৬৫ লাখ টাকার সড়ক টিকলো এক সপ্তাহ

মাত্র এক সপ্তাহ আগে শেষ হয়েছে কার্পেটিং। অথচ এরই মধ্যে হাত দিয়ে টানলেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ, পা দিয়ে সামান্য ঘষলেই ঝরে পড়ছে বিটুমিন ও পাথরের খোয়া। সড়কটি বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের মানিকচক বাজার থেকে কুটুরবাড়ী পর্যন্ত। ৬৫ লাখ টাকার কাজটি টেন্ডার পাওয়া ঠিকাদারের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাবতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হেলাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাদা ও ধুলাবালির ওপর নামমাত্র বিটুমিন স্প্রে করে তড়িঘড়ি করে কার্পেটিং করায় এক সপ্তাহও টেকেনি সড়কটি। একই সঙ্গে নিম্নমানের নির্মাণ, প্রাক্কলনের শর্ত লঙ্ঘন এবং এলজিইডির তদারকির ব্যর্থতার অভিযোগও উঠেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে কার্পেটিংয়ের আস্তরণ আলগা হয়ে গেছে। কোথাও হাত দিয়ে টান দিলেই পিচ উঠে আসছে। আবার কোথাও ছড়িয়ে রয়েছে পাথরের খোয়া। কয়েকটি স্থানে বিটুমিনের স্তর উঠে নিচের মাটি দৃশ্যমান হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নতুন রাস্তার এমন চিত্র তারা আগে কখনো দেখেননি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু নিম্নমানের নির্মাণই নয়, কাজ বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াতেই ছিল নানা অনিয়ম। প্রাক্কলনের শর্ত না মেনে কাজ

৬৫ লাখ টাকার সড়ক টিকলো এক সপ্তাহ

মাত্র এক সপ্তাহ আগে শেষ হয়েছে কার্পেটিং। অথচ এরই মধ্যে হাত দিয়ে টানলেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ, পা দিয়ে সামান্য ঘষলেই ঝরে পড়ছে বিটুমিন ও পাথরের খোয়া। সড়কটি বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের মানিকচক বাজার থেকে কুটুরবাড়ী পর্যন্ত। ৬৫ লাখ টাকার কাজটি টেন্ডার পাওয়া ঠিকাদারের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাবতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হেলাল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাদা ও ধুলাবালির ওপর নামমাত্র বিটুমিন স্প্রে করে তড়িঘড়ি করে কার্পেটিং করায় এক সপ্তাহও টেকেনি সড়কটি। একই সঙ্গে নিম্নমানের নির্মাণ, প্রাক্কলনের শর্ত লঙ্ঘন এবং এলজিইডির তদারকির ব্যর্থতার অভিযোগও উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে কার্পেটিংয়ের আস্তরণ আলগা হয়ে গেছে। কোথাও হাত দিয়ে টান দিলেই পিচ উঠে আসছে। আবার কোথাও ছড়িয়ে রয়েছে পাথরের খোয়া। কয়েকটি স্থানে বিটুমিনের স্তর উঠে নিচের মাটি দৃশ্যমান হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নতুন রাস্তার এমন চিত্র তারা আগে কখনো দেখেননি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু নিম্নমানের নির্মাণই নয়, কাজ বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াতেই ছিল নানা অনিয়ম। প্রাক্কলনের শর্ত না মেনে কাজ করা, টেন্ডার পাওয়া প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা এবং এলজিইডির তদারকির দুর্বলতার অভিযোগও তুলেছেন তারা।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বগুড়া কার্যালয়ের কার্যাদেশ ও প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, রাজশাহী বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মানিকচক বাজার থেকে কুটুরবাড়ী পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৬৯ লাখ ৮ হাজার ৪৫৬ টাকা। পরে দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নন্দীগ্রাম পৌরসভার দামগাড়া এলাকার আল মোমিনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স অঙ্কন এন্টারপ্রাইজ ৬৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি পায়।

কার্যাদেশ অনুযায়ী, কাজটি ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ১৪ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখার পর সরকারি অর্থবছর শেষ হওয়ার ঠিক আগে, বর্ষার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে কার্পেটিং করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জুন ক্লোজিংয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে কাজের মানের চেয়ে বিল উত্তোলনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলনে ডব্লিউবিএম (ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম) বেসের ওপর প্রতি বর্গমিটারে ১ দশমিক ২ লিটার প্রাইম কোট, নির্ধারিত পরিমাণ ট্যাক কোট এবং পরে ১৪০ থেকে ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বিটুমিনের সঙ্গে পাথরের কুচি, বালু ও স্টোন ডাস্ট মিশিয়ে ২৫ মিলিমিটার পুরু প্রিমিক্সড বিটুমিনাস কার্পেটিং করার নির্দেশনা রয়েছে। শুধু কার্পেটিং কাজের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ লাখ ২৭ হাজার ৩৪৯ টাকা। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কারিগরি শর্তের বেশিরভাগই মানা হয়নি।

রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোখলেছুর রহমান বলেন, ডব্লিউবিএম করার পর প্রায় দুই মাস রাস্তা ফেলে রাখা হয়। এসময় ধুলাবালি, ময়লা ও কাদা জমে যায়। নিয়ম অনুযায়ী কার্পেটিংয়ের আগে পুরো রাস্তা পরিষ্কার করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। কাদার ওপরই বিটুমিন স্প্রে করা হয়েছে। তাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে পাথরের খোয়া ঠিকভাবে বসেনি। কার্পেটিংয়ের মিশ্রণ অনেক দূর থেকে ট্রাকে আনা হয়েছিল। আসতে আসতে তা ঠান্ডা হয়ে যায়। এসব নিয়ে আপত্তি করলে ঠিকাদারের লোকজন আমাকে বলে, এখানে কথা হবে না, উপজেলায় আসেন।

৬৫ লাখ টাকার সড়ক টিকলো এক সপ্তাহ

স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, সাত দিনও হয়নি, রাস্তা নষ্ট হতে শুরু করেছে। দেখে মনে হচ্ছে কয়েক বছরের পুরোনো রাস্তা।

রিকশাচালক মকসেদ আলী বলেন, কুটুরবাড়ী সাত্তুর মোড় থেকে বুড়িতলা পর্যন্ত অনেক জায়গায় একই অবস্থা। খালি পায়ে হাঁটলে পাথর পায়ে বিঁধছে। যদি এক সপ্তাহেই এমন হয়, তাহলে কয়েক মাস পর কী হবে?

আব্দুল মালেক নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, অনেক বছর পর একটা ভালো রাস্তা পাবো বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সব শেষ। আমরা টেকসই রাস্তা চাই, লোক দেখানো উন্নয়ন নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী বলেন, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর কয়েকজন এসে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। বলা হয়েছে, বেশি কথা বললে পরে দেখে নেওয়া হবে।

এদিকে অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। কার্যাদেশে ঠিকাদার হিসেবে মেসার্স অঙ্কন এন্টারপ্রাইজের নাম থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি নিজে কাজ করেনি।

প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আল মোমিন জাগো নিউজকে বলেন, তিনি কাজটি অন্যের কাছে কমিশনে বিক্রি করেছেন। তার ভাষ্য, বগুড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাবতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হেলাল কাজটি কিনে নিয়েছেন।

তবে জাহিদুল ইসলাম হেলাল বলেন, কাজটি তিনিও নিজে করেননি। তার শ্যালক মোনারুল ইসলাম টুটুল কাজটি পরিচালনা করেছেন। যদিও স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, কাজ চলাকালে হেলালের প্রতিনিধিরাই পুরো প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাকেও কয়েক দফা নির্মাণস্থলে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে বগুড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাবতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হেলাল বলেন, কাজের সময় এলজিইডির কর্মকর্তারা নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন। কার্পেটিংয়ের সময় এলজিইডির দুজন কার্যসহকারী, দুজন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং উপজেলা প্রকৌশলীসহ পাঁচজন কর্মকর্তা সাইটে ছিলেন। তাদের সামনেই কাজ হয়েছে। কার্পেটিংয়ের মিশ্রণ ডাম্পট্রাকে আনা হয়েছিল। সেটি ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ নেই। কাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই টানা বৃষ্টি হয়েছে। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কয়েকটি স্থানে খুঁচিয়ে কার্পেটিং তুলে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। আবহাওয়া ভালো হলে বিটুমিন গরম করে রোলার চালিয়ে প্রয়োজনীয় মেরামত করা হবে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, শুধু কার্পেটিং নয়, পুরো প্রকল্পে বক্স কাটিং, বালু ভরাট, সাব-বেস, ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম (ডব্লিউবিএম) বেস কোর্স এবং তিনটি ইউ-ড্রেন নির্মাণের কাজ রয়েছে। সব মিলিয়ে মূল সড়কের কাজের মূল্য প্রায় ৬৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এছাড়া প্রকল্প এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ৪ হাজার ৭১৭টি প্রথম শ্রেণির ইটের (সলভেজ মেটেরিয়াল) সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার ৯৩০ টাকা।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ কার্পেটিংয়েই মান রক্ষা করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া সদর উপজেলা প্রকৌশলী মোবারক হোসেন বলেন, সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে এলজিইডি কার্পেটিংয়ের কাজ করে না। তবে এবার জুনের শেষ দিকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ঠিকাদারকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্পেটিংয়ের পরদিন থেকেই টানা বৃষ্টি শুরু হয়। দুই পাশে গাছপালা থাকায় রাস্তাটি দ্রুত শুকাতে পারেনি।

৬৫ লাখ টাকার সড়ক টিকলো এক সপ্তাহ

তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং কাজে ত্রুটির বিষয়টি ধরা পড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে ঠিকাদারকে নিজস্ব খরচে ত্রুটিপূর্ণ অংশ ঠিক করতে হবে।

তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বৃষ্টির পর কিছু ব্যক্তি শাবল ও কোদাল দিয়ে রাস্তার কয়েকটি অংশ খুঁচিয়ে তুলেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত অভিযোগ বা আলাদা প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি।

এদিকে প্রকল্পটির সময় নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল ১৪ জুন। কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ ঝুলে থাকার পর সরকারি অর্থবছরের শেষ দিকে বর্ষার মধ্যে কার্পেটিং সম্পন্ন করা হয়। নির্মাণসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিটুমিনভিত্তিক কার্পেটিংয়ের জন্য শুষ্ক আবহাওয়া সবচেয়ে উপযোগী। টানা বৃষ্টির মধ্যে এমন কাজ করলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক রেজা বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগের পর আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রকৌশলীকে জানানো হয়েছে। ঠিকাদার আবহাওয়া ভালো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে স্থানীয়দের দাবি, আংশিক মেরামত নয়, পুরো কার্পেটিং তুলে প্রাক্কলন অনুযায়ী নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। তাদের অভিযোগ, কাদার ওপর দেওয়া নিম্নমানের কার্পেটিংয়ের ওপর আবার বিটুমিন ছড়িয়ে দিলে কয়েক মাসের মধ্যেই একই সমস্যা দেখা দেবে।

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, সরকারি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে প্রকল্প শেষ করার চাপ অনেক সময় কাজের গুণগত মানের ওপর প্রভাব ফেলে। বর্ষার মধ্যে বিটুমিনভিত্তিক কার্পেটিং করা ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রকল্পে যদি প্রাক্কলনের শর্ত ভঙ্গ হয়ে থাকে, তাহলে শুধু সংস্কার নয়, পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শুধু ত্রুটিপূর্ণ অংশ মেরামত করলেই হবে না। টেন্ডার পাওয়া প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে কীভাবে অন্য ব্যক্তি কাজ করলেন, মাঠপর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কী ভূমিকা রেখেছেন এবং নির্মাণকাজে প্রাক্কলনের শর্ত মানা হয়েছে কি না এসব বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow