‘সং অব বাংলাদেশ’ আমাদের একজন জোন বায়েজ 

সাল ১৯৭১, বিশ্ব ইতিহাসের এক বর্বরোচিত অধ্যায় যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় বীভৎস নির্যাতন, নৃশংস গণহত্যা, পৈশাচিক শ্লীলতাহানি, সীমাহীন লুটতরাজ আর দানবীয় দখলদারিত্বের যেসব করুণ ছবি চিত্রিত আছে তা কোনো কালের ধুলোয় মুছে যাওয়ার নয়। ঘটে যাওয়া এক অপূরণীয় ক্ষতি যা বাংলাদেশ আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।  ১৯৭১ সালের পূর্বে পৃথিবীতে এমন ঘটনা খুব কমই আছে, যেখানে মার্কিন মুল্লুকের এক বিখ্যাত সেতারবাদক বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করতে কনসার্টের আয়োজন করেছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ আর নিপীড়নের কথা ধীরে ধীরে জানতে শুরু করে সারাবিশ্ব। টানা ২৮ বছর পর সেই নির্যাতনের চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৭১-এ এসে। বিশ্ব সংবাদের শিরোনামে বারবার উঠে আসে বাংলাদেশের যুদ্ধাবস্থার অবর্ণনীয় এবং হৃদয়বিদারক তথ্য। বাঙালির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ওই অতর্কিত হামলা বহিঃর্বিশ্বের সঙ্গীতাঙ্গনের বহু শিল্পীদের মনকে আন্দোলিত করে। তাদের মধ্যে রবি শংকর, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, জোন বায়েজ, অ্যালেন গিন্সবার্গ, আন্দ্রে মালরো (বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক) অন্যতম। রবি শংকরের নাম ইতিহাস বারবার মনে করবে কারণ তিনি ম্যাডিসন স্কয়ারে বাংলাদেশ

‘সং অব বাংলাদেশ’ আমাদের একজন জোন বায়েজ 

সাল ১৯৭১, বিশ্ব ইতিহাসের এক বর্বরোচিত অধ্যায় যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় বীভৎস নির্যাতন, নৃশংস গণহত্যা, পৈশাচিক শ্লীলতাহানি, সীমাহীন লুটতরাজ আর দানবীয় দখলদারিত্বের যেসব করুণ ছবি চিত্রিত আছে তা কোনো কালের ধুলোয় মুছে যাওয়ার নয়। ঘটে যাওয়া এক অপূরণীয় ক্ষতি যা বাংলাদেশ আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।  ১৯৭১ সালের পূর্বে পৃথিবীতে এমন ঘটনা খুব কমই আছে, যেখানে মার্কিন মুল্লুকের এক বিখ্যাত সেতারবাদক বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করতে কনসার্টের আয়োজন করেছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ আর নিপীড়নের কথা ধীরে ধীরে জানতে শুরু করে সারাবিশ্ব। টানা ২৮ বছর পর সেই নির্যাতনের চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৭১-এ এসে। বিশ্ব সংবাদের শিরোনামে বারবার উঠে আসে বাংলাদেশের যুদ্ধাবস্থার অবর্ণনীয় এবং হৃদয়বিদারক তথ্য। বাঙালির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ওই অতর্কিত হামলা বহিঃর্বিশ্বের সঙ্গীতাঙ্গনের বহু শিল্পীদের মনকে আন্দোলিত করে। তাদের মধ্যে রবি শংকর, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, জোন বায়েজ, অ্যালেন গিন্সবার্গ, আন্দ্রে মালরো (বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক) অন্যতম। রবি শংকরের নাম ইতিহাস বারবার মনে করবে কারণ তিনি ম্যাডিসন স্কয়ারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কনসার্ট আয়োজনের মহান স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি ভারতের কিংবদন্তি সেতারবাদক, সুরকার এবং বিশ্বসংগীতের এক অনন্য পথিকৃৎ। 

 


বাকি অন্যতমদের মধ্যে জোয়ান বায়েজ অথবা জোন বায়েজ  (আমেরিকান উচ্চারণ অনুযায়ী জোন বায়েজ, এই নামেই এগোনো যাক) হচ্ছেন সংগ্রামী চেতনায় উদ্ভুদ্ধ এক মহীয়সী নারী; যেখানে অনিয়ম দেখেছেন সেখানে সোচ্চার হয়েছেন তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর নিয়ে। বায়েজ তখন যুক্তরাষ্ট্রে শান্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। গানে গানে ভাসিয়ে দিচ্ছেন যুদ্ধবিরোধী চেতনার। দাঁড়িয়ে গেছেন গণহত্যার বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতেও তিনি স্থির থাকেননি সেদিন। ধারণা করা হয় ১৯৭১ সালের জুন অথবা জুলাইতে ‘সং অব বাংলাদেশ’ গানটি লেখেন, পরবর্তীতে তা সারাবিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। 


সংগীত এমন একটি মাধ্যম যা মুমূর্ষু রোগিকেও জাগিয়ে দিতে পারে। আবার সংগীত ‘Music is the softest weapon and the strongest revolution’, কখনো ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি / মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি- গোবিন্দ হালদার রচিত এবং আপেল মাহমুদ সুরারোপিত—স্নায়ুতাড়িত এই গান বাঙালির রক্তে আগুন ঢেলে দেয়। সংগীতের ভেতর এত শক্তি লুকিয়ে থাকে যা অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মাতৃভূমির জন্য যে কাউকে সংগ্রামী করে তুলতে পারে।

 


১৯৮২ সালে এল সালভাদরের গৃহযুদ্ধ এবং বেসামরিক মানুষের হত্যাকা-ে আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ নোয়েল পল স্টুকি লেখেন—‘Peter, Paul and Mary’ গানটি। সম্প্রতি ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার ধ্বংসাত্মক আক্রমণের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনাকে ত্বরান্বিত করতে ফের সেই গান গাওয়া হয়। স্টেপান চারনেতস্কি রচিত ওই গানটি হচ্ছে ‘Oh, the Red Viburnum in the Meadow’; যুদ্ধবিরোধী এই গানটি লেখা হয় ১৯১৩ সালে। Viburnum হচ্ছে বেরি, অর্থাৎ জঙ্গলের মধ্যে লাল বেরি। চিলির স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লেখা হয় ‘El Pueblo Unido Jamás Será Vencido;’ বিপ্লবী এই গান শুধু চিলিতে নয়, গণ্ডি পেরিয়ে তা বিশ্বের বহু দেশের মানবাধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য গাওয়া হয়েছে। 


ব্রিটিশ মিউজিশিয়ান জেরি ডার্মাসের কথা মনে আছে? যার পুরো নাম জেরেমি ডেইভিড হাউনসেল ডার্মাস, যিনি অ্যাপারথাইড বিরোধী ‘ফ্রি নেলসন ম্যান্ডেলা’ গানটি লিখে সাড়া ফেলে দেন যা ম্যান্ডেলার মুক্তির জন্য একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। এরকম বহু গান যুদ্ধকে ঘৃণা করে রচিত হয়েছে; কখনো অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আবার কখনো মুক্তিকামী মানুষদেরকে জাগিয়ে তুলতে। যুদ্ধের ময়দানে নয় কিন্তু নাগরিক মঞ্চে হাজির হয়েছেন ভিনদেশি শিল্পীরা, বুদ্ধিজীবীরা এবং মানবাধিকারকর্মীরা। কারণ তাঁরা জানতেন এই সংহতি ঠিক ঠিক জাতির কাছে পৌঁছে যাবে, নির্যাতিত মানুষরা প্রাচীর ভেঙে গর্জে উঠবে। বায়েজরা সেই কাজটাই করেন সেদিন। আবেগের নির্জাস মিশিয়ে নির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের জন্য লেখেন ‘সং অব বাংলাদেশ’— 


‘Once again we stand aside
And watch the families crucified
See a teenage mother's vacant eyes
As she watches her feeble baby try
To fight the monsoon rains and the cholera flies


…………………………………………………

Bangladesh, Bangladesh
Bangladesh, Bangladesh’


ভাবার্থ করলে এমন দাঁড়ায়- তিনি আবার বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছেন, দেখছেন পরিবারের সবাইকে নির্বিকারে হত্যা করা হচ্ছে, কিশোরী মায়ের নিষ্পলক চাহনিতে রয়েছে তার ছোট্ট শিশুটি বর্ষা ঋতু আর কলেরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঁচার চেষ্টা। এভাবে যুদ্ধাক্রান্ত বাংলাদেশের অবিকল চিত্র ফুটে উঠেছে বায়েজের সুরের মাঝে। সংগীত মানুষের নিউরনকে নাড়িয়ে দিতে পারে কারণ সংগীতের রয়েছে অসম্ভব ক্ষমতা। বাংলাদেশের দূরবস্থার চিত্র যতটা না ইউরোপ আমেরিকাতে ছড়িয়েছে সে সময়, তার চেয়ে এ বায়েজের এই গান ধ্বনিত হয়েছে বহুগুণে। বায়েজ মনে করতেন একজন শিল্পী শুধু শ্রোতা দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়, অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করা তার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ভিয়েতনামের যুদ্ধের প্রতিবাদী আন্দোলনে সোচ্চার এই শিল্পী আলোচনায় আসেন ১৯৬৪ সালের দিকে। তিনি আমেরিকাতে জন্মগ্রহণ করে আমেরিকার যুদ্ধ বিরোধিতা করে বলেন ‘ভিয়েতনামের যুদ্ধ নৈতিকভাবে ভুল’। এই অনৈতিকতার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করার জন্য বিভিন্ন র‌্যালি, সমাবেশ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাষণ দিতে শুরু করেন। আমেরিকার সরকারকে নিজের আয়করের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে তোপের মুখে পড়তে হয়। যুদ্ধাহত ভিয়েতনামীদের জন্য খরচ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন Institute for the Study of Nonviolence যেখানে যুদ্ধবিরোধী সমর্থকদের মধ্যে আর সচেতনতা বাড়ানো হতো এবং কীভাবে ধ্বংসযজ্ঞের করুণ পরিণতি থেকে পৃথিবীকে বাঁচানো যায় সেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।


একটি প্রশ্ন উঠে আসে বারবার, কী দায় পড়েছিল বায়েজের! সত্যি সেদিন দায় পড়েছিল বায়েজের, এই দায় তার বিবেকের, তার চিন্তা চেতনার। রবিশংকর, ডিলান, গিন্সবার্গ, মালরোদের মতো অতি দায়িত্বশীল মানুষ যাদের সংখ্যা নিতান্তই কম তারাই পৃথিবীকে বদলে দেয়। তারা নিজের দেশের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে জানান দেয় তোমরা একা নও আমরা আছি তোমাদের পাশে। ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, আমেরিকার ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে, ১ আগস্ট ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এই কনসার্টের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন পণ্ডিত রবি শংকর। 


১৯৬৭ সালে অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার বছর চারেক আগে বায়েজ, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ড্রাফট রেজিষ্ট্রেশন অফিস অবরোধ করার কারণে গ্রেফতার হন। ড্রাফট রেজিষ্ট্রেশন অফিস হচ্ছে রিক্রুটমেন্ট সেন্টার যেখানে যুবকদের ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম তালিকাভুক্ত করা হতো। বায়েজ ওই অফিসের বিপরীতে অর্থাৎ অকল্যান্ড ইনডাকশন সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে তাকে আইনের আদালতে উঠতে হয়। ১৯৯১ সালে তিনি আবার গর্জে ওঠেন, মানবাধিকার সংগঠনের জন্য আয়োজিত বিভিন্ন বেনিফিট কনসার্টে অংশ নেন এবং তার সংগীতকে পুনরায় রাজনৈতিক প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি ও মধ্য-আমেরিকাসংক্রান্ত সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং এল সালভাদর, নিকারাগুয়া, ইরাক যুদ্ধের প্রস্তুতি— এ সব কিছুর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন।


‘সং অব বাংলাদেশ’ গানটির পেছনে যে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তা হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতা। যেখানে ব্যক্তি সংবেদনশীলতার চেয়ে বাংলাদেশের বেসামরিক মানুষের ওপর যে বর্বরতা তা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল সেদিন। ভয়াবহ সে যুদ্ধাহত বাংলাদেশ; ক্ষুধার্ত শরণার্থীদের আর্তনাদ, স্বজন হারাচ্ছে একের এক, মেয়েদেরকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে শ্লীলতা হরণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, শান্ত মস্তিষ্কে হত্যা করা হচ্ছে সংখ্যালঘুদেরকে। এসবের চিত্র ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকা, বৃটেনসহ সব সভ্য দেশগুলোতে। শুধু বায়েজ নয় বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও লেখক আন্দ্রে মালরো সেদিন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর এই ঘোষণা দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। মালরো সশস্ত্রভাবে অংশ নিতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু  সংহতি প্রকাশ করেছেন যা একটা যুদ্ধ আক্রান্ত দেশের জন্য অসামান্য ব্যাপার। ‘I could not remain silent when a nation was bleeding.’- একজন সংগীতশিল্পীর এমন উদার মহানুভবতা সত্যি যে কাউকে অবাক করে দিতে পারে। জোন বায়েজ ঠিক এই মনোভাবই ব্যক্ত করেন কোনো এক সাক্ষাৎকারে। 


জোন বায়েজ তার গানটিতে যে ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন, তা কেবল অন্তর্গত সংবেদনশীলতা নয়  নয় বরং একটি মানবিক আহ্বান। তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতাকে সামনে আনেন এমনভাবে, যেন শ্রোতারা নিজেদের চোখে যুদ্ধ-অপরাধের দৃশ্য দেখছেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুরতা তুলে ধরেছেন যেখানে মায়ের কোলে মৃত শিশু, ক্ষুধার্ত শরণার্থী, পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া  গ্রাম, রক্তাক্ত রাজপথ-সমস্ত কিছু যা গানের মাধ্যমে চিত্রায়িত হয়েছে। অন্যপ্রান্তে, ঠিক একই সময়ে ভিয়েতনামে চলছে নৃশংস যুদ্ধ। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনাম কর্তৃক দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী দখলের মাধ্যমে সাইগনের পতন ঘটে এবং ভিয়েতনাম একত্রিত হয়। যুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকার হস্তক্ষেপ এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, সেই যুদ্ধাহত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষদের আর্তনাদের চিত্র স্বচক্ষে দেখার জন্য ১৯৭২ সালে বায়েজ হ্যানয় শহরে উপস্থিত হন। হ্যানয় শহর জুড়েই ছিল মার্কিন সেনাদের বোমা বর্ষণের মূল লক্ষ্য। বলা হয়ে থাকে বিশ্বের ভারী বোমাদের মধ্যে এগুলো অন্যতম। হোটেলের আশ্রয়কেন্দ্রে বসে সেই ভারী বোমা বিষ্ফোরণের (খ্রিস্টমাস বোম্বিং) আওয়াজ শোনেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেসব আওয়াজ এবং মানুষের আর্তনাদ রেকর্ড করেন। আর এমন হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে লেখেন-

    
‘It’s walking to the battleground that always makes me cry
I’ve met so few folks in my time who weren’t afraid to die
But dawn bleeds with the people here and morning skies are red
As young girls load up bicycles with flowers for the dead
They say that the war is done
Where are you now, my son?’


জোন বায়েজ উপলব্ধি করেন একজন মায়ের সন্তানহীনতার করুণ আর্তনাদ। পৃথিবী এত নিষ্ঠুর হতে পারে, এত অমানবিক হতে পারে তা কল্পনাতীত। রক্তে রঞ্জিত হয় একদিকে ভিয়েতনাম অন্যদিকে বাংলাদেশ। নয় মাসের বীভৎস নারকীয় যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা লাখো বাঙালি মায়ের সন্তানদেও পরিকল্পিত ভাবে খুন করে। এবং নারীদের ওপর যে নির্মম অত্যাচার আর বর্বরতা চালায় সেসবের বিবরণ লিপিবদ্ধও আছে ইতিহাসের ভেতর। বায়েজের বাংলাদেশ ভ্রমণের কথা কোথাও পাওয়া যায় না। তবু এতটুকু অনুমান করা যায় যেভাবে ভিয়েতনামের যন্ত্রণায় দগ্ধ হন ঠিক পশ্চিম পাকিস্তানের নৃশংসতা দেখে বাঙালির জন্যও তাঁর মন কেঁদে ওঠে। আর এসবের প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর ‘সং অব বাংলদেশ’ গানের মধ্য দিয়ে। বায়েজের বয়স এখন (২০২৫ সাল পর্যন্ত) ৮৪ বছর, জন্মেছেন নিউইয়র্কে, ১৯৪১ সালে। একাধারে তিনি একজন গায়ক, গীতিকার, কবি এবং এক্টিভিস্ট। বায়েজ বহু বছর ধরে কবিতা লেখেন। তাঁর চারপাশে ঘটে যাওয়া যত অনিয়ম অনাচার তাঁর সামনে উঠে এসেছে তিনি তা নোটবুকে লিখে রেখেছেন। প্রকৃতি, শিল্প, জীবনের আবেগ এবং পরিবার-পরিজনের টুকরো কথাও যুক্ত হয়েছে তাঁর এই আত্মজীবনীমূলক কবিতাগ্রন্থে। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল, প্রকাশিত হয়েছে বায়েজের কবিতার বই ‘When You See My Mother, Ask Her To Dance’ যার মধ্য দিয়ে পৃথিবীবাসী জোন বায়েজকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে। 


 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow