সাভারে নতুন করে ফিরছে পুরোনো জঙ্গি তৎপরতা!
ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও আশুলিয়ায় গত দেড় মাসে একের পর এক বিস্ফোরণ, বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এসব ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত ১২ দিনের মধ্যে সাভার ও আশুলিয়ার পৃথক তিনটি এলাকা থেকে প্রেসার কুকার সদৃশ দুটি শক্তিশালী বোমা এবং অন্তত ১৪টি পাইপবোমা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব বোমার সঙ্গে বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে আশুলিয়ায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে এক যুবকের হাতের কবজি ও আঙুল উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি সমাবেশেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চারজন আহত হন। সাভারে বিস্ফোরক ও জঙ্গি তৎপরতার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত দুই দশকে এই এলাকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-জেএমবির সদস্য গ্রেফতার এবং বোমা বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর কাছের ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল, বিপুলসংখ্যক ভাসমান শ্রমিক এবং অপরিচিত মানুষের অস্থায়ী বসবাসের
ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও আশুলিয়ায় গত দেড় মাসে একের পর এক বিস্ফোরণ, বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এসব ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত ১২ দিনের মধ্যে সাভার ও আশুলিয়ার পৃথক তিনটি এলাকা থেকে প্রেসার কুকার সদৃশ দুটি শক্তিশালী বোমা এবং অন্তত ১৪টি পাইপবোমা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব বোমার সঙ্গে বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে আশুলিয়ায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে এক যুবকের হাতের কবজি ও আঙুল উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি সমাবেশেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চারজন আহত হন।
সাভারে বিস্ফোরক ও জঙ্গি তৎপরতার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত দুই দশকে এই এলাকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-জেএমবির সদস্য গ্রেফতার এবং বোমা বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর কাছের ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল, বিপুলসংখ্যক ভাসমান শ্রমিক এবং অপরিচিত মানুষের অস্থায়ী বসবাসের সুযোগের কারণে সাভার-আশুলিয়াকে অপরাধীরা সুবিধাজনক এলাকা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
১২ দিনে উদ্ধার ১৬ বোমা
সাভারে সর্বশেষ বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দিবাগত রাতে। সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের লালটেক গোপের বাড়ি এলাকায় জামিআ ইলমুল ইলাহ্ সোসাইটি মাদরাসা ও জামে মসজিদের সামনের জঙ্গল থেকে স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকার সদৃশ একটি বস্তু উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, রাতে তিনজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম সেখানে রেখে যান। পরে ড্রামের ভেতর থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারটি বের করে মসজিদের মাঠে রাখা হয় এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। সকালে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়। বুধবার বিকেলে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট এলাকাটি জনশূন্য করে বোমাটি নিয়ন্ত্রিতভাবে নিষ্ক্রিয় করে।
পুলিশ বলছে, বস্তুটি একটি শক্তিশালী বোমা ছিল। সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দ হয় এবং আকাশের দিকে সাদা ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরেও ওই শব্দ শোনা যায়।
এর আগে একই রাতে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের শ্যামপুর এলাকায় একটি বাড়ি থেকে নয়টি পাইপবোমা, বিপুল পরিমাণ গানপাউডার ও বিস্ফোরক তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, হেমায়েতপুর এলাকা থেকে আরিফ হোসেন নামের ২৮ বছর বয়সি একজনকে পাঁচটি পাইপবোমাসহ আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও নয়টি পাইপবোমা উদ্ধার করা হয়।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম বলেন, রাত সাড়ে তিনটার দিকে অভিযান শেষ হয়। সব মিলিয়ে ১৪টি পাইপবোমা এবং বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, যে বাড়ি থেকে এসব সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি এক ব্যক্তি ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে আসার কথা বললেও পরে একাই সেখানে ছিলেন এবং বর্তমানে পলাতক।
ওসি বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশের পাশাপাশি অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটও কাজ করছে।
আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার বোমা
এর আগে গত ৩০ জুলাই মধ্যরাতে আশুলিয়ার চারাবাগ খেজুর বাগান এলাকায় একটি ট্রাভেল ব্যাগ থেকে প্রেসার কুকার সদৃশ আরেকটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করা হয়। জয়ী জেনারেল স্টোরের সামনে ব্যাগটি পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন।
পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটি একটি খোলা মাঠে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় করেন।
পুলিশ জানায়, কে বা কারা সেটি সেখানে রেখে গেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ওই ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে কাজ চলছে। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে বোমাসহ যে ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার সঙ্গে আশুলিয়ার ঘটনার কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ককটেল বিস্ফোরণ, সমাবেশেও বিস্ফোরণ
এর কয়েক দিন আগে ১১ জুলাই আশুলিয়ার ভাদাইল পাবনারটেক পশ্চিমপাড়া এলাকায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে রনি নামের ২০ বছর বয়সি এক যুবক গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাম হাতের কবজিসহ চারটি আঙুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
আশুলিয়া থানার পুলিশ জানায়, রনি ওই ঘরে একা ছিলেন। ককটেল তৈরির চেষ্টা করার সময় সেটি বিস্ফোরিত হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সদস্যরাও গিয়েছিলেন।
ওই ঘটনায়ও মামলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এর সঙ্গে জড়িত অন্য কারো বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানাতে পারেনি পুলিশ।
এর আগে গত ৬ জুলাই সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির জুলাই পদযাত্রা শেষে আয়োজিত সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
রাত পৌনে ১০টার দিকে তারাপুর ঈদগাহ মাঠে নাবিলা তাসনিদের বক্তব্য চলার সময় মঞ্চের সামনের দিকে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। এতে অন্তত চারজন আহত হন। তাদের সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর এনসিপির নেতা-কর্মীরা সাভার মডেল থানার সামনে বিক্ষোভ করেন। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ ঘটনায় প্রশাসনের অসহায়তার অভিযোগ করেন।
পুলিশ ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার কথা জানায়। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করার কথাও বলা হয়েছিল। পরে ওই ঘটনায় করা মামলায় জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
তবে সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধার, ককটেল বিস্ফোরণ ও রাজনৈতিক সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র পাওয়া গেছে কি না, পুলিশ এখনো তা জানায়নি।
পুলিশের তদন্ত কতদূর?
এক মাসের ব্যবধানে কখনো বিস্ফোরণ ঘটেছে, কখনো বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে। সর্বশেষ একটি বাড়ি থেকে একসঙ্গে নয়টি পাইপবোমা উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে সাভার-আশুলিয়ায় এসব বিস্ফোরক কীভাবে আসছে এবং কারা এগুলো তৈরি বা মজুত করছে?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি ও তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। আশুলিয়ার ৩০ জুলাইয়ের প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনাতেও মামলা হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনায় এখনো নির্দিষ্ট কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কে বা কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ১১ আগস্টের প্রেসার কুকার সদৃশ বোমা উদ্ধার, একই রাতে ১৪টি পাইপবোমা উদ্ধার এবং ৬ জুলাই এনসিপির সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো সাভার মডেল থানার আওতাধীন এলাকায় ঘটেছে।
সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম বলেন, ১১ আগস্টের ঘটনায় মামলা হয়েছে। যে বাড়ি থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে, সেটির ভাড়াটে পলাতক। বিষয়টি নিয়ে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট কাজ করছে এবং তাদের অগ্রগতিও রয়েছে।
তবে এনসিপির সমাবেশে বিস্ফোরণের মামলা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তিনি দিতে পারেননি। তিনি বলেন, তিনি সম্প্রতি থানায় যোগ দিয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন।
‘দুটি বড় বোমা তৈরি হয়েছিল’
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলছেন, সাভার এলাকায় জঙ্গিদের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের আগে থেকেই কিছু তথ্য ছিল।
তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জে একটি মাদরাসার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কেউ কেউ সেখান থেকে এসে সাভার এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। ওই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কাজ করছিল।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তাদের কাছে তথ্য আসে যে এলাকায় দুটি বড় ও ধ্বংসাত্মক বোমা তৈরি করা হয়েছে। পরে দুটি বোমাই উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
শামীমা পারভীন বলেন, এসবের পাশাপাশি গত মঙ্গলবার বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়ে বোমা তৈরির অনেক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেগুলো সাভারেই ধ্বংস করা হয়েছে।
তার দাবি, কোনো অঘটন ছাড়াই এসব উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
কেন সাভার?
পুলিশ সুপারের মতে, সাভারের ঘনবসতি ও বিপুলসংখ্যক ভাসমান শ্রমিকের উপস্থিতি অপরাধীদের সুযোগ করে দিতে পারে।
তিনি বলেন, গ্রামের মানুষ সাধারণত একে অপরকে চেনেন। কিন্তু সাভারে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসেন। তাদের অনেকে অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এই পরিস্থিতিকে অপরাধীরা কাজে লাগাতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ডিএসবি ও ডিবিকে দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। পাশাপাশি টহল বাড়ানো হয়েছে এবং রাস্তায় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, উদ্ধার করা বোমাগুলো ছড়িয়ে না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এলাকায় আরও বোমা থাকতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
শ্রমিকেরা যেসব এলাকায় থাকেন, সেখানে ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাই এবং টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জনগণের সহযোগিতা চায় পুলিশ
পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন সন্দেহজনক কিছু দেখলে পুলিশকে জানানোর জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সাভারে পুলিশের সংখ্যা প্রায় ৪০০, বিপরীতে জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাই জনগণের সহযোগিতা ছাড়া পুলিশের একার পক্ষে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়।
তার ভাষ্য, বিভিন্ন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সঙ্গে পুলিশ নিয়মিত বসছে এবং তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মনে করেন, এসব উদ্যোগের ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে এবং তাঁরা তথ্য দিচ্ছেন।
‘অপরাধীদের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে অপরাধীদের একধরনের আশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে অল্প টাকায় থাকা যায়। আবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যদের সঙ্গেও মিশে থাকা সম্ভব। ফলে এসব এলাকায় বোমা বা ককটেল তৈরির মতো কাজও তুলনামূলকভাবে আড়ালে করা যায়।
তার মতে, অন্য এলাকা থেকেও অপরাধীদের এনে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময় এসব এলাকায় রাখা হতে পারে।
তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের কাছে বিষয়টি অজানা নয়। তবে ঢাকার আশপাশের এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা এবং পুলিশের সোর্স নেটওয়ার্ক আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন।
তার মতে, পুলিশের সোর্স নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে এ ধরনের অপরাধীরা সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঢাকার আশপাশের কোনো এলাকা বেছে নেয়।
তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বাড়ির মালিকদেরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে।
বাড়ির মালিকদের ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র সংরক্ষণ এবং বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়ার চুক্তির একটি কপি থানায় জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে অপরাধীদের গোপনে বসবাসের সুযোগ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
নাশকতার ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শাস্তি দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সতর্ক করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যেন রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতের কাউকে হয়রানি, হামলা বা মামলার শিকার হতে না হয়।
তার মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বোমা তৈরির উপাদান নিয়ে উদ্বেগ
প্রেসার কুকার বোমা তৈরির উপাদান সম্পর্কেও কথা বলেছেন ড. তৌহিদুল হক।
তিনি বলেন, এ ধরনের কিছু উপাদান বাইরে থেকে আনতে হয়। আবার কিছু উপাদান বাংলাদেশেও পাওয়া যায়। বাইরে থেকে আনা এবং স্থানীয়ভাবে পাওয়া বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে বিস্ফোরক তৈরি করা হতে পারে।
তার মতে, বাইরে থেকে আসা এসব উপাদানের কেনাবেচার ক্ষেত্রেও নজরদারি প্রয়োজন।
যারা এসব পণ্য বিক্রি করেন, তারা কার কাছে বিক্রি করছেন, কে কিনছেন এবং কী উদ্দেশ্যে কিনছেন- এসবের রেকর্ড রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ক্রেতার মোবাইল নম্বর ও দোকানের ঠিকানা সংরক্ষণ করা গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য পরে সেগুলো অনুসরণ করে নজরদারি করা সহজ হতে পারে।
তবে বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কঠিন বলেও মনে করেন তিনি। কারণ দোকানের বাইরে বিভিন্নভাবে এসব উপাদান কেনাবেচা হতে পারে।
তার মতে, তারপরও চাইলে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, বোমা বা বোমা তৈরির উপাদান উদ্ধারের ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিশেষ করে যেসব বিষয় আগে সাধারণ মানুষের জানার বাইরে ছিল, সেগুলো প্রকাশ্যে আসায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার কোনো পরিকল্পনা বা অপতৎপরতা আছে কি না, সে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, সতর্কতা বাড়ানো এবং আইনগত ব্যবস্থা সক্রিয় করার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সাভারে জঙ্গি তৎপরতার পুরোনো ইতিহাস
সাভারে সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনা নতুন হলেও এলাকায় জঙ্গি তৎপরতার ইতিহাস দীর্ঘ। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা।
ওই দিন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় একযোগে প্রায় ৪৫৯টি টাইম বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে আধা ঘণ্টাজুড়ে এসব বিস্ফোরণ ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক মানুষ আহত হন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে একজন নিহত হন। সাভারেও সেদিন ছয়টি বোমা বিস্ফোরিত হয়।
বিকেল তিনটার দিকে বাড়ির সামনে একটি বোমা বিস্ফোরণে ১০ বছরের শিশু আবদুস সালাম গুরুতর আহত হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তিন বছর বয়সি আরেক শিশু অনিকও ওই ঘটনায় আহত হয়। এ ঘটনায় সাভার পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছিল।
ওই দিনের সিরিজ হামলার দায় পরে জেএমবি লিফলেটের মাধ্যমে স্বীকার করে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আদালত ও জনসমাগমস্থলের কাছাকাছি বোমাগুলো রাখা হয়েছিল।
এর পাঁচ বছর পর, ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর ভোরে সাভারের বলিয়ারপুর এলাকা থেকে জেএমবির ঢাকা বিভাগের প্রধানসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে র্যাব।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা ছিলেন শরিফুল ইসলাম লিকন ওরফে রানা, জেএমবির এহসার সদস্য শাহিনুল ইসলাম এবং গায়েরি এহসার সদস্য চেইনুর রহমান।
র্যাবের তৎকালীন ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের কাছ থেকে আটটি পেট্রলবোমা, বোমা তৈরির দেড় কেজি উপকরণ, দুটি পরিচয়পত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছিল।
র্যাব জানিয়েছিল, কয়েক মাস আগে জেএমবির ঢাকা বিভাগের প্রধান সাইদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর শরিফুল ওই দায়িত্ব নেন। এর আগে ২০০৪ সালে তিনি জেএমবির জয়পুরহাট জেলা প্রধান ছিলেন।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, শরিফুল রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করছিলেন।
পেশায় মোটর মেকানিক শরিফুল বোমায় ব্যবহৃত সার্কিট তৈরি করতেন এবং বোমা তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করতেন বলেও জানিয়েছিল র্যাব।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শরিফুল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জয়পুরহাটে সিরিজ বোমা হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে তখন র্যাব জানিয়েছিল।
২০১৭ সালেও জেএমবি সদস্য গ্রেফতার
এর সাত বছর পর, ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল সাভার থেকে জেএমবির সরওয়ার-তামিম গ্রুপের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- তামিম দাড়ি, কামরুল হাসান ও মো. মোস্তফা মজুমদার। তাদের কাছ থেকে ধারালো অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র, প্লাস্টিক বিস্ফোরক, পাঁচটি গুলি এবং বোমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল র্যাব।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার তামিম ধর্মান্তরিত হয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়েছিল।
ওই একই বছরের ১৬ জুলাই সাভারের আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাবাড়ি এলাকায় ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে একটি বাড়ি ঘিরে রাখার পর নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন সারোয়ার-তামিম গ্রুপের চার সদস্য মোজাম্মেল, ওরফানুল, আলমগীর ও রাশেদুল নবী আত্মসমর্পণ করেন।
র্যাব জানিয়েছিল, পোশাকশ্রমিক পরিচয়ে এক মাস আগে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন তারা। বাড়ির মালিকের সন্দেহ হলে র্যাবকে জানানো হয়। তারা বাড়িটি ঘিরে ফেললে ভেতর থেকে গুলি ছোড়া হলে পাল্টা গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আত্মসমর্পণের পর র্যাব জানায়, বাড়িটিতে আইইডি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।
এফএ/এএসএম
What's Your Reaction?



