বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লব কি ক্রীড়া শিল্পে? 

বাংলাদেশে ক্রীড়া নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের চিন্তা সাধারণত মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কে জিতল, কে হারল, কোন খেলোয়াড় ভালো খেলল কিংবা কোন দল চ্যাম্পিয়ন হলো, এই বিষয়গুলোই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই ক্রীড়াকে শুধু বিনোদন বা প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা বন্ধ করেছে। তারা ক্রীড়াকে দেখছে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শিল্প (স্পোর্টস ইন্ডাসট্রিজ) হিসেবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে ক্রীড়াকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার। একটি শক্তিশালী ক্রীড়া শিল্প খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তৈরি করে কোচ, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, ভিডিও বিশ্লেষক, পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট, পুষ্টিবিদ, স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট, কনটেন্ট নির্মাতা, ইভেন্ট ম্যানেজার, ডিজিটাল মার্কেটার, ব্রডকাস্ট বিশেষজ্ঞ, স্পোর্টস ফটোগ্রাফার, ক্যামেরা অপারেটর, স্টেডিয়াম ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ এবং হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। অর্থাৎ, একজন খেলোয়াড়ের পেছনে একটি বিশাল অর্থনৈতিক চেইন কাজ করে, যেখানে অসংখ্য মানুষ

বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লব কি ক্রীড়া শিল্পে? 

বাংলাদেশে ক্রীড়া নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের চিন্তা সাধারণত মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কে জিতল, কে হারল, কোন খেলোয়াড় ভালো খেলল কিংবা কোন দল চ্যাম্পিয়ন হলো, এই বিষয়গুলোই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই ক্রীড়াকে শুধু বিনোদন বা প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা বন্ধ করেছে। তারা ক্রীড়াকে দেখছে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শিল্প (স্পোর্টস ইন্ডাসট্রিজ) হিসেবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে ক্রীড়াকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার। একটি শক্তিশালী ক্রীড়া শিল্প খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তৈরি করে কোচ, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, ভিডিও বিশ্লেষক, পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট, পুষ্টিবিদ, স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট, কনটেন্ট নির্মাতা, ইভেন্ট ম্যানেজার, ডিজিটাল মার্কেটার, ব্রডকাস্ট বিশেষজ্ঞ, স্পোর্টস ফটোগ্রাফার, ক্যামেরা অপারেটর, স্টেডিয়াম ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ এবং হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। অর্থাৎ, একজন খেলোয়াড়ের পেছনে একটি বিশাল অর্থনৈতিক চেইন কাজ করে, যেখানে অসংখ্য মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া শক্তিগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। যেমন, ইউরোপের ফুটবল লিগগুলো কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম। একটি ম্যাচ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপন সংস্থা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, টিকিটিং কোম্পানি, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন খাত, হোটেল, পরিবহন, খাদ্যসেবা, মার্চেন্ডাইজ ব্যবসা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ফলে একটি ম্যাচের অর্থনৈতিক প্রভাব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমস, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল), ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন (এনবিএ) কিংবা উইম্বলডন—প্রতিটি আয়োজনই সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, পর্যটন, হোটেল, পরিবহন, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং মার্চেন্ডাইজিংয়ের মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে। একটি বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য নতুন স্টেডিয়াম, সড়ক, বিমানবন্দর, হোটেল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মিত হয়; আবার আইপিএলের মতো একটি লিগ হাজার হাজার মানুষকে মৌসুমি ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়। অর্থাৎ, আধুনিক বিশ্বে ক্রীড়া এখন মাঠের লড়াই থেকে বের হয়ে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমে রূপান্তরিত হয়েছে। 

বাংলাদেশেও এই সম্ভাবনা মোটেও কম নয়। আমাদের রয়েছে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ব্যবহারকারী এবং ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক। কিন্তু আমরা এখনও ক্রীড়াকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণ ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট পেশায় যুক্ত না হয়ে অন্য কোন পেশায় চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।

বিপিএল, ঢাকা ম্যারাথন কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সিরিজের মতো আয়োজনগুলোকে যদি কেবল কয়েক দিনের খেলা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে এর সুফল বহুমাত্রিক হবে। সম্প্রচার, ডিজিটাল কনটেন্ট, ইভেন্ট পরিচালনা, পর্যটন, হোটেল, বিজ্ঞাপন, ক্রীড়া প্রযুক্তি থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অসংখ্য তরুণের জন্য নতুন পেশা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তখন ক্রীড়া আর শুধু দর্শকের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি দেশের অর্থনীতির একটি কার্যকর ও টেকসই প্রবৃদ্ধির খাতে পরিণত হতে পারবে। 

আজ যদি কোনো তরুণ খেলোয়াড় হতে না চায়, তাহলে তাঁর জন্য ক্রীড়া খাতে বিকল্প ক্যারিয়ারের সুযোগ কতটুকু? খুবই সীমিত। অথচ একজন ফুটবলপ্রেমী তরুণ চাইলে ভিডিও অ্যানালিস্ট হতে পারেন, একজন জীববিজ্ঞান শিক্ষার্থী স্পোর্টস সায়েন্সে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, একজন ফিজিওথেরাপিস্ট আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস রিহ্যাব বিশেষজ্ঞ হতে পারেন, একজন মিডিয়া শিক্ষার্থী স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং কিংবা ডিজিটাল কনটেন্টে সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। এসব পেশার প্রতিটির বৈশ্বিক চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্পোর্টস টেকনোলজির যুগে ক্রীড়া এখন আর শুধু শারীরিক দক্ষতার বিষয় নয়। একজন ভিডিও বিশ্লেষক খেলোয়াড়ের শত শত মুভমেন্ট বিশ্লেষণ করে কোচকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন। স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স বাড়াতে বৈজ্ঞানিক তথ্য ব্যবহার করেন। ডিজিটাল মার্কেটিং টিম একটি ক্লাবকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডে পরিণত করে। অর্থাৎ মাঠের বাইরের দক্ষতার মূল্য দিন দিন আরও বাড়ছে।

বাংলাদেশে যদি আমরা পরিকল্পিতভাবে স্পোর্টস একাডেমি, গবেষণা কেন্দ্র, স্পোর্টস সায়েন্স ল্যাব, কোচিং ইনস্টিটিউট এবং স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা চালু করতে পারি, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই একটি নতুন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। এর দ্বারা দেশের ক্রীড়ার মানোন্নয়নের পাশাপাশি হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দ্বারও খুলে যাবে।

একইসঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী বেসরকারি বিনিয়োগ। শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে আধুনিক ক্রীড়া শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বিভিন্ন খেলাকে স্পন্সর করে, আঞ্চলিক লীগ তৈরি করে, একাডেমি পরিচালনা করে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে, তাহলে একটি টেকসই ক্রীড়া অর্থনীতি গড়ে উঠবে। এতে ব্যবসা যেমন লাভবান হবে, তেমনি দেশও পাবে নতুন অর্থনৈতিক গতি।

মিডিয়ার ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সংবাদমাধ্যম এখনো অধিকাংশ সময় ম্যাচের ফলাফল প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ ক্রীড়া শিল্প, স্পোর্টস স্টার্টআপ, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা, স্পোর্টস ইনোভেশন কিংবা ক্রীড়া-ভিত্তিক কর্মসংস্থান নিয়ে আরও বেশি আলোচনা প্রয়োজন। সমাজ যখন নতুন নতুন পেশাকে গুরুত্ব দেবে, তখন তরুণরাও সেদিকে আগ্রহী হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনকে পর্যটন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। একটি বড় টুর্নামেন্ট যেমন দর্শকই আনে তেমনি এটি হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশও যদি আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া গন্তব্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট, স্পোর্টস বিজনেস, স্পোর্টস অ্যানালিটিক্স, স্পোর্টস মিডিয়া এবং স্পোর্টস সায়েন্স বিষয়ে আধুনিক কোর্স চালু করা জরুরী। বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। আমরা কি ক্রীড়াকে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো? যদি এটি সম্ভব হয়, তাহলে ক্রীড়া হবে নতুন কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।

একটি শক্তিশালী ক্রীড়া শিল্প মানে হাজারো দক্ষ পেশাজীবী, নতুন উদ্যোক্তা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং একটি প্রাণবন্ত অর্থনীতি। খেলার মাঠে যেমন একটি গোল পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে, তেমনি সঠিক নীতি, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সমন্বিত বিনিয়োগ বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতকে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শিল্পে রূপান্তরিত করতে পারে।

লেখক

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশন
চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইকোনোমিক রিসার্চ
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow