ইমান নবায়ন করার সহজ উপায়

শায়খ আব্দুল কাইয়ূম রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ইমান তোমাদের অন্তরের মধ্যে পুরনো হয়ে যায়, যেভাবে তোমাদের জামাকাপড় পুরনো হয়ে যায়। কাজেই, তোমরা তোমাদের অন্তরের ইমানকে নবায়ন করো। ইমান পুরনো হয়ে যাওয়ার অর্থ কী? কাপড়চোপড় যেমন ব্যবহার করতে করতে পুরনো হয়ে যায়, ইমানও তেমনি মানুষ যখন আস্তে আস্তে গাফেল হয়ে যায়, তখন পুরনো হতে থাকে। মানুষ যখন নেক আমল বা সৎকর্ম থেকে দূরে সরে যায়, অলসতা ও গাফলতি চলে আসে, শয়তানের রাস্তায় চলে এবং প্রমোদ-আমোদ ও আনন্দফুর্তিতে ডুবে থাকে, তখন আল্লাহর ভয়, জাহান্নাম কিংবা জান্নাতের কথা তার মনের ধারেকাছে সহজে আসে না। ইমান পুরনো হওয়া মানে তা দুর্বল হয়ে যাওয়া। এই দুর্বল ইমান এক প্রকার মরা ইমান, তা কোনো জীবন্ত ইমান নয়। এমন কি আমরা যে রুটিন কাজগুলো করি যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, জুমার নামাজে আসা, অজু করা ইত্যাদি এগুলোর মাধ্যমেও ইমান নবায়নের সুযোগ রয়েছে। আবার এগুলোর মধ্য দিয়েও ইমান নবায়ন না-ও হতে পারে, যদি আমরা এগুলো স্রেফ লোকদেখানো বা দায়সারাভাবে করি। নামাজ না পড়লে তো সমাজ বা পরিবারের মানুষজন নানা কথা বলবে, তাই নামাজ পড়া; কিংবা অনেক কষ্ট করে কাজকর্ম ফেলে জুমায় আসা। অথচ এই আম

ইমান নবায়ন করার সহজ উপায়

শায়খ আব্দুল কাইয়ূম

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ইমান তোমাদের অন্তরের মধ্যে পুরনো হয়ে যায়, যেভাবে তোমাদের জামাকাপড় পুরনো হয়ে যায়। কাজেই, তোমরা তোমাদের অন্তরের ইমানকে নবায়ন করো।

ইমান পুরনো হয়ে যাওয়ার অর্থ কী? কাপড়চোপড় যেমন ব্যবহার করতে করতে পুরনো হয়ে যায়, ইমানও তেমনি মানুষ যখন আস্তে আস্তে গাফেল হয়ে যায়, তখন পুরনো হতে থাকে।

মানুষ যখন নেক আমল বা সৎকর্ম থেকে দূরে সরে যায়, অলসতা ও গাফলতি চলে আসে, শয়তানের রাস্তায় চলে এবং প্রমোদ-আমোদ ও আনন্দফুর্তিতে ডুবে থাকে, তখন আল্লাহর ভয়, জাহান্নাম কিংবা জান্নাতের কথা তার মনের ধারেকাছে সহজে আসে না। ইমান পুরনো হওয়া মানে তা দুর্বল হয়ে যাওয়া। এই দুর্বল ইমান এক প্রকার মরা ইমান, তা কোনো জীবন্ত ইমান নয়।

এমন কি আমরা যে রুটিন কাজগুলো করি যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, জুমার নামাজে আসা, অজু করা ইত্যাদি এগুলোর মাধ্যমেও ইমান নবায়নের সুযোগ রয়েছে। আবার এগুলোর মধ্য দিয়েও ইমান নবায়ন না-ও হতে পারে, যদি আমরা এগুলো স্রেফ লোকদেখানো বা দায়সারাভাবে করি। নামাজ না পড়লে তো সমাজ বা পরিবারের মানুষজন নানা কথা বলবে, তাই নামাজ পড়া; কিংবা অনেক কষ্ট করে কাজকর্ম ফেলে জুমায় আসা। অথচ এই আমলগুলোর মাধ্যমে আমরা কত বড় নেয়ামত পাচ্ছি, তা আমরা ভুলেই যাই। কার সামনে আমরা দুই রাকাত নামাজে দাঁড়াচ্ছি, সেই অনুধাবন হারিয়ে যায়।

অথচ আমাদের প্রতিটি কাজ ও আমলের মধ্যে ইমান নবায়নের চমৎকার সুযোগ আছে। নামাজের মধ্যে আমি সরাসরি আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথা বলব, অজুর মাধ্যমে আল্লাহ আমার জন্য বিরাট পুরস্কার রেখে দিয়েছেন, আর জুমায় আসার পেছনে রয়েছে অপরিসীম মর্যাদা এই বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত মনের মধ্যে জাগ্রত রাখা প্রয়োজন।

আল্লাহ তাআলা যা বলেছেন, আমি তা পাব এই আশায় এবং এই আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে আমল করাই হলো ইমান তাজা থাকার প্রকৃত লক্ষণ। অন্যদিকে, নামাজ পড়লাম ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরে দুনিয়ার শত চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে; কার সামনে দাঁড়ালাম, কাকে 'আল্লাহু আকবার' বা 'সুবহানা রাব্বিয়াল আলা' বলছি সেই অনুভূতিই মনের মধ্যে নেই, তাহলে বুঝতে হবে আমি এক মরা ইমান নিয়ে মরা নামাজ পড়ছি।

এইজন্যই একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজা তো সবাই রাখে, কিন্তু সবার রোজার সওয়াব সমান হয় না। যে ব্যক্তি পূর্ণ ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশা নিয়ে রোজা রাখে অর্থাৎ, মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস রেখে যে এটি ফরজ, আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, তাই কষ্ট সহ্য করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তা পালন করব, তাহলে সে রোজার পূর্ণ সওয়াব পায়।

ঠিক একইভাবে প্রতিটি কাজ; হজ, ওমরাহ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির কিংবা দোয়া যাই করি না কেন, মনের মধ্যে একাগ্রতা ও তীব্র আকুলতা থাকতে হবে যে আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই আমার এই আমল কবুল করবেন। এই বিশ্বাস নিয়ে আমল করা আর এমনিতেই প্রথাগতভাবে করে যাওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।

ইমান তাজা করার তাগিদ সাহাবায়ে কেরামও গভীরভাবে অনুধাবন করতেন। হযরত মুআজ (রা.) ও হযরত আসআদ ইবনে জুরারাহ (রা.) পরস্পরকে বলতেন, ‘এসো, কিছুক্ষণ বসে আমরা ইমানের কথা বলি, দ্বীনের কথা বলি। যাতে মনের ভেতরে আল্লাহ তাআলার ভয় এবং তাঁর রহমতের আশা পুনরুজ্জীবিত হয়।’ এভাবে তাঁরা নিজেদের ইমান বৃদ্ধির জন্য আলোচনা করতেন এবং আমল করতেন।

হজরত আবু দরদা (রা.) বলেছেন, প্রতিটি মানুষের উচিত সবসময় নিজেকে মূল্যায়ন করা যে, আমার ইমান কি দিনের পর দিন বাড়ছে নাকি কমছে? গতকাল আমার ইমানের অবস্থা কেমন ছিল আর আজকে কেমন আছে? এটি জিন্দা ইমান নাকি মরা ইমান? সব সময় এভাবে আত্মপর্যালোচনা বা আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। শয়তান কোন দিক দিয়ে ঢুকে আমাকে গুনাহ করাচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সেই পথ বন্ধ করাই একজন বুদ্ধিমান মুসলমানের কাজ।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। যেমন আমরা জুমার নামাজে যাই। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার প্রতিটি দিনকে এক একটি অবয়ব বা সুরত দিয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করবেন। সপ্তাহের সাতটি দিনই মানুষের সামনে এসে দাঁড়াবে। মানুষ তার জীবদ্দশায় কী কী আমল করেছে, তা পুরো তালিকার মতো দিনগুলোর সঙ্গে দৃশ্যমান হবে। বছরে ৩৬৫ দিনের প্রতিটি দিনই মানুষের সামনে আসবে।

আখেরাতে প্রতিটি আমলকে আল্লাহ তাআলা একটি দৃশ্যমান রূপ দেবেন। দুনিয়াতে আমরা আমলের কোনো বাহ্যিক শরীর দেখি না, কিন্তু সেখানে এর একটি বডি বা অবয়ব থাকবে। সাধারণ দিনগুলোর রূপ একই রকম হবে, কিন্তু জুমার দিনটি আসবে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী রূপ নিয়ে। অত্যন্ত আলোকিত, উজ্জ্বল ও নুরানি এক অবয়ব নিয়ে দিনটি হাশরের ময়দানে আত্মপ্রকাশ করবে।

যারা জুমার ফজিলত ও মর্যাদা রক্ষা করে সঠিকভাবে জুমা আদায় করেছেন, তাদের সামনে এই দিনটিকে আকর্ষণীয় ও মায়াবী রূপে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হবে যেভাবে একজন নববিবাহিত বরের সামনে তার বধূকে প্রথম সাক্ষাতে উপস্থিত করা হয়।

জুমার দিনটির অবয়ব হবে শুভ্র বরফের মতো উজ্জ্বল ফর্সা রঙের এবং তা থেকে চারদিকে অপূর্ব সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা সেদিন সঠিক উপায়ে জুমা আদায়কারীদের বলবেন কাফুরের পাহাড়ের কাছে গিয়ে আনন্দে মেতে উঠতে। তাদের এই আনন্দ-উচ্ছ্বলতা দেখে অন্যান্য জিন ও ইনসান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহ তাআলা জুমার বিনিময়ে তাদের যে অপরিসীম নেয়ামত ও মর্যাদা দেবেন, তা দেখে সবাই বিস্মিত হবে।

অথচ আমরা যখন জুমার নামাজে যাই, অনেকে খুতবার সময়েও অনায়াসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে থাকি। কতটা অমনোযোগিতা! এই ধরনের উদাসীনতার সঙ্গে পড়া জুমা আর ইখলাসের সঙ্গে পড়া জুমার ফল কখনোই এক হতে পারে না।

একইভাবে আমরা যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, তার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন। একদিন তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, কারও ঘরের সামনে যদি একটি প্রবাহিত নদী থাকে এবং সে যদি তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তবে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, না হে আল্লাহর রাসুল, প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করলে কোনো ময়লা থাকতে পারে না। তিনি বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিষয়টিও ঠিক তেমনই। এটি মানুষের সমস্ত গুনাহ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেয়।

কিন্তু আমরা যখন নামাজে আসি, তাড়াহুড়ো করে দুই বা চার রাকাত পড়ে দৌড় দিই। অফিস বা কর্মক্ষেত্র থেকে আসা-যাওয়ার পথে কষ্ট হয় সত্য, আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই এই কষ্টের মূল্যায়ন করবেন। তবে যতটুকু সময় আমরা নামাজে থাকি, অন্তত ততটুকু সময় মনোযোগ দেওয়া উচিত। খুশু-খুজু ও একাগ্রতা বজায় রাখা উচিত। নামাজকে কেবল উঠাবসা বা রুটিন কাজের মতো না বানিয়ে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

অজুর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অজুর মাধ্যমে যখন আমরা অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধৌত করি, তখন আমাদের হাত, মুখ ও চোখ দিয়ে হয়ে যাওয়া গুনাহগুলো ঝরঝর করে ঝরে যায়। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে পাক-সাফ করে দেন।

এই যে বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে ইমান নবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, আমরা কি সত্যিই তা করতে পারছি? আমরা তো চরম বেখেয়ালি, অমনোযোগী ও গাফিলতির মধ্যে ডুবে আছি। নামাজে দাঁড়ালেই তিনশ-চারশ চিন্তাভাবনা মাথার মধ্যে এসে ভিড় করে। আমাদের উচিত এই চিন্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করা। তাহলেই আমাদের ইমান নবায়িত হবে, তা আর মরা ইমান থাকবে না; বরং জীবন্ত ইমানে পরিণত হবে।

একবার জীবন্ত ইমান অর্জিত হলে তা আমাদের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে। আর ভুলবশত কোনো গুনাহ হয়ে গেলে আমরা সাথে সাথে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে আবার আল্লাহর পথে ফিরে আসব।

সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল Muslim Ummah - Shaykh Abdul Qayum-এ প্রকাশিত শায়খ আব্দুল কাইয়ূমের বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow