কোরবানির আগে অস্থির খাতুনগঞ্জের মসলার বাজার
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে মসলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খুচরা বাজারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে অধিকাংশ মসলার পাইকারি দাম স্থিতিশীল থাকলেও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। কোরবানির ঈদের আগে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, মসলা ও অন্যান্য আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। দেশের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে এই কেন্দ্রটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর নতু
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে মসলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খুচরা বাজারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে অধিকাংশ মসলার পাইকারি দাম স্থিতিশীল থাকলেও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। কোরবানির ঈদের আগে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, মসলা ও অন্যান্য আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। দেশের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে এই কেন্দ্রটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর নতুন করে আবারও ভাড়া বেড়েছে। আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি ট্রাক ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। একইভাবে বিভিন্ন স্থলবন্দর থেকে চট্টগ্রাম রুটে ট্রাক ভাড়া ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এখন ৩১ থেকে ৩২ হাজার টাকায় উঠেছে। প্রতিটি ট্রিপে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ বাড়ছে, যা পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলছে।
খাতুনগঞ্জের আড়ত ও গুদামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের তুলনায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যোগ হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী সুমন বলেন, পরিবহন ভাড়া ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে,যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে। জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ঈদের আগে বাজার আরও জটিল হতে পারে।
সরেজমিনে পাইকারি বাজারে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে, আবার বেশ কিছু পণ্যের দাম কমেছে। খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি ভারত থেকে আমদানিকৃত শুকনা মরিচ বিক্রি হয়েছে ৩৯৮ থেকে ৪০০ টাকায়, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩৭০ থেকে ৩৭৫ টাকার মধ্যে। একই সময়ে পঞ্চগড় থেকে আনা দেশীয় শুকনা মরিচের দাম কেজিপ্রতি ৩০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ২৪৫ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। ধনিয়ার দাম মানভেদে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ১৩৮ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জয়ত্রীর দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকায় উঠেছে। তবে দেশীয় হলুদের দাম কিছুটা কমে কেজিপ্রতি ১২ থেকে ১৫ টাকা কমে বর্তমানে ২১৮ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।
অন্যদিকে আমদানিকৃত গরম মসলার মধ্যে জিরার দাম কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা কমে বর্তমানে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দারচিনি কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৩৫৫ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৩০ টাকা, গোলমরিচ ১ হাজার ২০ টাকা, এলাচ ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা, জায়ফল ৭০০ টাকা, কালিজিরা ৩৬০ টাকা, মেথি ১৩০ টাকা এবং সরিষা ৯৪ থেকে ৯৫ টাকায় লেনদেন হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু আমদানিকৃত পণ্যের দাম আগে বেড়েছিল, তবে বর্তমানে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় সেগুলোর দাম কিছুটা কমতির দিকে রয়েছে।
খাতুনগঞ্জের আড়তগুলোতে পেঁয়াজ ও রসুনের বাজারেও সামান্য পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ২২ থেকে ২৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে সদ্য মাঠ থেকে উত্তোলন হওয়া পানিযুক্ত বা নিম্নমানের পেঁয়াজ পাইকারিতে ৭ থেকে ১৫ টাকায় লেনদেন হতে দেখা গেছে। আমদানিকৃত রসুন বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১৩০ থেকে ১৩২ টাকায় এবং দেশি রসুন ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আমদানিকৃত আদা বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ৯২ টাকা কেজি দরে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে নিম্নমানের পেঁয়াজের মজুত রয়েছে, যা আগামী মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তখন ভালো মানের দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খুচরা বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন পণ্যের দামে পড়তে শুরু করেছে। নগরীর বিভিন্ন বাজারে মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৮২ থেকে ৮৫ টাকা এবং নাজিরশাইল চাল ৮৮ থেকে ৯৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের তুলনায় ৪ থেকে ৬ টাকা বেশি। ডালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। ডিমের দাম প্রতি পিসে ২ থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত বেড়ে বর্তমানে খুচরা বাজারে ডিমের হালি বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৪ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে।
সবজি বাজারেও দামের ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। গাজরের দাম কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় উঠেছে। সজনে ৭০ থেকে ৮০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ঝিঙা ৭০ থেকে ৮০ টাকা থেকে কমে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় নেমেছে। পটল ৭০ থেকে ৮০ টাকা থেকে কমে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা থেকে কমে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ ৫০ থেকে ৬০ টাকা থেকে কমে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ খুচরা বাজারে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাংস ও পোলট্রি বাজারেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম আগে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা থাকলেও বর্তমানে কমে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় নেমেছে। পাকিস্তানি সোনালি মুরগি ৩৮০ থেকে ৩৯০ টাকা থেকে কমে ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাকিস্তানি হাইব্রিড মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা থেকে কমে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায় নেমেছে। দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস অপরিবর্তিত থেকে ৭২০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পর শুধু পরিবহন ভাড়া বাড়েনি, বরং পণ্যবাহী যানবাহনের স্বল্পতাও দেখা দিয়েছে। এর ফলে খাদ্যশস্য, শাকসবজি, কাঁচামাল, মৌসুমি ফল এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিবহনে ব্যয় বেড়ে গেছে। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রেও পরিবহন খরচ বাড়ায় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন কালবেলাকে বলেন, কোরবানির সঙ্গে জড়িত প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা ঈদ উপলক্ষে পণ্যের আমদানি ও মজুত বাড়ালেও বাজার তদারকিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই সুযোগে অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মসলা, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে ঈদের আনন্দ অনেকের জন্য কষ্টের হয়ে যেতে পারে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন বলেন, কিছু কিছু মসলার দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে এবং সামনে আরও বাড়তে পারে। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ। তিনি বলেন, যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই এমন পণ্যের দামও বাড়ানো হয়েছে। যেমন গত তিনদিনে প্রতি মণ চিনির দাম ১০০ টাকা বেড়েছে এবং পাম অয়েলের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এসব পণ্য মূলত মালয়েশিয়া ও ব্রাজিল থেকে আসে, যার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, কেউ অন্যায়ভাবে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। বাজার তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদের আগ মুহূর্তে প্রতি বছরই মসলার চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে শুকনা মরিচ, ধনিয়া, হলুদ, জিরা, এলাচ, দারচিনি ও রসুনের মতো পণ্যের ব্যবহার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি সংকটের কারণে সরবরাহ ব্যয় বাড়ায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলে ঈদের আগে মসলাসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
What's Your Reaction?