লোক দেখানো জাকাত ও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা

পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশকের দিনগুলো আমরা অতিবাহিত করছি। এই শেষ দশকে বিভিন্ন স্থানে জাকাতের কাপড় বিতরণের দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ে যা বছরের অন্য সময়ে তেমন একটা দেখা যায় না। ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে জাকাতের সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা জানি, পবিত্র মাহে রমজানের দিনগুলোতে আমাদের প্রিয়নবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ঝড়ো গতিতে দান খয়রাত করতেন। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন রমজানে দানখয়রাত করেন কিন্তু যে হারে করা প্রয়োজন সেভাবে হয়ত করেন না। এছাড়া শুধু রমজান মাস আসলেই হাতেগনা কিছু মানুষকে দেখা যায় জাকাতের কাপড় বিতরণ করতে, আর সারা বছর এমনটি চোখে পরে না। অনেকে হয়ত মনে করেন, জাকাত বুঝি কেবল রমজানেই দেয়ার বিধান আর কিছু শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করেই জাকাত প্রদান হয়ে গেল বলে ভেবে থাকেন। বিষয়টি মোটেও এমন নয়। জাকাত এমন একটি আবশ্যকীয় বিষয়, এটি যার ওপর ফরজ তখন তাকে হিসাব করে বায়তুল মালে জাকাত প্রদান করতে হয়। সমাজে অনেক এমন মানুষ আছেন যারা রমজান এলে কিছু গরীব মানুষদের হাতে জাকাতের সম্পদ বিতরণ করে মনে করে আমর

লোক দেখানো জাকাত ও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা

পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশকের দিনগুলো আমরা অতিবাহিত করছি। এই শেষ দশকে বিভিন্ন স্থানে জাকাতের কাপড় বিতরণের দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ে যা বছরের অন্য সময়ে তেমন একটা দেখা যায় না। ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে জাকাতের সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আমরা জানি, পবিত্র মাহে রমজানের দিনগুলোতে আমাদের প্রিয়নবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ঝড়ো গতিতে দান খয়রাত করতেন। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন রমজানে দানখয়রাত করেন কিন্তু যে হারে করা প্রয়োজন সেভাবে হয়ত করেন না। এছাড়া শুধু রমজান মাস আসলেই হাতেগনা কিছু মানুষকে দেখা যায় জাকাতের কাপড় বিতরণ করতে, আর সারা বছর এমনটি চোখে পরে না।

অনেকে হয়ত মনে করেন, জাকাত বুঝি কেবল রমজানেই দেয়ার বিধান আর কিছু শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করেই জাকাত প্রদান হয়ে গেল বলে ভেবে থাকেন। বিষয়টি মোটেও এমন নয়।

জাকাত এমন একটি আবশ্যকীয় বিষয়, এটি যার ওপর ফরজ তখন তাকে হিসাব করে বায়তুল মালে জাকাত প্রদান করতে হয়। সমাজে অনেক এমন মানুষ আছেন যারা রমজান এলে কিছু গরীব মানুষদের হাতে জাকাতের সম্পদ বিতরণ করে মনে করে আমরা তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছি।

অথচ জাকাত গরিবদের ওপর কোনো অনুগ্রহ নয় বরং এটি দানকারীর নিজের মঙ্গলের জন্য এবং তার মাল পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করার এক ব্যবস্থা। এজন্য পবিত্র কুরআনে বার বার বলা হয়েছে ‘নামাজ কায়েম কর এবং জাকাত দাও’।

এছাড়া জাকাত প্রদান করলে ধনসম্পদে কমতি হয় না। কোনো কোনো দুর্বল ইমানদার ব্যক্তি মনে করেন, জাকাত দিলে ধনসম্পদ কমে যাবে। কিন্তু আল্লাহই সব উপজীবিকা এবং রিজিকের মালিক।

আল্লাহতায়ালা কুরআন করিমে ইরশাদ করেছেন, ‘শয়তান তোমাদের দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং সে তোমাদেরকে অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ নিজ পক্ষ হতে তোমাদেরকে ক্ষমা এবং আশিসের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। বস্তুত আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী এবং সর্বজ্ঞ’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৮)।

এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা শয়তানি প্ররোচনা হতে মানুষকে সতর্ক করেছেন। শয়তানি প্ররোচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ যখন আল্লাহর পথে জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে দারিদ্রের ভয় করে, তখন দারিদ্র এবং অশ্লীলতা প্রবলভাবে সমাজ দেহকে জর্জরিত করে ফেলে। তখন ধনী-দরিদ্র সবারই পক্ষে জীবন ধারণ করা অসহনীয় হয়ে পড়ে। দারিদ্র এবং সামাজিক কদাচার সকলকেই প্রভাবিত করে। এ অবস্থা সৃষ্টি হবার পূর্বেই সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য জাকাত প্রদান করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমরা যেভাবে নামাজ আদায় করাকে ফরজ জানি তেমনি জাকাত প্রদানও ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি।

বর্তমান সময়ে জাকাত প্রদান যেন একটা ফ্যাশনে রূপ নিয়েছে। সারা বছর তার পাশের বাড়ির মানুষটি যে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে তার খবর না রেখে রমজান এলেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে জাকাত প্রদান করতে দেখা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এলাকার প্রভাবশালীরা জাকাত প্রদানের নামে এমন লোক দেখানো কাজ করে থাকে, যা মোটেও জাকাত প্রদান বলেনা। এ ধরনের লোক দেখানো কোনো আমল আল্লাহপাকের দৃষ্টিতে কোনো মূল্য রাখে না।

বিশেষ করে মানুষের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য আছে, তা পালন করার মাধ্যমেই সমস্ত কল্যাণ নিহিত। যতদিন মানুষ মানুষকে ভালো না বাসবে ততদিন পৃথিবী থেকে নৈরাজ্য আর অশান্তিই দূর হবে না। পৃথিবী স্বর্গরাজ্যে পরিণত তখনই হতে পারে যখন মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে। প্রতিবেশীর খোঁজ নিয়ে তার সুখে-দু:খে পাশে দাঁড়াবে।

মানুষের জন্য প্রেম-প্রীতি জন্মা না নিলে সে মানুষ হয় কীভাবে। সবার সাথে, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন মানুষ হিসেবে তার প্রতি প্রীতিময় সম্পর্ক রাখার শিক্ষাই ধর্মের শিক্ষা।

সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিরা যদি হিসেব করে জাকাত প্রদান করতো তাহলে এ সমাজে হয়ত এমন কাউকে পাওয়া যেত না যে দু-মুঠো খাবারের জন্য আর্তনাত করে।

জাকাতের অর্থ হলো সম্পদকে পবিত্র করা। নামাজের মাধ্যমে যেমন আত্মা পবিত্র হয় তেমনি জাকাতের মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র হয়। জাকাত এমন একটি দান যা প্রভাবশালীদের কাছে থেকে নিয়ে গরীব-অভাবীদের দেওয়া হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা জাকাত হিসেবে যা দাও সে ক্ষেত্রে এরাই সেইসব লোক, যারা (জাকাতের মাধ্যমে নিজেদের ধনসম্পদ) বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে’ (সুরা রুম, আয়াত: ৩৯)।

মানুষ কষ্ট করে সম্পদ অর্জন করার পরও সেই সম্পদে শুধু তারই নয় বরং অন্যদেরও কিছু অধিকার আছে। এ অধিকার পূর্ণ করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অভাবী লোকদের মাঝে তা বিতরণের জন্য জাকাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তাছাড়া জাকাতের নির্দেশ এ জন্যও দেওয়া হয়েছে, অনেক সময় কোনো কোনো লোক গরিবদের প্রতি নানা কারণে দৃষ্টি দিতে পারে না বা দেয় না। সেজন্য জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের বাঁচার ন্যূনতম অধিকারকে বিধিবদ্ধভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং বায়তুল মালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাই সেই বায়তুল মালে জাকাতের অর্থ জমা দিবেন এবং সেখান থেকে গরীব-অসহায়দের দেয়া হবে। কোথা থেকে সাহায্য পাওয়া গেল তা কারো জানা থাকবে না।

মহানবির (সা.) সময় এমনই বায়তুল মালের ব্যবস্থা ছিল যেখান থেকে সাহায্যপ্রার্থীদের সাহায্য এবং অভাব দূর করার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু আজ ইসলামে একক নেতৃত্ব না থাকায় সেই বায়তুল মালের ব্যবস্থাপনাও হারিয়ে যায়।

যেহেতু ইসলামি নিয়ম কানুনকে মানুষ আজ ভুলে বসেছে তাই এত সব বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে আর জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে কাফনের কাপড় লাভ করার ঘটনার সংবাদও গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।

জাকাত একটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেয়াকে ইসলাম উৎসাহিত করে। এর ফলে গ্রহীতার আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ন হয় না। জাকাতদাতার সরাসরি বিতরণে এটা সম্ভব নয়। কেননা মহানবি (সা.) বলেছেন, ওপরের হাত নিচের হাত থেকে শ্রেষ্ঠ। তাই জাকাতদাতা যদি নিজে বিতরণ করে তাহলে দানের হাত ওপরে থাকে আর গ্রহীতার হাত নিচে। ফলে দাতার সামনে গ্রহীতা স্বাভাবিকভাবে সব সময় মাথা নিচু করে চলবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে আবার পাওয়ার আশায়। এতে তার ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু একটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাকাত বণ্টনে এ ত্রুটি ঘটে না। কারণ গ্রহীতা এটা আল্লাহতায়ালার ব্যবস্থায় অধিকার লাভ হিসেবে গ্রহণ করে।

এছাড়া লোক দেখানো কোনো কাজ করাকে ইসলাম কঠোরভাবে বারণ করেছে। যেভাবে হাদিসে হজরত রাসুল করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে শোনানোর জন্য এবং মানুষের নিকট প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য কোনো আমল করে- আল্লাহ তাআলা তার অবস্থা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাকে রিয়াকারীর শাস্তি দেবেন। (বুখারি, মুসলিম)

তাই লোক দেখানো কাজ না করে সবাই যদি সঠিকভাবে জাকাত প্রদান করে, তাহলে সমাজ ও দেশে সামান্য কাপড়ের জন্য প্রাণ হারাতে হয় না কাউকে। মানুষ আজ সঠিকভাবে জাকাত প্রদান করেনা বলেই এমন হাহাকার।

মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘যে ধনী ব্যক্তি নিজের ধনসম্পদ হতে জাকাত আদায় করে না, তার ধনসম্পদকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং উত্তপ্ত শলাকা দ্বারা তাদের কপালে এবং মুখ মণ্ডলে দাগ দেয়া হবে এবং এ শাস্তির মেয়াদ পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে’ (বুখারি)।

হজরত রাসুল করিম (সা.) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তিকে আল্লাহ ধনসম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু সে এর জাকাত দেয় না, কেয়ামতের দিন তার সেই ধনসম্পদ এক ভয়ংকর সাপের আকারে দৃষ্ট হবে, উক্ত সাপ কেয়ামতের দিন তার গলায় জড়িয়ে থাকবে এবং চোয়াল দংশন করতে করতে বলবে, আমি তোমার সেই ধনসম্পদ যার জাকাত তুমি দাওনি’ (বুখারি ও মেশকাত)। 

জাকাতের উদ্দেশ্য শুধু গরীব, দু:খিদের প্রতি বিশেষ ত্রাণের ব্যবস্থা করা অথবা আর্থিক দিক দিয়ে যারা পিছনে পড়ে আছে তাদের উন্নয়ন করাই নয় বরং এর দ্বারা অর্থ সম্পদ এবং পণ্যদ্রব্য মজুত করে রাখার অভ্যাসও দূর হয়।

বর্তমান সময়ে জাকাত প্রদান যেন একটা ফ্যাশনে রূপ নিয়েছে। সারা বছর তার পাশের বাড়ির মানুষটি যে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে তার খবর না রেখে রমজান এলেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে জাকাত প্রদান করতে দেখা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এলাকার প্রভাবশালীরা জাকাত প্রদানের নামে এমন লোক দেখানো কাজ করে থাকে, যা মোটেও জাকাত প্রদান বলেনা। এ ধরনের লোক দেখানো কোনো আমল আল্লাহপাকের দৃষ্টিতে কোনো মূল্য রাখে না।

ইসলাম শুধু উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয় নাই। বাস্তব জীবনে জাকাতকে ফরজ কার্যের আওতায় এনে প্রতিফলন ঘটিয়েছে। জাকাত দ্বারা দরিদ্র জনসাধারণের জন্য একটি চিরস্থায়ী দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আমরা জানি, সাহাবিগণের অধিক সংখ্যকই ছিলেন দরিদ্র ও অভাবী। নিজেদের ব্যাবহারিক জীবনে তারা বহু অভাব অনটনে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর পথে দ্বিনের কাজের জন্য বহুবিধ পথে তারা সম্পদ ব্যয় করতেন। এ সকল সাদাকাতের মধ্যে জাকাত ছিল অগ্রগণ্য ও সর্বব্যাপী।

আমরা যদি দান-খয়রাতের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে লোক দেখানো আমল পরিবর্তন করতে হবে। আল্লাহপাক সকলকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে জীবন অতিবাহিত করার তৌফিক দিন, আমিন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow