রেলওয়ে কর্মকর্তাকে হত্যা: পরকীয়া নয়, ‘হানি ট্র্যাপ’ ও পরিকল্পিত হত্যার দাবি

রাজধানীর মহাখালীর টিবি গেট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাংলাদেশ রেলওয়ের নবনিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মামুন (৩০) নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।  পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পরকীয়া সম্পর্কের জেরে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করলেও, নিহতের পরিবার এটিকে একটি পরিকল্পিত ‘হানি ট্র্যাপ’ ও হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিউটি আক্তার নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে বনানী থানা পুলিশ। পুলিশ জানায়, জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরিসহ ওই নারীকে আটক করা হয়। নিহত মো. মামুন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মালিয়াটি গ্রামের বাবুল হোসেনের ছেলে। তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়েতে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা) হিসেবে নিয়োগ পান এবং প্রায় এক মাস আগে কর্মস্থলে যোগদান করেন। তিনি বিবাহিত ছিলেন। তার স্ত্রী শাহীনা আক্তার বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া বিউটি আক্তার ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার নিগুয়ারী

রেলওয়ে কর্মকর্তাকে হত্যা: পরকীয়া নয়, ‘হানি ট্র্যাপ’ ও পরিকল্পিত হত্যার দাবি

রাজধানীর মহাখালীর টিবি গেট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাংলাদেশ রেলওয়ের নবনিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মামুন (৩০) নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। 

পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পরকীয়া সম্পর্কের জেরে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করলেও, নিহতের পরিবার এটিকে একটি পরিকল্পিত ‘হানি ট্র্যাপ’ ও হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিউটি আক্তার নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে বনানী থানা পুলিশ। পুলিশ জানায়, জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরিসহ ওই নারীকে আটক করা হয়।

নিহত মো. মামুন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মালিয়াটি গ্রামের বাবুল হোসেনের ছেলে। তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়েতে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা) হিসেবে নিয়োগ পান এবং প্রায় এক মাস আগে কর্মস্থলে যোগদান করেন। তিনি বিবাহিত ছিলেন। তার স্ত্রী শাহীনা আক্তার বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া বিউটি আক্তার ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার নিগুয়ারী গ্রামের বাসিন্দা এবং সাইফুল ইসলামের স্ত্রী।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রায় এক বছর আগে বিউটি আক্তারের এক আত্মীয়কে প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে মামুনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয় থেকে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ওই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিভিন্নভাবে মামুনকে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছিল বলেও পরিবারের অভিযোগ।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (১০ জুলাই) বিউটি আক্তার ঢাকার মহাখালীর টিবি গেট পূর্বপাড়া এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেন। পরদিন শনিবার সকালে কৌশলে মামুনকে সেখানে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে আটকে রেখে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

অভিযোগে বলা হয়, একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মামুনের শরীরে আঘাত করা হয় এবং তার বিশেষ অঙ্গ কেটে ফেলে হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তার চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।
 
নিহতের চাচা মোকসেদ আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘মাত্র পাঁচ মাস আগে মামুন বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি পান এবং এক মাস আগে কর্মস্থলে যোগ দেন। নতুন চাকরি, সংসার ও অনাগত সন্তানকে ঘিরে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু একটি নির্মম ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে গেছে।’

নিহতের স্ত্রী শাহীনা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। একজন স্ত্রীর জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? আমার স্বামীর মৃত্যুর ঘটনাটি এতটাই হৃদয়বিদারক যে মুখে বলতে গেলেও লজ্জা আর যন্ত্রণায় বুক ভেঙে যায়। আমি কখনো কল্পনাও করিনি আমার স্বামী এমন একটি ঘটনার শিকার হবেন। যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করার অধিকার নেই।’

তিনি বলেন, আজ আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা আমার অনাগত সন্তানকে নিয়ে। সে বড় হয়ে যখন জানতে চাইবে তার বাবা কোথায়, কীভাবে মারা গেলেন, তখন আমি কী উত্তর দেব? আমার সন্তান জন্ম নেওয়ার আগেই পিতৃহীন হয়ে গেল।’

‘বিউটি আক্তার অন্যের বৈধ স্ত্রী হয়েও কীভাবে এমন সম্পর্কে জড়াতে পারলেন? একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর সংসার এভাবে ধ্বংস করতে পারলেন কীভাবে? আমি বিশ্বাস করি, পরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

নিহতের বাবা বাবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র ও নম্র স্বভাবের ছিল। এলাকায় তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো বদনাম বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল না। সে এমন কোনো কাজ করতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’

নিহতের চাচা সাইফুর রহমান বলেন, ‘আমার ভাতিজাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। তাকে একটি ঘরের ভেতরে আটকে রেখে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমাদের ধারণা, এটি একটি ‘হানি ট্র্যাপ’ এর মাধ্যমে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। আহত অবস্থায় যে যুবকটি মামুনকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার কাছ থেকে আমরা জেনেছি, মামুন তখন শুধু বলতে পেরেছিলেন যে তার হাত-পা ও চোখ বেঁধে তার ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। এরপর তিনি আর কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না।

আমাদের অভিযোগ, বিউটি আক্তার ঘটনার আগের দিন পরিকল্পিতভাবে বাসা ভাড়া নেন এবং কৌশলে আমার ভাতিজাকে সেখানে নিয়ে যান। এত বড় ঘটনা একজনের পক্ষে একা ঘটানো সম্ভব নয়। এর পেছনে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে। তাই বিউটি আক্তারকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদসহ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানাচ্ছি। 

ময়নাতদন্ত শেষে মামুনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে তা ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার নিজ গ্রাম মালিয়াটিতে নিয়ে আসা হয়। সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল ১০টায় তার নিজ বাড়িতে জানাজার সম্পন্ন হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজা ও দাফনে স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহপাঠী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন। এ সময় শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে উপস্থিত সবাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচারের দাবি জানান।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow