সৌর বিদ্যুতে নেট মিটারিং কী, কতটা লাভবান হবেন গ্রাহক

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পৃক্ত করতে নেট মিটারিং কার্যকর একটি পদ্ধতি। নেট মিটারিং কী নেট মিটারিং হলো এমন একটি বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থা, যেখানে কোনো গ্রাহক নিজের বাসা, শিল্পকারখানা বা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহার হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হলে সেটি বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, দিনে সৌর প্যানেল থেকে অতিরিক্ত যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তা গ্রিডে জমা থাকে এবং রাতে বা প্রয়োজনের সময় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে সেই ইউনিট সমন্বয় করা হয়। ফলে গ্রাহকের মোট বিদ্যুৎ বিল কমে আসে। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার নীতিমালা চালু করেছে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এবং বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগু

সৌর বিদ্যুতে নেট মিটারিং কী, কতটা লাভবান হবেন গ্রাহক

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পৃক্ত করতে নেট মিটারিং কার্যকর একটি পদ্ধতি।

নেট মিটারিং কী

নেট মিটারিং হলো এমন একটি বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থা, যেখানে কোনো গ্রাহক নিজের বাসা, শিল্পকারখানা বা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহার হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হলে সেটি বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

সহজভাবে বলতে গেলে, দিনে সৌর প্যানেল থেকে অতিরিক্ত যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তা গ্রিডে জমা থাকে এবং রাতে বা প্রয়োজনের সময় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে সেই ইউনিট সমন্বয় করা হয়। ফলে গ্রাহকের মোট বিদ্যুৎ বিল কমে আসে।

বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার নীতিমালা চালু করেছে

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এবং বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে এর আওতা বাড়াচ্ছে।

যেভাবে কাজ করে

নেট মিটারিং ব্যবস্থায় একটি বিশেষ ধরনের দ্বিমুখী (বাই-ডাইরেকশনাল) মিটার ব্যবহার করা হয়। এই মিটার গ্রিড থেকে কত ইউনিট বিদ্যুৎ নেওয়া হয়েছে এবং গ্রিডে কত ইউনিট সরবরাহ করা হয়েছে, দুই দিকের হিসাব রাখে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো কারখানায় দিনে ১,০০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো এবং ব্যবহার হলো ৭০০ ইউনিট। অতিরিক্ত ৩০০ ইউনিট জাতীয় গ্রিডে চলে যাবে। পরে গ্রাহক যখন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেবেন, তখন সেই অতিরিক্ত ইউনিট বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

নেট মিটারিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা

নেট মিটারিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যয় কমে যাওয়া। শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও বড় আবাসিক স্থাপনাগুলো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে মাসিক বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমায়

গ্রীষ্মকালে দিনে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। একই সময়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনও বেশি হয়। ফলে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে লোডশেডিং ও বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করে।

জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমায়

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে।

পরিবেশ দূষণ কমায়

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ নেই। ফলে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে পরিবেশ দূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা বাড়ায়

বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক ক্রেতা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ে।

বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থা

দেশে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে ধীরে ধীরে নেট মিটারিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত ছাদ রয়েছে। এসব ছাদ ব্যবহার করে কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো সচেতনতার অভাব, প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় এবং কিছু প্রশাসনিক জটিলতা এ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নেট মিটারিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা সহজ শর্তে ঋণ, কর সুবিধা এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাদের মতে, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সারাবিশ্ব এখন সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুকছে। এটি ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। বরং বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের পাশ্ববর্তী ভারত-পাকিস্তান নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অনেক ভালো করছে। বাংলাদেশে এই খাত প্রসারে অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। সেসব চ্যালেঞ্জ পার করে এই খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এ লক্ষ্য অর্জনে নেট মিটারিং একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সঠিক নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে দেশের শহর ও শিল্পাঞ্চলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক বিস্তার ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নেট মিটারিং শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উপায় নয়, বরং এটি ভোক্তাকে ‌‘প্রসিউমার’ বা একই সঙ্গে উৎপাদক ও ব্যবহারকারীতে পরিণত করার একটি আধুনিক ব্যবস্থা।

এনএস/এমআইএইচএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow