রোজা ফরজ হওয়ার ধারাবাহিক ইতিহাস

বছর ঘুরে আমাদের মাঝে এলো পবিত্র মাহে রমজান। আল্লাহর দান ও প্রতিদান লাভের জন্য এ মাসের চেয়ে উত্তম সময় ও অবারিত সুযোগ বান্দা কোনো মাসে অর্জন করতে পারে না। এ পবিত্র মাসে সামান্য আমল করেও অসামান্য প্রাপ্তি হাসিল করা সম্ভব, যা রমজান ছাড়া বাকি এগারো মাসে সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে একটি নফল ইবাদত আদায় করবে, সে অন্য মাসের একটি ফরজ ইবাদত আদায়কারী হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি রমজান মাসে একটি ফরজ ইবাদত করবে, সে অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ ইবাদত আদায়কারী হিসেবে গণ্য হবে।’ (ইবনে খুজাইমা : ১৮৮৭)। আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে রমজান মাসে রোজা রাখবে তার পূর্ববর্তী জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। এমনিভাবে যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে লাইলাতুল কদরে এবাদত করবে তার পূর্ববর্তী জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি : ২০১৪)। রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের উপলক্ষ এ রোজার আমল ঠিক কোন সময়ে ফরজ হয়েছিল, সেটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কয়েকটি মত রয়েছে। তবে দুইটা ব্যাপারে সব আলেম ও ঐতিহাসিক একমত। প্রথমত নবীজি (সা.) জীবন

রোজা ফরজ হওয়ার ধারাবাহিক ইতিহাস

বছর ঘুরে আমাদের মাঝে এলো পবিত্র মাহে রমজান। আল্লাহর দান ও প্রতিদান লাভের জন্য এ মাসের চেয়ে উত্তম সময় ও অবারিত সুযোগ বান্দা কোনো মাসে অর্জন করতে পারে না। এ পবিত্র মাসে সামান্য আমল করেও অসামান্য প্রাপ্তি হাসিল করা সম্ভব, যা রমজান ছাড়া বাকি এগারো মাসে সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে একটি নফল ইবাদত আদায় করবে, সে অন্য মাসের একটি ফরজ ইবাদত আদায়কারী হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি রমজান মাসে একটি ফরজ ইবাদত করবে, সে অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ ইবাদত আদায়কারী হিসেবে গণ্য হবে।’ (ইবনে খুজাইমা : ১৮৮৭)। আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে রমজান মাসে রোজা রাখবে তার পূর্ববর্তী জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। এমনিভাবে যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে লাইলাতুল কদরে এবাদত করবে তার পূর্ববর্তী জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি : ২০১৪)।

রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের উপলক্ষ এ রোজার আমল ঠিক কোন সময়ে ফরজ হয়েছিল, সেটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কয়েকটি মত রয়েছে। তবে দুইটা ব্যাপারে সব আলেম ও ঐতিহাসিক একমত। প্রথমত নবীজি (সা.) জীবনে মোট নয় বছর রমজানে ফরজ রোজা রেখেছেন। দ্বিতীয়ত যে বছর রোজা ফরজ হয়েছে, সে বছর উল্লেখযোগ্য আরও দুটি ঘটনা ঘটেছে—কেবলা পরিবর্তন হয়েছে এবং সাহাবিরা রোজা রেখে বদরের যুদ্ধ করেছেন। এ সবকিছু একসঙ্গে মেলালে স্পষ্ট হয়ে যায়, হিজরতের দ্বিতীয় বছর রমজানের রোজা ফরজ হয়েছে। তবে কোন মাসে বা কত তারিখে হয়েছে, সেটা সঠিকভাবে জানা যায় না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর একবারেই রোজা ফরজ করে দেননি। মোট চারবারে আমাদের ওপর রোজা ফরজ হয়েছে। নবীজি (সা.) যখন মক্কায় থাকতেন, তখন তিনি প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখতেন। প্রতি চন্দ্রমাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে। যেটাকে আইয়ামে বিজের রোজা বলা হয়। হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মাসে রোজা রাখতে চাইলে তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে রোজা রাখো।’ (তিরমিজি : ৭৬১)। হজরত কাতাদাহ ইবনে মিলহান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে রোজা রাখার জন্য আদেশ করতেন। (আবু দাউদ: ২৪৪৯)। তবে এসব রোজা বা রোজা রাখার আদেশ কোনোটাই যে ফরজ ছিল না, সেটা সবাই জানতেন। বরং নবীজি নফল হিসেবে এ রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে নফল হিসেবেই রাখতে বলতেন। রোজার অভ্যাস করানোর জন্য।

দ্বিতীয় পর্যায়ে হলো আশুরার দিনের রোজা। আশুরা হলো মুহাররমের দশ তারিখ। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) যখন মদিনায় গেলেন, তখন দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তিনি তাদের এদিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বলল, এটা সম্মানিত দিন। এদিনে আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) ও তার গোত্রকে শত্রুদের থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাই মুসা (আ.) এদিনে রোজা রাখতেন। নবীজি বললেন, মুসার ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। তিনি আশুরার দিনে রোজা রাখা শুরু করলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (বুখারি : ২০০৪)। তবে আশুরার দিন রোজা রাখার ক্ষেত্রে তিনি বলে দিলেন, আশুরার দিনের সঙ্গে আগের দিন অথবা পরের দিন মিলিয়ে রোজা রাখতে। যেহেতু এই দিনে ইহুদিরা রোজা রাখে, তাদের সঙ্গে যেন সমাঞ্জস্য না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য দশ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রেখ।’ (মুসনাদে আহমদ : ২১৫৪)। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আশুরার রোজা ফরজ ছিল।

এরপর আল্লাহ তায়ালা কোরআনের এ আয়াত নাজিল করেন ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের ওপরও ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)। এ আয়াতে রমজানের রোজা ফরজ করা হলেও কিছুটা ছাড় ছিল। যাদের সম্পদ আছে, তারা চাইলে রোজা না রেখে ফিদয়া দেওয়ার সুযোগ ছিল। যেটা পরের আয়াতে বলা হয়েছে ‘যারা সামর্থ্য রাখে, তারা রোজা না রেখে মিসকিনদের ফিদয়া দিতে পারবে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৪)। এটা ছিল রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার তৃতীয় পর্যায়।

চতুর্থ পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা এ সুযোগ রহিত করে দেন এবং সবার জন্য রোজা রাখার বিধান নাজিল করেন। এ পর্যায়ে পবিত্র কোরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ হয় ‘তোমাদের মধ্যে যে রমজান মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই এ মাসে রোজা রাখে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। এরপর সবার জন্য রমজান মাসে রোজা ফরজ করা হয়। এভাবে মোট চার পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানের তাৎপর্য উপলব্ধি করার তওফিক দান করুন।

লেখক: ইমাম ও খতিব

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow