চট্টগ্রামে বেড়েছে সাপের উপদ্রব, সাত দিনে আক্রান্ত ৮১
টানা ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে সাপের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলা- সবখানেই বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমিতে সাপের আনাগোনা বাড়ায় প্রতিদিনই মানুষ বিভিন্ন বিষধর সাপের কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে ছুটছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে এক ছাত্রের বাসায় সংগীতের ক্লাস নিতে যাচ্ছিলেন নগরীর কালুরঘাট মোহরা এলাকার সংগীত শিক্ষক সুজিত দাশ। পথেই একটি বড় কালো সাপ তার পায়ের বুড়ো আঙুলে কামড় দেয়। আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সুজিত দাশ জানান, সাপে কাটার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসকরা তাকে ঘুমাতে ও খাবার খেতে নিষেধ করেছিলেন। বর্তমানে যে স্থানে সাপ কামড়েছে, সেখানে পচন ধরেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ওষুধে উন্নতি না হলে পায়ের বুড়ো আঙুল কেটে ফেলতে হতে পারে। একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন পটিয়া উপজ
টানা ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে সাপের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলা- সবখানেই বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমিতে সাপের আনাগোনা বাড়ায় প্রতিদিনই মানুষ বিভিন্ন বিষধর সাপের কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে ছুটছেন।
বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে এক ছাত্রের বাসায় সংগীতের ক্লাস নিতে যাচ্ছিলেন নগরীর কালুরঘাট মোহরা এলাকার সংগীত শিক্ষক সুজিত দাশ। পথেই একটি বড় কালো সাপ তার পায়ের বুড়ো আঙুলে কামড় দেয়। আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সুজিত দাশ জানান, সাপে কাটার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসকরা তাকে ঘুমাতে ও খাবার খেতে নিষেধ করেছিলেন। বর্তমানে যে স্থানে সাপ কামড়েছে, সেখানে পচন ধরেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ওষুধে উন্নতি না হলে পায়ের বুড়ো আঙুল কেটে ফেলতে হতে পারে।
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন পটিয়া উপজেলার টেগোটা এলাকার হৃদয় বড়ুয়া। তিনি বলেন, রাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে অসাবধানতাবশত একটি সাপের লেজে পা পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই সাপটি তাকে কামড় দেয়। সহকর্মীরা দ্রুত চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে আনার পর কয়েক দফা বমিও হয় তার।
রাউজান উপজেলার রঘুনন্দনহাট এলাকার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ভোরে বাড়ির পাশের বিলে মাছ ধরতে নেমেছিলেন। পানির মধ্যে কী যেন তাকে কামড় দিলেও তখন বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। পরে অফিসে গিয়ে ক্ষতস্থানে তীব্র ব্যথা ও চুলকানি শুরু হলে চিকিৎসকের পরামর্শে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হন।
নগরীর অক্সিজেন এলাকার পারভিন আক্তার জানান, অতিবৃষ্টিতে তাদের বাড়ি কোমরসমান পানিতে ডুবে যায়। ঘরের পানি সরানোর সময় হঠাৎ তার পায়ে সাপ কামড় দেয়। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
শুধু এই চারজন নন, এমন আরও অসংখ্য রোগীর গল্পে ভরে উঠেছে চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড। দুই কক্ষবিশিষ্ট এই ওয়ার্ডে বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি সাপে কাটা রোগীদেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেককে ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে করিডোর, সিঁড়ির পাশ কিংবা চলাচলের পথেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার ফোকাল পারসন ডা. আবদুল্লাহ আবু সাঈদ কালবেলাকে বলেন, বর্ষাকালে সাপে কাটার রোগী বাড়বে, এটি স্বাভাবিক। ১৬ নম্বর ওয়ার্ডটি মেডিসিন বিভাগের মূল ওয়ার্ড। এখানে শুধু সাপে কাটা রোগী নয়, বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোগীর তুলনায় বেড ও জায়গা কম থাকায় আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
চমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলায় জলাবদ্ধতা এবং বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যাতেও।
গত সাত দিনে মেডিসিন বিভাগের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাপ ও অন্যান্য বিষধর কীটপতঙ্গের কামড়ে আক্রান্ত মোট ৮১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে বিষাক্ত সাপের কামড়ে আক্রান্ত ২ জন, স্থানীয়ভাবে বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত সাপের কামড়ে ১২ জন, বিষহীন সাপের কামড়ে ৫৬ জন এবং অজ্ঞাত কীটপতঙ্গের কামড়ে রয়েছেন ১১ জন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
বর্ষাকালে কেন সাপে কামড়ানোর ঘটনা বেড়ে যায়- এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহকারী গবেষক মো. আবদুল আউয়াল বলেন, ‘বর্তমান সময়টি সাপের প্রজনন মৌসুম। শীতকালে সাপ দীর্ঘ সময় নিস্তেজ অবস্থায় থাকে এবং খুব কম আহার গ্রহণ করে। তাই বর্ষা ও গরমের সময় তারা বেশি খাবারের সন্ধানে বের হয়।’
তিনি বলেন, ‘সাপ নিজেরা গর্ত তৈরি করতে পারে না। তারা সাধারণত ইঁদুরের তৈরি গর্তে আশ্রয় নেয়। অতিবৃষ্টিতে সেই গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে গেলে সাপ বাধ্য হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। আবার সাপ শীতল রক্তের প্রাণী হওয়ায় টানা বৃষ্টির পর শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে অনেক সময় উন্মুক্ত বা অপেক্ষাকৃত শুকনো স্থানে অবস্থান করে। বন্যার সময় অধিকাংশ স্থলচর বিষধর সাপও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসে। তখন মানুষের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।’
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বর্ষা ও বন্যার সময়ে হাঁটাচলার সময় বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। পানি জমে থাকা জায়গায় নামার আগে লাঠি দিয়ে পরীক্ষা করা, রাতে টর্চ ব্যবহার করা, ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সাপে কামড়ালে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের পরিবর্তে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
What's Your Reaction?