লালবাগ দুর্গ সাড়ে তিনশ বছরের অসমাপ্ত গল্প
মুহাম্মাদ রাহাতুল ইসলাম খবরটা পৌঁছাল এক বিকেলে। নবাব শায়েস্তা খাঁর মেয়ে পরিবিবি আর নেই। দুর্গের অর্ধেক-গড়া প্রাচীরে তখনো রাজমিস্ত্রিদের হাতুড়ির শব্দ। কিন্তু সেই সন্ধ্যায়ই শব্দটা থেমে গেল। হারিয়ে গেল চিরচেনা ছন্দ। একটা মেয়ের মৃত্যু, একটা সাম্রাজ্যের স্থাপত্য-স্বপ্নকে থামিয়ে দিলো যেন। এ গল্পের শুরুটা অবশ্য আরও কয়েক বছর আগে। তখনো পরিবিবি জীবিত। আর দুর্গের নামও আলাদা। আজম শাহ তখন তরুণ— আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র, পারস্য অভিজাত্যের রক্ত বহন করা উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাহজাদা, স্থাপত্য নির্মাণে গভীরভাবে আগ্রহী। বাংলার সুবেদার হয়ে এসে তাঁর চোখে পড়ল শায়েস্তা খাঁর আগে থেকে শুরু করা এক অসম্পূর্ণ দুর্গ-পরিকল্পনা। শায়েস্তা খাঁ তাঁর প্রথম দফার সুবেদারিত্বকালে (১৬৬৪ থেকে ১৬৭৭ সাল) বাংলার এই দুর্গের একটা জটিল পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এই দুর্গ আসলে যুদ্ধের জন্য গড়া হচ্ছিল না। পুরো পরিকল্পনাটাই ছিল একটা প্রাচীরঘেরা প্রাসাদের। অবরোধ সইতে পারা সামরিক দুর্গ নয়, বরং সুবেদারের বাসস্থান আর ক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবে গড়ে তোলা এক রাজকীয় স্থাপনা, যেখানে থাকবে প্রশস্ত ফটক, দরবার হল, মসজিদ, হাম্মামখানা
মুহাম্মাদ রাহাতুল ইসলাম
খবরটা পৌঁছাল এক বিকেলে। নবাব শায়েস্তা খাঁর মেয়ে পরিবিবি আর নেই। দুর্গের অর্ধেক-গড়া প্রাচীরে তখনো রাজমিস্ত্রিদের হাতুড়ির শব্দ। কিন্তু সেই সন্ধ্যায়ই শব্দটা থেমে গেল। হারিয়ে গেল চিরচেনা ছন্দ। একটা মেয়ের মৃত্যু, একটা সাম্রাজ্যের স্থাপত্য-স্বপ্নকে থামিয়ে দিলো যেন।
এ গল্পের শুরুটা অবশ্য আরও কয়েক বছর আগে। তখনো পরিবিবি জীবিত। আর দুর্গের নামও আলাদা। আজম শাহ তখন তরুণ— আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র, পারস্য অভিজাত্যের রক্ত বহন করা উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাহজাদা, স্থাপত্য নির্মাণে গভীরভাবে আগ্রহী।
বাংলার সুবেদার হয়ে এসে তাঁর চোখে পড়ল শায়েস্তা খাঁর আগে থেকে শুরু করা এক অসম্পূর্ণ দুর্গ-পরিকল্পনা। শায়েস্তা খাঁ তাঁর প্রথম দফার সুবেদারিত্বকালে (১৬৬৪ থেকে ১৬৭৭ সাল) বাংলার এই দুর্গের একটা জটিল পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এই দুর্গ আসলে যুদ্ধের জন্য গড়া হচ্ছিল না। পুরো পরিকল্পনাটাই ছিল একটা প্রাচীরঘেরা প্রাসাদের। অবরোধ সইতে পারা সামরিক দুর্গ নয়, বরং সুবেদারের বাসস্থান আর ক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবে গড়ে তোলা এক রাজকীয় স্থাপনা, যেখানে থাকবে প্রশস্ত ফটক, দরবার হল, মসজিদ, হাম্মামখানা। সব মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ শাসন-কেন্দ্র।
উনিশ একর জমিজুড়ে এই বিশাল পরিকল্পনা ছিল আসলে মোগল ক্ষমতা আর মর্যাদার একটা ঘোষণা। বাংলার বুকে দিল্লির সাম্রাজ্যিক প্রতাপ স্থাপন করার এক প্রচেষ্টা। যেখানে একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাহজাদা নিজের নামও খোদাই করে যেতে চেয়েছিলেন ইতিহাসে।
তিনি নিজের মতো পরিবর্তন এনে কাজে নেমে পড়লেন, আর দুর্গের নাম দিলেন নিজের পিতার সম্মানে—ফোর্ট আওরঙ্গাবাদ। কাজ এগোচ্ছিল দ্রুত। কিন্তু ১৬৭৯ সালে এক আদেশ এলো দিল্লি থেকে। রাজপুতানায় রানা রাজসিংহের বিদ্রোহ দমন করতে হবে। শাহজাদা চলে গেলেন।
যে মানুষটা এই প্রাসাদ-স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি নিজেই সেটাকে অর্ধেক রেখে হারিয়ে গেলেন ইতিহাসের অন্য এক যুদ্ধক্ষেত্রে। দুর্গ পড়ে রইল। দেওয়ালের গায়ে তখনো তাজা রঙের দাগ। খিলানগুলো তখনো অসম্পূর্ণ। আজম শাহ ১৬৭৯ সালে চলে যাওয়ার পর, শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে দ্বিতীয়বার সুবেদারি গ্রহণ করেন।
এরপর শায়েস্তা খাঁ কাজ তুলে নিলেন নিজের হাতে। আর তাঁর মেয়ে পরিবিবি, যার পুরো নাম ইরান দুখ্ত। তার বিয়ে হয়েছিল আজম শাহের সাথেই। চার বছর ধরে দুর্গের কাজ চলল। প্রাচীর উঠল, ফটক দাঁড়াল, মসজিদের গম্বুজ মাথা তুলল। আর তারপর, ১৬৮৪ সালে সেই খবরটা এলো। পরিবিবি আর নেই।
শায়েস্তা খাঁ ভেঙে পড়লেন। যে মানুষ বছরের পর বছর ধরে একটা প্রাসাদ গড়ে তুলছিলেন, তিনি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন জায়গাটা অপয়া। আর কোনো ইট গাঁথা হবে না। আর দুর্গ রয়ে গেল যেভাবে ছিল, ঠিক সেভাবেই—অর্ধসমাপ্ত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন, পোস্টার কিংবা যে কোনো জায়গায় লালবাগ কেল্লার যে চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়, সেটি মূলত পরিবিবির সমাধিস্থল।
ঠিক সেদিনের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর পর আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই একই মসজিদের সামনে। সন্তানহারা বেদনায় এক প্রতাপশালী বাবার অসম্পূর্ণ স্থাপনার পাশে। সাড়ে তিনশ বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন এই মসজিদে আজান দিয়ে যাচ্ছেন কোনো না কোনো মুয়াজ্জিন। ঠিক সেদিনের কথা ভাবুন। চারপাশে কর্মব্যস্ত নানান বয়সের মানুষ। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। আর আপন মনে ঘুরে ঘুরে সবকিছু পরিদর্শন করছেন শাহজাদা মির্জা আবুল ফায়াজ কুতুবুদ্দীন মুহাম্মদ আজম শাহ। তাঁর চারদিকে ঘিরে আছে সহকারী ও দেহরক্ষীরা। খোশমেজাজে গল্প করছেন তিনি। অমনি ‘হাইয়া আলাস ছলাহ’ বলে নামাজের জন্য আজান দিয়ে উঠলেন মুয়াজ্জিন। তিনি ছুটে গেলেন পাশের মসজিদে। কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন নামাজের জন্য।
আমি এখন সেদিনের সেই মসজিদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। সমাধিসহ পুরো চারপাশটা ঘুরে দেখলাম। এগিয়ে গেলাম সেই ফটকের দিকে, সম্ভবত যেখানে একদিন কাজ থেমে গিয়েছিল খিলান তৈরি হওয়ারও আগে। আজও দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে। যেন পরিবিবির মৃত্যুর সেই বেদনাবিধুর দিনটা এখনো শেষ হয়নি।
এসইউ
What's Your Reaction?