারে। পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তি করতে সহায়তা করেছিল। এরই মধ্যে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে ইসলামাবাদ। ওই চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা ও একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলার ঘটনায় পাকিস্তান ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, চলতি সপ্তাহে হুথিদের হামলা ইসলামাবাদের ক্ষোভকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। কারণ এতে নতুন করে সৌদি-হুথি সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি হামলার অভিযোগ তুলে হুথি

শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানও কি ইরান যুদ্ধে জড়াচ্ছে?

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পাকিস্তানকে নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি ইসলামাবাদকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আরও কাছাকাছি টেনে নিতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূমিকাও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তি করতে সহায়তা করেছিল। এরই মধ্যে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে ইসলামাবাদ। ওই চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা ও একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলার ঘটনায় পাকিস্তান ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, চলতি সপ্তাহে হুথিদের হামলা ইসলামাবাদের ক্ষোভকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। কারণ এতে নতুন করে সৌদি-হুথি সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি হামলার অভিযোগ তুলে হুথিরা সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে সীমান্তে আবারও গোলাগুলি শুরু হলেও আপাতত তা একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, আমাদের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইরানকে জানিয়ে দিয়েছে, সৌদি আরবের ওপর হামলা মানে পাকিস্তানের ওপর হামলা। এটি আমাদের ‘রেড লাইন’।

সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় প্রতিবেদনে কথা বলা ওই কর্মকর্তা ও অন্য পাকিস্তানি কর্মকর্তারা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য দেন।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, পাকিস্তান ধারণাই করেনি যে পরিস্থিতি এত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের উদ্বেগের বড় কারণ হলো- চলতি বছরের শুরুতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে হুথিদের সম্পৃক্ততা পাকিস্তানকে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। পাকিস্তানের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা মোতায়েন থাকায় তারা এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।

এ ছাড়া ইসলামাবাদে আশঙ্কা রয়েছে, হুথিদের নেতৃত্বে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে। পাকিস্তানসহ বহু দেশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। সংঘাত বড় আকার ধারণ করলে সৌদি স্বার্থে হামলা হতে পারে, যা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তানকে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপে বাধ্য করতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তাফা বলেন, আপাতত পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি হুথিরা সৌদি আরবের আরও বিস্তৃত এলাকায় হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

ইরানকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

হুথি ও সৌদি আরবের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ইসলামাবাদে ইরানকে ঘিরে আরও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাকিস্তান সরকারের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের নেতৃত্বের ভেতরে ক্রমবর্ধমান বিভক্তিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামাবাদ।

তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের রাজনৈতিক অবস্থান ও লক্ষ্য এখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অবস্থানের সঙ্গে ক্রমেই ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলী বলেন, ইরানে এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বাড়ছে। ইসলামাবাদও বিষয়টি ক্রমেই উপলব্ধি করছে।

দুই পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণেই চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসলামাবাদ সফরে আসার কথা থাকা একটি ইরানি প্রতিনিধিদলের সফর স্থগিত করা হয়েছিল। সফরটি আগে প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি।

ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর, বুধবার ইসলামাবাদে পৌঁছায়। কর্মকর্তাদের মতে, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

তবে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, পাকিস্তান সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। তিনি বলেন, ধারাবাহিক যোগাযোগ, সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।

একসঙ্গে দুই ভূমিকায় পাকিস্তান

বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইলে পাকিস্তানকে এর সঙ্গে আসা কঠিন বাস্তবতারও মুখোমুখি হতে হবে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণার পর অনেকেই এটিকে এমন একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন যে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তার একমাত্র ভরসা হিসেবে আগের মতো নির্ভরযোগ্য মনে করছে না। ফলে তারা পাকিস্তানসহ বিকল্প অংশীদারের দিকে ঝুঁকছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান জ্বালানি তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে পাকিস্তানের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল। তখন জ্বালানি সংকট ঠেকাতে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধসহ জরুরি ব্যবস্থা নেয়।

বিশ্লেষক ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার পেছনে কেবল কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যই ছিল না; বন্ধ হয়ে যাওয়া জ্বালানি সরবরাহপথ স্বাভাবিক করাও ছিল বড় উদ্দেশ্য।

একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, হ্যাঁ, হতাশা রয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে সরে যাচ্ছি। এতে আমরা অনেক বিনিয়োগ করেছি এবং এটি সচল রাখার স্বার্থও আমাদের রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সপ্তাহে পাকিস্তান সম্ভবত আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার সবচেয়ে কঠিন অবস্থানে পৌঁছেছে।

মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আরেক পাকিস্তানি সূত্র বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়াই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো। কিন্তু যদি সৌদি আরব আমাদের ডাকে, তাহলে আমরা তাদের পাশেই দাঁড়াবো। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

সূত্র: ফার্স্টপোস্ট

এসএএইচ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow