এসএসসির ফল প্রকাশে দেরি কেন, বিপর্যয় নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি?

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় গত ২০ মে। নিয়মানুযায়ী, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা। সে হিসাবে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এবার ফল প্রকাশ করতে পারেনি শিক্ষা বোর্ড। এতে একদিকে ফল পেতে সাড়ে ১৮ লাখ পরীক্ষার্থীর অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে ফলাফল নিয়ে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ফল বিপর্যয় ঘটেছে— এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণেই ফল প্রকাশে দেরি হচ্ছে বলেও গুঞ্জন উঠেছে। গুঞ্জন ও গুজবে উদ্বিগ্ন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ করতে না পারাকে ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফল প্রকাশে এমন বিলম্বের কারণে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এমনকি ফল প্রকাশের পরও তা নিয়ে তাদের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরও পড়ুন এইচএসসি পরীক্ষা বর্ষাকালে কেন, সৃষ্ট সংকটের দায় কার? শিক্ষা বোর্ড বলছে, ফল বিপর্যয় কিংবা এ নিয়ে সামাজিক য

এসএসসির ফল প্রকাশে দেরি কেন, বিপর্যয় নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি?

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় গত ২০ মে। নিয়মানুযায়ী, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা। সে হিসাবে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এবার ফল প্রকাশ করতে পারেনি শিক্ষা বোর্ড।

এতে একদিকে ফল পেতে সাড়ে ১৮ লাখ পরীক্ষার্থীর অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে ফলাফল নিয়ে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ফল বিপর্যয় ঘটেছে— এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণেই ফল প্রকাশে দেরি হচ্ছে বলেও গুঞ্জন উঠেছে।

গুঞ্জন ও গুজবে উদ্বিগ্ন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ করতে না পারাকে ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফল প্রকাশে এমন বিলম্বের কারণে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এমনকি ফল প্রকাশের পরও তা নিয়ে তাদের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষা বোর্ড বলছে, ফল বিপর্যয় কিংবা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অন্যান্য তথ্য শতভাগ গুজব। কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস বা ফেল করেছে, সে তথ্য জানার মতো ফলাফল এখনো প্রস্তুত হয়নি। কর্মকর্তাদের দাবি, প্রস্তুতির কাজ শেষ না হওয়ায় এত দেরি।

ফল ‌‌বিপর্যয়ের গুঞ্জন, বাড়ছে উদ্বেগ

শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে। গত ১১ জুলাইও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জাগো নিউজকে বলেছিলেন, ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রকাশে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বললেই তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

কিন্তু ১৮ জুলাই বোর্ড চেয়ারম্যান জাগো নিউজকে বলেন, ২০ জুলাই ফল প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের ফল এখনো প্রস্তুত হয়নি। কবে প্রকাশ করা হবে, সেদিন তাও জানাতে পারেননি তিনি।

পূর্বঘোষিত ২০ জুলাই ফল প্রকাশ না করার পর থেকেই পরীক্ষার্থী-অভিভাবকদের মনে নানান প্রশ্ন। সন্দেহ-সংশয় দানা বাঁধতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ছড়ানো হয় যে, এবার এসএসসির ফল খুব খারাপ হয়েছে, সেজন্য প্রকাশ করতে সময় নিচ্ছে বোর্ড। কোথাও কোথাও লেখা হয়, পাসের হার বাড়াতে সময় নিচ্ছে শিক্ষা বোর্ড।

অবশ্য শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ ধরনের তথ্যকে ‘শতভাগ গুজব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে বোর্ডের মধ্যম সারির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্যও পাওয়া গেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) জাগো নিউজকে বলেন, খাতা মূল্যায়ন শেষ। নম্বর সফটওয়্যারেও দেওয়ার কাজও শেষ। তাহলে ফল প্রকাশে দেরি কেন হচ্ছে, সেটা তো বড় প্রশ্ন। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।

কারণ কী এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন রকম কারণ থাকতে পারে। যে ফল এসেছে, সেটা হয়তো মন্ত্রণালয় বা সরকারের পছন্দ নয়। হয়তো এটা খুব খারাপ বা খুব ভালো মনে করছেন তারা। যে কোনোটাই হতে পারে। আমি তো সেটা বলতে পারবো না।’

বোর্ডের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যারদের কাছে শুনেছি, পাস-ফেল নিয়ে কিছু ঝামেলা আছে। কীভাবে ছাড়লে (প্রকাশ করলে) এটা সঠিক বা বস্তুনিষ্ঠ হবে, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। ওপর থেকে অনুমতি না দিলে তো বোর্ড রেজাল্ট ছাড়তে পারে না। যে রেজাল্ট তাতে হয়তো শিক্ষামন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এর বেশি তো বলা যাবে না।’

তবে ফল বিপর্যয়ের তথ্যটি শতভাগ গুজব ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।

আজ দুপুরে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা (ফল বিপর্যয়) শতভাগ গুজব। আমি দায়িত্বে আছি, বোর্ড চেয়ারম্যান, তারপরও এখনো বলতে পারি না যে কেমন ফল হয়েছে বা হতে পারে। সে সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার মতো গড় ফল এখনো প্রস্তুত হয়নি। সেজন্য বলবো- যা ছড়াচ্ছে, তা শতভাগ গুজব। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।’

ফল বিপর্যয়ের তথ্য শতভাগ গুজব। গড় ফল এখনো প্রস্তুত হয়নি, তাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।— ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান

প্রস্তুতির ঘাটতি কেন, দায় কার

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের দাবি নির্ধারিত সময়ে ফল প্রস্তুত করা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে ফল প্রকাশে দেরি হয়, তাতে দায় কার? কেন এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তারা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক একজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘খাতা মূল্যায়ন শেষে বোর্ডে ফিরে এলে নম্বর ইনপুটের কাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষে সফটওয়্যারে ইনপুট দিয়ে ফল তৈরি করা হয়। এ কাজে এত সময় লাগার কথা নয়। তারপরও কেন ফল প্রস্তুতের কাজ শেষ হচ্ছে না বা হয়নি, তা বোধগম্যও নয়।’

শিক্ষা বোর্ড অবশ্য কিছু কারণ দেখিয়েছে। তাদের দাবি, এবার খাতা গ্রহণে শিক্ষকদের কিছুটা অনীহা দেখা যায়। এতে খাতা বোর্ড থেকে নিয়ে যেতে দেরি হয়। এ কারণে তারা জমা দিতেও কেউ কেউ দেরি করেছেন। তাছাড়া এইচএসসি পরীক্ষার কাজ নিয়েও ব্যস্ততায় ছিলেন তারা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পরপরই এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিছু ঝামেলাও গেলো। সব মিলিয়ে ফল প্রস্তুতে দেরি হয়েছে। আশা করি আগামীতে এমন সংকট সৃষ্টি হবে না।’

দেরিতে ফল প্রকাশে সন্দেহ-সংশয় বাড়বে

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিগত ১০ বছর দেরি হয়নি। এবার প্রায় ১৫ দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে সন্দেহ-সংশয় বাড়বে বলে মনে করছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মজিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা থাকে দ্রুত ফল পাওয়ার। ফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা দিয়ে তা পিছিয়ে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ে। অনেক সময় এটা সঠিক ফলাফল নিয়ে সন্দেহ-সংশয়ও বাড়িয়ে দেয়। ফল প্রস্তুত করার কাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কত সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।’

ফল প্রকাশে দেরি হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও ফলাফল নিয়ে সন্দেহ-সংশয় বাড়ে। ফল প্রস্তুতির পাশাপাশি সময়মতো প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ।— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান

ফল প্রকাশ কবে, কী বলছে বোর্ড ও শিক্ষামন্ত্রী

ফল প্রকাশ নিয়ে এত জল্পনার মধ্যেও নির্ধারিত তারিখ জানাতে পারছে না শিক্ষা বোর্ড। তবে চলতি মাসের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যা দেরি হয়েছে, তা নিয়ে বলার কিছু নেই। আমরা ২৭-২৮ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রস্তুত করে ফেলবো। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেদিন সময় দেবে সেদিনই ফল প্রকাশ করা হবে।’

জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে তা ভিত্তিহীন। আমরা চাইলে তড়িঘড়ি করে ফল দিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু তা করিনি। যথাযথভাবে ফল প্রস্তুত করে প্রকাশ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা ফল পেয়ে যাবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য ভিত্তিহীন। যথাযথভাবে ফল প্রস্তুত করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা ফল পেয়ে যাবে।— শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন

গত ২১ এপ্রিল এ বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়। এতে অংশ নিতে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে। এর মধ্যে সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে এসএসসিতে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদরাসা বোর্ডে দাখিলে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার এসএসসিতে বহিষ্কার ছিল খুবই কম।

এএএইচ/এমএএইচ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow